হামিদার কথা বলার মাঝে, হুমায়ুন অনুধাবন করে কেন আরো অনেক মেয়েকে চেনার পরেও হামিদাই কেন তাঁর জীবনের সত্যিকারের ভালোবাসা। হুমায়ুন তাঁকে অধীর আবেগে আলিঙ্গন করে এবং তাঁর একত্রে দীর্ঘ সময়ব্যাপী নাজুক এক রতিক্রিয়ায় বিভোর হয়ে উঠে।
হুমায়ুন জোর করে নিজেকে বর্তমানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। তার সিদ্ধান্তের কথা ছেলেকে জানাবার সময় হয়েছে। আকবর, আমি আমাদের উত্তরাধিকার প্রাপ্তি উদ্ধার করতে যাচ্ছি, তুমি কি আমার সাথে যেতে আগ্রহী?
আকবর ক্ষণিকের তরে ইতস্তত না করে সহজসরল ভঙ্গিতে উত্তর দেয়, হ্যাঁ, আব্বাজান।
তোমার কি একটুও ভয় করছে না?
ভয় একটু করছে, কিন্তু আমি মনে মনে জানি যে এটাই যুক্তিসঙ্গত। এটাই আমার নিয়তি… তাছাড়া, এবং তাঁর চোখে মুখে বালকসুলভ একটা হাসি ফুটে উঠে, দারুণ একটা অভিযানের অভিজ্ঞতা হবে এবং সব অভিযানেই বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে যা আমি ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছি। আপনাকে এবং আমার আম্মিজানকে আমার জন্য গর্ববোধ করতে আমি বাধ্য করবো।
তুমি সেটা করবে, আমি জানি।
ইত্যবসরে, তবকিরা নীচে দিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ভঙ্গিতে সারিবদ্ধভাবে নীচে দিয়ে কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে যায়, তাঁদের কেউ কেউ ঘোড়ার পিঠে উপবিষ্ট অবস্থায় রয়েছে আর তাঁদের লম্বা আয়ুধ ঘোড়ার পর্যানের সাথে বাঁধা আর অন্যরা বন্দুক কাঁধে নিয়ে হেঁটে চলেছে।
আব্বাজান, পদাতিক সৈন্যরা কিভাবে মূল বাহিনীর সাথে তাল মিলিয়ে চলে?
কামানবাহী ষাড়ের গাড়ির মতো দ্রুত গতিতে তারা হাঁটতে পারদর্শী। তাছাড়া, অগ্রসর হবার সাথে সাথে আমরা আরো ঘোড়া সংগ্রহ করবো। আমরা কাবুলের মতো নদীগুলোতে ভেলা ব্যবহার করে আমাদের যাত্রার গতি বৃদ্ধি করবো আর কামান এবং ভারী মালপত্র বহন করবো। যারা পায়ে হেঁটে চলেছে, ভেলাগুলোতে তারা আরোহন করতে পারবে। কাবুল নদীর জন্য আমি ইতিমধ্যে ভেলা নির্মাণের আদেশ দিয়েছি, যেগুলোতে দাঁড় টানার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার সাথে দিক নির্দেশনার জন্য হাল থাকবে।
দুই রাত পরের কথা, হুমায়ুন হামিদার নিরাভরণ মসৃণ দেহের উপর আড়াআড়িভাবে হাত রেখে শুয়ে রয়েছে। তারা কিছুক্ষণ আগেই ভালোবাসার আর্তি মিটিয়েছে এবং হুমায়ুন অনুভব করে যে সঙ্গমের আবেশে আগে কখনও তাঁদের নিজেদের সত্যিকারের একক সত্ত্বা বলে মনে হয়নি। এর পেছনে সম্ভবত একটাই কারণ রয়েছে যে তারা দুজনেই জানে যে আগামীকাল সকালবেলা হুমায়ুন আর আকবর তাঁদের হিন্দুস্তান অভিযানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে।
