হুমায়ুন তাঁর আব্বাজানের অভিজ্ঞতা দেখে শিখেছে এবং ভাটির দিকে এমন একটা স্থান নির্বাচিত করেছে- যেখানে নদীটা ডান দিকে একটা প্রায় সমকোণী বাঁক নিয়েছে বলে তার স্রোতের বেগ এখানে অনেক শ্লথ। সে কাবুল ত্যাগ করার পরে গত ছয় সপ্তাহ যাবৎ, তার আগে থেকে তৈরী করে রাখা দাঁড় টানা ভেলার কারণে সে তার বাহিনী নিয়ে ধুসর, বন্ধ্যা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত কাবুল নদীর উপর দিয়ে সে যেমনটা আশা করেছিল তার চেয়েও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। ভেলাগুলো বস্তুত পক্ষে এতোই কার্যকরী যে সিন্ধু নদীর বিশাল জলধারার প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার সময় পর্যাপ্ত সংখ্যক নৌকা সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁর আব্বাজানকে কেমন বেগ পেতে হয়েছিল সেটা স্মরণ করে এবং সবসময়ে একটা বিষয়ে সচেতন থেকে যে তাঁকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে যদি সে তাঁর সুযোগ নষ্ট করতে না চায়, হুমায়ুন তাই অর্ধেক ভেলা খুলে সেগুলো হিন্দুস্তান অভিমুখী যাত্রার সময় ভারবাহী পশুর পিঠে চাপিয়ে দেয় যাতে করে সে সিন্ধু নদী অতিক্রম করার সময় সেগুলো পুনরায় ব্যবহার করতে পারে। সে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল বলে নিজের প্রতি কৃতজ্ঞবোধ করে যেহেতু সে সামান্য কিছু নৌকা সংগ্রহ করতে সমর্থ হলেও, তার প্রায় অর্ধেক অস্থায়ী সেতু সাথে করে বয়ে আনা ভেলা বা ভেলার উপকরণ থেকে নির্মিত। সে নদীর তীরে পৌঁছাবার পর থেকে গত তিনদিন যাবৎ তাঁর প্রকৌশলীরা নিজেদের উদ্ভাবনকুশলতার দ্বারা ভেলার টুকরোগুলো একত্রে বাঁধছে। হুমায়ুন তাদের সাথে যোগ দিয়ে, কোমর পর্যন্ত বরফ শীতল পানিতে দাঁড়িয়ে, তাঁর লোকদের উৎসাহ দেয়, নিজেও আঙ্গুল দিয়ে চামড়ার ফালিতে গিঁট দিতে থাকে আঙ্গুলগুলো অচিরেই ঠাণ্ডায় জমে নীল আর অসার হয়ে পড়ে।
সে এখন স্বস্তির সাথে তাকিয়ে দেখে যে ধুসর রঙের ষাড়ের প্রথম জোড়াটা সেতুর উপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে এবং পুরো দলটা তাঁদের অনুসরণ করছে। তার গোলন্দাজ বাহিনীর আরো লোকজন এসে কামানবাহী শকটের চারটা বিশালাকৃতি চাকা ধাক্কা দিতে আর টানতে থাকে, কাদার ভিতর দিয়ে সেতুর দিকে এগিয়ে যেতে ষাড়গুলোকে সাহায্য করে। তারা যখন ধাক্কা দিতে ব্যস্ত তখন ওজনের কারণে সেতুর পাটাতন পানির ভেতরে বেশ খানিকটা ডুবে যায়। মিনিটখানেকের ভিতরে, অবশ্য, কামান, মানুষ আর পশুর পাল নিরাপদে সেতু অতিক্রম করে এবং তারপরে ষাড়ের পরবর্তী দলটাকে নদীর উত্তর তীরে উৎসাহিত করার ভিতর দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটা আবার আরম্ভ হয়।
হুমায়ুন সহসা নদীর দক্ষিণ তীরের সীমান্তবর্তী নীচু টিলার উপরে সে বৃত্তাকারে যে প্রহরীদের মোতায়েন করেছে যাতে নদী অতিক্রম করার সময় অজ্ঞাত কেউ কাছে এলে সর্তক করে দেয়, তাদের অবস্থান থেকে তূর্যধ্বনি শুনতে পায়। প্রথমে একবার তারপরে দ্বিতীয় এবং তারপরে তৃতীয় ধ্বনি ভেসে আসে মানুষের বিশাল বহর তাদের অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসলে সে আর আহমেদ খান যে হুশিয়ারি সংকেত নির্ধারণ করেছিল।
