হুমায়ুন মাথা নেড়ে নিজের সম্মতি জানায় এবং পরিচারকটা সোনালী রঙের তাকিয়ার উপরে রাখা হাতির দাঁতের তৈরী একটা বিশাল সিন্দুক নিয়ে উজিদ বেগের দিকে এগিয়ে আসে। উজিদ বেগ সিন্দুকের ভিতর থেকে রুবি বসান একটা সোনার পানপাত্র বের করে সেটা বিম্র ভঙ্গিতে হুমায়ুনের সামনে তুলে ধরে।
সুলতান, আমি আমার আনুগত্যের একটা ক্ষুদ্র স্মারক হিসাবে এই উপহারটা আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।
আপনাকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আমি খুবই প্রীত হয়েছি যে আরো একবার আপনার অধিরাজ হিসাবে আমাকে স্বীকৃতি দিতে আপনি নিজে এসেছেন। আমার আহ্বানে সাড়া দিতে আপনি সচরাচর এতটা উদগ্রীব থাকেন না।
উজিদ বেগের চোখমুখ লাল হয়ে যায়। সুলতান, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণেই কেবল সাময়িকভাবে আমাকে বিরত থাকতে হয়েছিল, এবং এর কিছুদিন পরেই আপনি হিন্দুস্তান ত্যাগ করেছিলেন।
নির্বাসিত অবস্থায় আপনি ইচ্ছা করলেই আমাকে অনুসরণ করতে পারতেন।
আমাকে আমার সিংহাসন আর পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টা লক্ষ্য রাখতে হয়েছিল, উজিদ বেগ কোনমতে তোতলাতে তোতলাতে বলে।
হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নেয় বেচারাকে অনেক অপদস্থ করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আমাদের সবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। অতীতে কথা ভুলে যাওয়াই আমাদের জন্য মঙ্গল। আপনি আরো একবার আপনার আনুগত্য আমার প্রতি নিবেদন করেছেন বলে আমি খুশী হয়েছি এবং এই আনুগত্য যে আন্তরিকতার সাথে নিবেদন করা হয়েছে আমিও ঠিক সেই আন্তরিকতার সাথেই এটা গ্রহণ করছি। আপনি আমার সৈন্যবাহিনীতে কতজন সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন?
আপনি দক্ষিণ অভিমুখে যাত্রা শুরু করার কয়েক দিনের ভিতরেই আটশ অশ্বারোহীর একটা সুসজ্জিত বাহিনী আপনার বাহিনীর সাথে যোগ দিতে পারবে।
আমি খুব খুশী হবো যদি এখানে উপস্থিত আপনার এই ছেলে অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আমার সাথে যোগ দেয়, হুমায়ুন বলে, তাঁর মুখের একটা পেশীও টান খায় না, সে খুব ভালো করেই জানে যে তার বাহিনীর সাথে মুরাদ বেগের উপস্থিতি তার আব্বাজানের সুবোধ আচরনের কার্যকর নিশ্চয়তা দান করবে।
সুলতান, আমি নিজেই এটা প্রস্তাব করতে যাচ্ছিলাম।
*
এপ্রিলের প্রথমদিকে সূর্য মাত্র তিনঘন্টা আগে আকাশে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছে, যখন হুমায়ুন পাঞ্জাবে অবস্থিত একসারি শৈলচূড়ার শেষটার শিখরে আকবর আর বৈরাম খানকে পাশে নিয়ে উঠে আসে এবং সামনের দিকে তাকিয়ে বেলেপাথরের তৈরী অতিকায় রোহতাস দূর্গের কাঠামো দেখতে পায়। নীচের সমভূমিতে একটা নিচু কিন্তু দৃশ্যমান শিলাস্তরের উপরে দূর্গটা নির্মাণ করা হয়েছে, যেখান থেকে উত্তর আর পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ অভিমুখী রাস্তার সংযোগস্থলের দিকে লক্ষ্য রাখা যায়। হুমায়ুন হিন্দুস্তানের অভ্যন্তরে ক্রমাগতভাবে প্রবেশ করার পরেও তাকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের লক্ষণীয় বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। উজাদ বেগের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বরং ইসলাম খানের অনুগত জায়গীরদারের স্বপক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করে। নিজেদের প্রাক্তন অধিরাজকে তারা এতো উদগ্র ভঙ্গিতে অভিযুক্ত করে এবং নিজেরা আনুগত্য আর সমর্থনের শপথ নেয় যে হুমায়ুন সাথে সাথেই বালক আকবরকে পরামর্শ দেয় এসব দৃঢ়োক্তি সে যেন কখনও অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস না করে। সর্বোপরি, এদের অনেকেই আগে হুমায়ুনকে ত্যাগ করে শেরশাহের প্রতি নিজেদের আনুগত্য জ্ঞাপন করেছিল এবং আকবর লক্ষ্য করে দেখে তাঁর আব্বাজান সম্পর্কে তাদের এই বর্তমান প্রশস্তি আর আনুগত্যের উৎকীর্তন এসবই মূলত অভ্যঞ্জনেরই নামান্তর। হুমায়ুনের সেনাবাহিনী কাবুল থেকে রওয়ানা দেবার পরে যখন সিন্ধু নদী অতিক্রম করছে ততদিনে এর লোকবল বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়ে বাইশ হাজার হয়েছে। এই সংখ্যা বেড়ে এখন প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার হয়েছে এবং প্রতিদিনই আরো বেশী সংখ্যায় নতুন লোক এসে উপস্থিত হচ্ছে।
আব্বাজান, দূর্গের প্রধান তোরণদ্বার বন্ধ। দূর্গপ্রাকারের উপরে সশস্ত্র লোক অবস্থান করছে এবং আমি রান্নার জন্য প্রজ্জ্বলিত আগুন থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখছি। আমাদের কি দূৰ্গটা দখল করা একান্ত জরুরী নাকি এটা পাশ কাটিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি? আকবর জিজ্ঞেস করে।
হিন্দুস্তানের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই দূর্গটা অন্যতম একটা চাবিকাঠি। আমরা এটাকে শত্রুর হাতে রেখে এগিয়ে যেতে পারি না যারা যেকোনো সময়ে আকস্মিকভাবে পেছন থেকে আমাদের আক্রমণ করে বসতে পারে, আমাদের তাই অবশ্যই দূর্গটা নিজেদের দখলে নিতে হবে। অবশ্য গুজবে শোনা যায় যে দূর্গের প্রতিরক্ষায় খুবই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়োজিত রয়েছে। তাদের সামনে সাহায্যকারী কোনো বাহিনী এসে পৌঁছাবার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং নৈরাশ্যজনক কারণে মৃত্যুবরণ করতে তারা খুব একটা উৎসাহী হবে না। আমি দেখতে চাই প্রাথমিকভাবে শক্তি প্রদর্শন কি ফলাফল বয়ে আনে। বৈরাম খান শত্রুপক্ষের গাদাবন্দুকের লক্ষ্যভেদের নাগালের বাইরে দূর্গের ঠিক সামনে আমাদের কয়েকটা কামান এমনভাবে মোতায়েন করেন, যেন দূর্গের প্রধান তোরণদ্বার আর প্রতিরক্ষা প্রাচীরের নিম্নাংশে সেখান থেকেই তারা কিছুটা ক্ষতিসাধন করতে পারবে। আমাদের অশ্বারোহীদের আদেশ দেন তারা যেন ভূপৃষ্ঠের উপরে দৃশ্যমান শিলাস্তরের চারপাশে ব্যুহ রচনা করে অবস্থান করে এবং আমাদের তবকি আর তীরন্দাজেরা কামানের পিছনে যেন এমনভাবে সমবেত হয় যে দূর্গের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সৈন্যরা তাদের সংখ্যা সম্বন্ধে অবহিত হতে পারে।
