দুই ঘন্টারও কম সময়ের ভিতরে, জোড়ায় জোড়ায় যূথবদ্ধ ষাড়ের দল মোগল তোপ নির্ধারিত স্থানে টেনে নিয়ে আসে এবং হুমায়ুনের অশ্বারোহী সৈন্যরা রোহতাসের চারপাশে ব্যুহ বিন্যাস সমাপ্ত করে, বসন্তের বাতাসে পতপত করে তাঁদের লম্বা, সরু সবুজ নিশান উড়তে শুরু করে। পুরোটা সময় ধরে, যদিও দূর্গপ্রাচীরের উপরে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেলেও, দূর্গ প্রতিরক্ষাকারী সৈন্যরা তাদের অবরোধকারীদের কার্যকলাপে ছন্দপতন ঘটাতে কোনো ধরনের আক্রমণের প্রয়াস নেয়া থেকে বিরত থাকে। সবকিছু জায়গামতো মোতায়েন করা হয়েছে দেখে নেবার পরে হুমায়ুন বৈরাম খানকে আদেশ দেয়, দূর্গপ্রাসাদের তোরণদ্বার লক্ষ্য করে কামানগুলোকে গোলাবর্ষণের আদেশ দেন। পর্যাপ্ত পরিমাণ ধোঁয়া কুণ্ডলীকৃত অবস্থায় যখন চারপাশ ঢেকে ফেলে। তোরণদ্বারের চারপাশে উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় ধোয়া পর্যাপ্ত পরিমাণে জমা হলে, আমাদের তবকিদের ভিতর থেকে বাছাই করা ছেলেদের ধোঁয়ার আড়াল ব্যবহার করে সামনে শত্রুর নাগালের ভিতরে এগিয়ে যেতে বলেন এবং কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্য দূর্গ প্রকারের পিছনে অবস্থিত ছাদ থেকে যারা নিজেদের দেহকাঠামো পর্যবেক্ষণ করে তারপরে, তাদের কেউ আর সেখান থেকে পরে শ্রেণীকক্ষে ফিরে যায়নি। ইত্যবসরে আমাদের বার্তাবাহকেরা দূর্গের প্রতিরক্ষাকারীদের নিরাপদে প্রস্থানের সুযোগ করে দিয়ে। আমাদের পক্ষে কি তা করা সম্ভব, দলিল লেখকেরা কি এখন দলিলও ছেড়ে যেতে শুরু করেছে এবং তারা যখন ঘন্টাখানেকের ভিতরে নিজেদের প্রস্তত করতে আদেশ দেয় তাহলে স্পেন প্রতিরোধকারীদের নিরাপদে প্রস্থান করতে দেবে এটা একটা বার্তা আকারে লিখতে বলে। আমরা কতখানি অনর্থ ঘটাতে পারি সেটার একটা নমুনা প্রদর্শনের পরে আমাদের শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজেরা আত্মসমর্পণের বার্তা সম্বলিত তীর শহর লক্ষ্য করে ছুড়বে।
সমভূমির উপর দিয়ে প্রায় সাথে সাথেই একটা বিকট বুম শব্দ ভেসে আসে, হুমায়ুনের আদেশ অনুসারে তোপচিরা ব্রোঞ্জের তোপের আগ্নেয় গহ্বরে তাদের হাতের জ্বলন্ত নোম লাগান সুতা প্রবিষ্ট করেছে। তোপের প্রথম কয়েকটা গোলা লক্ষ্যবস্তু থেকে বেশ দূরে, শৈলস্তরের একেবারে নীচের ঢালে আঘাত করে এবং তোরণদ্বার আর দূর্গপ্রাকারের ক্ষতি করার বদলে বাতাসে মাটি আর পাথরের টুকরো বৃষ্টির মতো নিক্ষেপ করে। দিন বাড়ার সাথে সাথে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে কোমর পর্যন্ত নিরাভরণ ঘর্মাক্ত দেহে তোপচিরা বড় কামানবাহী শকটের চাকার নীচে পাথর দিয়ে আর ছোট কামানগুলোকে হাতে তুলে উঁচু মাটির ঢিবির উপরে নিয়ে গিয়ে কামানের নতি পরিবর্তনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা যখন এই কাজে ব্যস্ত তখন উঁচু দূর্গপ্রাকার থেকে কয়েকটা গাদাবন্দুকের শব্দ ভেসে আসে কিন্তু হুমায়ুনের পরিকল্পনা অনুযায়ী লক্ষ্যভেদের জন্য দূরত্বটা একটা বিশাল বাঁধা হিসাবে প্রতিয়মান হয়।