আমরা যখন অনুসন্ধান করবো, পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকেরা কি দেখেছে তখন যেন সেতুর উপর দিয়ে কামার পার করা না হয়। অশ্বারোহীদের আরো দূরে ছড়িয়ে দাও এবং আমাদের তবকিরা যেন বন্দুকে বারুদ আর গুলি ভরে নিজেদের অস্ত্র প্রস্তুত রাখে।
হুমায়ুন তাঁর দেহরক্ষীদের অনুসরণ করা ইঙ্গিত করে, সে তার বিশাল কালো ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে তাঁকে দুলকি চালে ছোটাতে শুরু করে এবং নীচু যে টিলার উপর থেকে তূর্যবাদকেরা হুশিয়ারি সংকেত ধ্বনিত করেছে সে শীঘ্রই সেখানে পৌঁছে যায়। হুমায়ুন সাথে সাথে দেখতে পায় কেন লোকটা হুশিয়ারি সংকেত ধ্বনিত করেছে। প্রায় পৌনে এক মাইল দূরে, দক্ষিণ দিক থেকে হিন্দুস্তানের দিক থেকে- ঘোড়ায় চেপে বিশাল একটা দল এগিয়ে আসছে। হুমায়ুন এমনকি এই দূরত্ব থেকেও সূর্যালোকে তাঁদের বর্শার ফলার অগ্রভাগ ঝলসাতে দেখে এবং অশ্বারোহী দলটা অগ্রসর হবার সাথে সাথে তাদের নিশান বাতাসে পতপত করে উড়ে। অশ্বারোহী লোকগুলো, যাদের সংখ্যা খুব সম্ভবত একশর কাছাকাছি হবে, মনে হয় আস্কন্দিত বেগের বদলে অর্ধবল্পিত বেগে এগিয়ে আসছে তাঁদের যদি আক্রমণের অভিপ্রায় থাকতো তারা এভাবে আসতো না। হুমায়ুন অবশ্য কোনো ধরনের সুযোগ দিতে রাজি নয়।
আমাদের তবকি আর তীরন্দাজদের দ্রুত আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করার বিষয়টা নিশ্চিত কর, সে চিৎকার করে তার এক আধিকারিককে আদেশ দেয়। অশ্বারোহী দলটা আরো কাছে আসলে হুমায়ুন লক্ষ্য করে যে তাঁদের কারো মাথায় শিরোম্রাণ নেই আর তাদের অস্ত্রও কোষবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। তারা তিনশ গজ দূরে অবস্থান করার সময় ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে এবং এক কি দুই মিনিট পরে তাদের ভেতর থেকে একজন নিজের ধুসর ঘোড়া নিয়ে একাকী ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে আসে। সে স্পষ্টতই একজন ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি বা কোনো ধরনের মুখপাত্র এবং হুমায়ুন তাঁর দুইজন দেহরক্ষীকে আদেশ দেয় লোকটাকে তাঁর কাছে নিয়ে আসবার জন্য ঘোড়া নিয়ে তাঁর প্রতিরক্ষা ব্যুহ থেকে সামনে এগিয়ে যেতে।
পাঁচ মিনিটের ভিতরে সেই অশ্বারোহীকে দুধসাদা রঙের আলখাল্লা পরিহিত লম্বা ছিপছিপে এক তরুণ এবং তার গলায় বেশ মোটা একটা সোনার মালা ঝুলছে হুমায়ুনের সামনে হাজির করা হয়। পায়ের নীচের ময়লা আর পাথর সম্পর্কে আপাতদৃষ্টিতে উদাসীন লোকটা হুমায়ুনের সামনে, মুখ নীচের দিকে রেখে, দুহাত প্রসারিত করে নিজেকে প্রণত করে, সে তখনও নিজের বিশাল কালো ঘোড়ায় উপবিষ্ট জন্তুটা অস্থির ভঙ্গিতে সামনের পায়ের খুর দিয়ে পাথুরে জমিতে ক্রমাগত বোল তুলছে।
