আত্মসমর্পণের বার্তাযুক্ত তীর নিক্ষেপের প্রায় ঘন্টা দুয়েক পরে, আকবরকে পাশে নিয়ে, হুমায়ুন ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় রোহতাসের উঁচু, লোহার গজালযুক্ত প্রধান তোরণদ্বারের নীচে দিয়ে দূর্গের অভ্যন্তরের জনশূন্য, নিরব প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে, পরিত্যক্ত অস্ত্র আর ভারী যুদ্ধ উপকরণে পুরো জায়গাটা গিজগিজ করছে। হুমায়ুনের সৈন্যবাহিনীর শক্তি দেখে, দূর্গের প্রতিরক্ষায় যারা ছিল তারা আত্মসমর্পণের প্রস্তাবের উদারতায় সাথে সাথে সমঝদারের মতো সম্মতি দিয়েছে। কয়েক মিনিটের ভিতরে দূর্গের প্রধান তোরণদ্বারের পুরু কাঠের পাল্লা খুলে যায় এবং সেনাছাউনির লোকেরা দুই পাল্লার মাঝের ফাঁকা স্থান দিয়ে, কেউ খালি পায়ে কেউ ঘোড়ায় চড়ে তাঁদের পক্ষে বহন করা সম্ভব এমন মূল্যবান সব কিছু নিয়ে, স্রোতের মতো বাইরে বের হয়ে আসতে শুরু করে এবং সবাই দক্ষিণ দিকে রওয়ানা দিয়ে, হুমায়ুনকে হিন্দুস্তানে প্রবেশপথে অবস্থিত এই ঘাঁটিটার মালিক হিসাবে স্বীকার করে ছেড়ে দিয়ে যায়।
হুমায়ুন তাঁর দেহরক্ষীদের কয়েকজন আধিকারিককে আদেশ দেয় দূর্গের সেনাছাউনি থেকে আসলেই সবাই বিদায় নিয়েছে কিনা তল্লাশি করে দেখতে এবং নিশ্চিত করতে যে অতর্কিত হামলা করার জন্য সেখানে কেউ ওঁত পেতে নেই। তাঁদের কাছ থেকে দ্রুত নিশ্চয়তাজ্ঞাপক সংবাদ লাভ করার পরে, হুমায়ুন দূর্গের দরবার কক্ষের খোলা দরজার দিকে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যায়। হুমায়ুন হাঁটবার গতি না কমিয়ে ডানদিকে তাকিয়ে দেখে মাটির কয়েকটা তন্দুরের নীচে তখনও কয়লার আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। সে একটা তন্দুরের ভিতরে উঁকি দিয়ে সেখানে বেশ কয়েকটা গরম আর আফোলা রুটি দেখতে পায়। সে একটা রুটি তুলে নিয়ে সেখান থেকে ছোট একটা টুকরো ছিঁড়ে নিয়ে, টুকরোটা আকবরের দিকে এগিয়ে দেয়।
রুটিটা উপভোগ করো। রুটির এই টুকরোয় বিজয়ের স্বাদ রয়েছে।
৪.৬ চুড়ান্ত বিজয়
২৬. চুড়ান্ত বিজয়
হুমায়ুনের নিয়ন্ত্রক তাবুর বাইরে ইতিমধ্যে সৃষ্ট জলভর্তি পানির বড়বড় সব ডোবায় আবারও সীসার মতো আকাশের বুক থেকে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা অঝোরধারায় ঝরতে শুরু করে। যুদ্ধের জন্য আহবান করা পরামর্শ সভায় তার সাথে যোগ দেবার জন্য সে যখন তাঁর সেনাপতিদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছে তখন সে তাবুর কানাতের উপর অঝোরে ঝরতে থাকা বৃষ্টির পানির নীচে দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে তাঁর শিবিরের নীচু আর কর্দমাক্ত কিছু এলাকায় পানি জমে সৃষ্ট এইসব ডোবাগুলো পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে জলাশয়ের আকার ধারণ করেছে। পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত তার সৈন্যদের পায়ের পাতা পানিতে পুরোপুরি ডুবে রয়েছে যারা তাদের কাঁধের মাঝে মাথা কুঁজো করে রেখে পায়চারি করার সময় অনবরত পানি ছিটিয়ে চলেছে। সে যেদিকেই তাকিয়ে দেখুক না কেন আকাশের কোথাও বৃষ্টি থামবার কোনো লক্ষণ তার চোখে পড়ে না।