দূর্গের নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রহরীদের নিক্ষিপ্ত কয়েকটা তীর, অবশ্য, কামানের অবস্থানের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয় নিক্ষিপের সময় তারা ধনুকের মুখ উপরের দিকে রাখায় তীরগুলো বেশী দূরত্ব অতিক্রম করে। নির্মেঘ আকাশের বুক থেকে মৃত্যু মুখে নিয়ে তাঁরা নীচে নেমে আসে, অধিকাংশই নিরীহ ভঙ্গিতে মাটিতে গেঁথে তিরতির করে কাঁপতে থাকে কিন্তু বেশ কয়েকটা তীর দাঁড়িয়ে থাকা ষাড়ের গায়ে বিদ্ধ হলে, তাঁদের পিঙ্গল বর্ণের চামড়া রক্তে কালচে দেখায়, এবং হুমায়ুন দেখে তাঁর একজন তোপচিকে সবাই ধরাধরি করে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার পিঠে কালো শরযষ্টি যুক্ত দুটো তীর বিদ্ধ হয়েছে একটা কামানকে জায়গামতো নিয়ে যাবার জন্য প্রাণপনে সেটাকে ধাক্কা দেবার সময় বেচারা পিঠে তীরবিদ্ধ হয়েছে। কামানগুলো সাময়িক বিরতির পরে শীঘ্রই আবার গোলা বর্ষণ শুরু করে এবং এবার নিয়মিতভাবে কামানের গোলা তোরণদ্বার আর এর দুপাশের পাথুরে দেয়ালে লক্ষ্যভেদ করতে থাকে। কাবুলের পার্শ্ববর্তী উপত্যকায় যেমন দেখা যায় অনেকটা সেরকম প্রথম সকালের কুয়াশার মতো সাদা ধোয়ার একটা আচ্ছাদন কামানগুলোর উপরে ভেসে থাকে।
হুমায়ুন তাকিয়ে দেখতে থাকে তার একদল তবকি তাদের গাদাবন্দুক আর গুলি করার সময় বন্দুক রাখার তেপায়া নিয়ে সামনে দৌড়ে গিয়ে ধোয়ার ভিতরে হারিয়ে যায়। তাঁর বেশ কয়েকজন তীরন্দাজ পিঠে তীর ভর্তি তূণীর আর হাতে দুই মাথাযুক্ত ধনুক নিয়ে তবকিদের অনুসরণ করে। এক কি দুই মিনিট পরেই দূর্গপ্রাকারের সমতল ছাদ থেকে একটা দেহ শূন্যে দুহাত ছুঁড়তে ছুঁড়তে নীচের পাথরে আছড়ে পড়ে। আরেকটা দেহ বাতাসে কিছু একটা আকড়ে ধরার চেষ্টা করতে করতে প্রথমজনকে অনুসরণ করে, এবার হুমায়ুন স্পষ্ট দেখতে পায় হতভাগ্য লোকটার গলা একটা তীর এফোড়ওফোড় করে দিয়েছে। দূর্গ প্রাকারে অবস্থানরত দূর্গরক্ষীদের বন্দুক থেকে আর কোনো সাদা ধোয়ার মেঘ বাতাসে ভাসতে দেখা যায় না এবং আকাশ থেকে নেমে আসা তীরের সংখ্যাও লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পায় অবশ্য রোহতাস দূর্গের তোরণদ্বারগুলো তখনও দৃঢ়ভাবে ভেতর থেকে বন্ধ করা রয়েছে।
আমরা যেমন ধারণা করেছিলাম, লড়াই করার জন্য স্পষ্টতই দূর্গরক্ষীরা খুব একটা আগ্রহী না। তীরন্দাজদের এবার তাঁদের তীরে আত্মসমর্পনের আহ্বান সম্বলিত বার্তাগুলোকে সংযুক্ত করতে বলেন এবং সামনে এগিয়ে গিয়ে শহর লক্ষ্য করে তীরগুলো ছুঁড়তে বলেন, হুমায়ুন আদেশ দেয়। কয়েক মিনিটের ভিতরে, সে দেখে বার্তাযুক্ত তীরগুলো আকাশে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, বেশীরভাগ তীরই দূর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উপর দিয়ে উড়ে যায় এবং দূর্গের ভিতরে অবতরণ করে।
