সবকিছু এখন পর্যন্ত ভালোই চলছে। তাঁরা তাঁদের ঘোড়াগুলোকে বেশ খানিকটা দূরে বেঁধে রেখে এসেছে এবং কারো চোখে ধরা না পড়ে এই পর্যন্ত আসতে তাই চাঁদ প্রতিবার মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়তে এবং সেই সময়ে সামান্যতম আড়াল ব্যবহারের সুযোগ তাঁরা নিয়েছে। তাঁদের মাথার উপরে ঝুলে থাকা ডালপালার ভিতর দিয়ে, ঠিক সামনেই হুমায়ুন শুল্ক স্রোতস্বিনীর শুরুটা দেখতে পায়, ঠিক তার উপর থেকে পাহাড়ের কালো দেয়াল উঠে গিয়েছে। আহমেদ খান আর যে দশজন তার সাথে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠবে তাঁদের তাঁর চারপাশে জড়ো হতে ইঙ্গিত করে সে।
আমার নিয়তি এবং সেই সাথে সাম্রাজ্য আর আমাদের সবার জীবন এই প্রয়াসের কারণে ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। মারাত্মক বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু আমরা যদি সফল হই তাহলে পুরষ্কারের সম্ভাবনাও ব্যাপক, আল্লাহতালা আমাদের সহায় আছেন, আমরা সফল হবই। এখন, সবাই শেষবারের মতো দেখে নাও যে তোমাদের থলেতে তোমাদের উপকরণসমূহ নিরাপদে রয়েছে আর তোমাদের পছন্দসই যে কোনো অস্ত্র বহনের নিমিত্তে ভালোমতো গোঁজা রয়েছে। আমরা চাই না যে কিছু পড়ে গিয়ে আমাদের অবস্থান প্রকাশ হয়ে যায় বা পেছনে যারা অনুসরণ করছে তাদের কোনো ক্ষতি হোক।
হুমায়ুন তাঁর তরবারি আলমগীর জওহরের কাছে রেখে এসেছে, যে বাহিনীর বাকি সদস্য সাথে তাঁকে অনুসরণ করবে। সে তার বাকি লোকদের মতোই সাধারণ কালো কাপড় পরিধান করেছে কেবল তৈমূরের অঙ্গুরীয় একটা সরু চামড়ার ফালি দিয়ে তার গলায় বাঁধা রয়েছে। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে শুরু করবার ঠিক আগে সেটা বের করে এবং তাতে চুমু খায় সে। তারপরে তাঁরা উঠতে আরম্ভ করে, আহমেদ খান সামনে আগের দিন হাত এবং পা রাখার জন্য যেসব স্থান ব্যবহার করেছিল তাদের খুঁজতে খুঁজতে এবং ইশারায় ঠিক তার পেছনেই অবস্থানরত হুমায়ুনকে অনুসরণ করতে বলে। কয়েকটা ছোট পাথর মাঝে মাঝে যদিও তাদের কারণে স্থানচ্যুত হয়ে, নীচে মাটির দিকে সেগুলো ঠোকর খেতে খেতে গড়িয়ে গেলে, হুমায়ুন আশা করে তাদের গড়িয়ে যাবার শব্দ বিস্ফোরণের ফলে চাপা পড়ে যাবে যা তাঁর সেনাছাউনির দিক থেকে ভেসে আসছে শত্রুদের মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য তার কামানগুলো সম্মুখ আক্রমণের বারতা ঘোষণা করছে।