হুমায়ুন ঘুরে দাঁড়িয়ে তাবুতে ফিরে আসে, যেখানে তাঁর সেনাপতিরা ইতিমধ্যে অর্ধবৃত্তাকারে সমবেত হয়েছে, তাঁদের অনেকেই তাঁর তাবুর উল্টোপাশে অবস্থিত নিজেদের তাবু থেকে সামান্য এই দূরত্বটুকু দৌড়ে অতিক্রম করার সময় বৃষ্টিতে একদম কাকভেজা করে ভিজে গিয়ে তখনও কাপড় থেকে বৃষ্টির পানি ঝেরে ফেলার জন্য চেষ্টা করছে। হুমায়ুন আকবরকে পাশে নিয়ে কেন্দ্রে তাঁর নির্ধারিত স্থানে আসন গ্রহণ করে।
আহমেদ খান, সেকান্দার শাহের সেনাবাহিনীর সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে। আমরা নতুন আর কি জানতে পেরেছি?
শিরহিন্দে নিজের সুরক্ষিত অবস্থানের প্রায় ছয় মাইল ভেতরে সে রয়েছে, আমরা এখানে এসে শিবির স্থাপন করার পূর্বে তাঁর অবস্থান অভিমুখে অগ্রসর হবার সময়ে পক্ষকালব্যাপী সে ঠিক যা করে আসছিল। তাঁর গুপ্তদূত যাদের আমরা সাথে আমাদের মোকাবেলা হয়েছে বা যাদের আমরা বন্দি করেছি তাদের সংখ্যা থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে তিনি আমাদের অগ্রসর হবার বিষয়ে অনেক পূর্বে থেকেই অবগত ছিলেন কিন্তু তারপরেও আমাদের মোকাবেলা করার কোনো প্রয়াসই তিনি গ্রহণ করেননি। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে তিনি এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে চারদিকে কাদা থাকায় আমাদের চলাফেরার গতি শ্লথ হয়ে গিয়ে তার তবকি আর তীরন্দাজদের আর সেই সাথে তার নিখুঁতভাবে সুরক্ষিত কামানের সহজ নিশানায় পরিণত হবার ভয়ে আমরা বর্ষাকালে আক্রমণ করার মতো হঠকারিতা দেখাব না।
আমি আমাদের আক্রমণ গত সপ্তাহ পর্যন্ত বিলম্বিত করেছি, এই ভ্রান্ত বিশ্বাসটা সিকান্দার শাহকে বিশ্বাস করার জন্য উৎসাহিত করতে, তাঁকে নিশ্চিত করতে চেষ্টা করেছি যে তাঁর মতোই আমরাও সনাতনধারায় বিশ্বাসী এবং আমরা সতর্ক থাকবে এবং সেই সাথে তাঁর অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছাবার পরে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে মাটি আবারও শক্ত হয়ে উঠা পর্যন্ত আমরা যেকোনো যুদ্ধের সম্ভাবনা নাকচ করে দেব।
কিন্তু সুলতান, তাঁর বিশ্বাসটাও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাবে না, জাহিদ বেগ জানতে চায়, তাঁর কৃশকায় মুখাবয়বে স্পষ্টতই গভীর উদ্বেগের চিহ্ন প্রকাশিত। আমরা আমাদের কামানগুলো একেবারে স্থানান্তরিক করতে পারছি না আর আমাদের মাস্কেটের বারুদ সবসময়ে স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়ছে। আমাদের লোকেরা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে আগুনের কাছে বারুদ নিয়ে গিয়ে শুকাবার চেষ্টা করায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার তাঁরা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