হামিদা এক কনুইয়ের উপরে ভর দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় হুমায়ুনের কালো চোখের দিকে পরম ভালোবাসায় সিক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আপনি নিজেকে এবং আমাদের সন্তানকে রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, তাই না? আপনি যতটা অনুধাবন করেন প্রাসাদে অপেক্ষমান আর পরবর্তী অশ্বারোহী ডাকের জন্য উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা একজন মেয়েমানুষ হওয়াটা তারচেয়েও কঠিন একটা কাজ, বিশেষ করে ডাক বহন করে আনা লোকটার মুখ পর্যবেক্ষণ করে যদি মনে হয় তাঁর মুখাবয়ব আলাদা মনে হচ্ছে, তখনই কল্পনার সূতো জট পাকাতে শুরু করে যাত্রার ধকলের কারণে তাঁকে এমন দেখাচ্ছে, নাকি কোনো খারাপ খবর আছে। আপনি মাঝে মাঝে বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করার সময় দূরে কোথাও কি ঘটছে আন্দাজ করার চেষ্টা করেন, যদিও ভালো করেই জানেন ভালো মন্দ যে খবরই আসুক সেটা কয়েক সপ্তাহের পুরান এবং আপনি যে প্রিয়জনের কথা চিন্তা করছেন সে হয়ত ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে এবং নিজের অজান্তেই আপনি একজন বিধবা।
হুমায়ুন তাঁর তর্জনী দিয়ে আলতো করে হামিদার ঠোঁট স্পর্শ করে এবং তারপরে সেখানে সজোরে দীর্ঘ একটা চুম্বন এঁকে দেয়। আমি জানি আকবর আর আমি বেঁচে থাকবো- তারচেয়েও বড় কথা- যে আমরা বিজয়ী হব এবং আগ্রার রাজপ্রাসাদে তুমি হবে আমার সম্রাজ্ঞী। আমি আমার অন্তরের গভীরে এটা অনুভব করি। আমার অতীত ব্যর্থতার গ্লানি মোচনের আর আমার আব্বাজানের সিংহাসন পুনরুদ্ধার করে আকবরের জন্য সেটাকে নিরাপদ করার এটাই মোক্ষম সুযোগ, এবং আমি এই সুযোগটা গ্রহণ করবো।
হামিদা মৃদু হাসে এবং হুমায়ুন তাঁকে আবারও কাছে টেনে নিয়ে আবার তারা ভালোবাসার আদিম খেলায় মেতে উঠে, প্রথমে মৃদু মন্থর ভঙ্গিমায় ধীরে ধীরে আবেগের মূচ্ছনায় সর্বগ্রাসী জোয়ারের সুর জেগে উঠে।
*
সিন্ধু নদীর দক্ষিণ তীরে হুমায়ুন তাঁর বিশাল কালো ঘোড়ার পিঠে বসে রয়েছে। উত্তরের হিমালয় থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাসের ঝাপটায় তার মাথার চুল এলোমেলো হয়ে যায়। সে উত্তরের তীরের দিকে তাকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষ। আর ঘোড়া চলাচলের ফলে যা ইতিমধ্যে আঠাল কাদায় পরিণত হয়েছে তাঁর বিশাল ব্রোঞ্জের কামানের একটা টানার জন্য নিয়োজিত ষাড়ের দলের গলার কাঠের সংযোজক ধরে তার গোলন্দাজ বাহিনীর বিশজনের মতো সৈন্য টেনে তুলতে চেষ্টা করছে। লোকগুলো তাদের হাতের চাবুক আর সেইসাথে বাহবা ধ্বনি দিয়ে অনিচ্ছুক জন্তুগুলোকে হুমায়ুন আর তার লোকেরা নদীতে দুলতে থাকা ভেলা আর নৌকার যে সেতু তৈরী করেছে তার উপরে পা রাখতে প্ররোচিত করতে চেষ্টা করছে, সেতুটা এই স্থানে প্রায় দুইশ ফিট প্রশস্ত।