বিশ মিনিটের ভিতরে, শেষ ফাটলের পাদদেশে পৌঁছে যায় দুজনে। হুমায়ুন উপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এই অংশটা বেয়ে উঠা কতটা কষ্টসাধ্য বলে প্রতিপন্ন হবে। জলপ্রপাতের প্রাথমিক তোড়ের কারণে এই অংশের পাথর একেবারে মসৃণ দেখায় এবং একপাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আর অন্যপাশের দেয়ালে পা দিয়ে স্বচ্ছন্দে উপরে বেয়ে উঠে যাবার জন্য যথেষ্ট চওড়া ফাটলটা। আহমেদ খান যে কীলকগুলো- পাহাড়ের গা থেকে বের হয়ে থাকা দুফিট চওড়া একটা পার্শ্বদেশের উপরে অবস্থান করে তার দেহের সাথে আড়াআড়িভাবে ঝোলান একটা বগলি থেকে বের করে দরকার হবে বলে তার কোমরের চারপাশে জড়ান একটা কালো পরিকর গুঁজে রাখে। হুমায়ুনও তাঁর নিজের হাতুড়ি কোমর থেকে খুলে হাতে নেয়।
সুলতান, গতকাল প্রথম দশ ফিটই সবচেয়ে মসৃণ বলে মনে হয়েছিল। আমি নিজেকে ফাটলের ভিতরে আটকে রাখবো আর আপনি আমার দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে সিঁড়ির মতো ব্যবহার করে প্রথম কীলকটা দেয়ালে স্থাপনের মতো স্থানে পৌঁছাবেন।
হুমায়ুন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে আহমেদ খান পাথুরে ফাটলের ভেতরে নিজেকে আটকে ফেলে। আহমেদ খানের টানটান হয়ে থাকা উরুতে হুমায়ুন তখন এক পা রাখে এবং নিজেকে ঠেলে উপরের দিকে তুলতে থাকে যতক্ষণ না সে আহমেদ খানের কাঁধে চড়ে বসে। মাথার উপরে হাত দিয়ে সে এবার পাথরের উপরিতলে অনুসন্ধান করতে থাকে যতক্ষণ না একটা ছোট্ট ফাটল খুঁজে পায় সে। হাতুড়ি বের করে এবং পরিকর থেকে একটা ফুটখানেক লম্বা কীলক বের করে, পাথরের ভিতরে কীলকটা ঢুকিয়ে দেয়, হাতুড়ির প্রতিটা ধাতব শব্দ উদ্বিগ্ন, ঘামতে থাকা হুমায়ুনের কাছে মনে হয় ফাটলের ভিতরে ভয়ঙ্কর প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করছে। অবশ্য, উপর থেকে কোনো নড়াচড়া চোখে পড়ে না এবং শীঘই কীলকটা যথাস্থানে ঢুকে যায়। হুমায়ুন কীলকটা টেনে পরীক্ষা করে এবং সেটাকে দৃঢ়ভাবে প্রবিষ্ট দেখে সেটায় ভর দিয়ে পরবর্তী কীলক প্রবিষ্ট করাবার স্থান নির্বাচন করতে আহমেদ খানের কাঁধ থেকে আধাআধি উপরে উঠে।
এটাও দেয়ালের গায়ে ভালোমতোই প্রবিষ্ট হয় এবং কীলকের উপরেই নিজেকে মূলত স্থাপিত করে আর মাঝে মধ্যে পিঠের সাহায্যে পাথরের গায়ে নিজেকে ঠেসে ধরে, পা রাখবার আরেকটা জায়গার খোঁজে হুমায়ুন উপরে উঠতে থাকে। এবং এভাবেই পুরো বিষয়টা এগিয়ে চলে, ঘামতে ঘামতে এবং জোরে শ্বাস নিতে নিতে, দুজনে শীর্ষদেশের দশ ফিটের ভিতরে পৌঁছে যায় যেখানে একটা পাথুরে শিলাস্তর তাদের আতঙ্কের উদ্রেক করে পথ আটকে রয়েছে। অবশ্য আহমেদ খান, হুমায়ুনের আলখাল্লার প্রান্তদেশ ধরে আধো-অন্ধকারের ভিতরে দেয়ালের শীর্ষদেশ থেকে ঝুলে থাকা পাহাড়ী লতাগুল্মের একটা মোটা ঝাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে, সেটা এমন এক দিকে যেদিকে স্বাভাবিক অবস্থায় সে লক্ষ্যই করতো না এবং সেটা তাদের ডানদিকে ছয়ফিট দূরে ঝুলছে।
