আমাদের সন্তানের খাতিরে যেন তাই হয় সেটা নিশ্চিত করবেন।
হামিদার চোখে মুখে এমন দৃঢ় সংকল্পের অভিব্যক্তি হুমায়ুন আগে কখনও লক্ষ্য করেনি। সে তাকে আর হতাশ করবে না।
*
১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাস, হুমায়ুনের সদ্য নিযুক্ত সেনাবাহিনী তার সামনে দিয়ে কুচকাওয়াজ করে অতিক্রম করার সময়ে, শরতের শীতের হাত থেকে বাঁচতে ফারের আস্তরণযুক্ত একটা আলখাল্লায় নিজেকে শক্ত করে জড়িয়ে, সে কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের ছাদে আকবরকে পাশে নিয়ে পিঠ সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমাদের প্রতিনিধিরা দারুণ কাজ করেছে। আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের সব এলাকা থেকে তাঁরা লোক সংগ্রহ করে এনেছে। ধুসর-ত্বকের অধিকারী ঐ লোকগুলো গজনী থেকে এসেছে। কালো পাগড়ি আর মুখের উপরে কাপড় দেয়া লোকগুলো কান্দাহারের উত্তরের পাহাড়ী এলাকা থেকে এসেছে। বাদখশান আর তাজিখ এলাকায় আমাদের অনুগত জায়গীরদারেরা সৈন্য পাঠিয়েছে। তাঁদের সবসময়ে সাহসী আর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং সেইসাথে সুসজ্জিতও বটে। লক্ষ্য করে দেখো তাঁদের ঘোড়াগুলো কেমন তাগড়া।
কিন্তু আব্বাজান ওখানে ঐ হলুদ নিশানের নিচে কারা দাঁড়িয়ে রয়েছে?
তারা ফারগানা- তোমার দাদাজানের জন্মস্থান থেকে এসেছে। ইসলাম শাহের মৃত্যুর গুজব শুনেই অনাহূতের ন্যায় তারা কাবুলের পথে রওয়ানা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা আমার অধীনে নিয়োজিত করার অভিপ্রায়ে, জানে যে আমি নিশ্চিতভাবেই হিন্দুস্তান আক্রমণ করবো… হুমায়ুন বাক্যের এই পর্যায়ে কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকে, আবেগে তাঁর কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এসেছে, এবং তারপরে আবেগ সামলে নিয়ে সে আবার শুরু করে, তোমার দাদাজানের ন্যায় আমিও তাদের নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ের পথে ধাবিত করবো। কিন্তু অশ্বারোহী তিরন্দাজদের ঐ দলটাকে লক্ষ্য করেছো? তারা বোখারা আর সমরকন্দের আশেপাশের এলাকা থেকে এসেছে এবং আমাদের মহান পূর্বপুরুষ তৈমূরের নিশানের অনুকরণে তাঁরা নিজেদের সজ্জিত করেছে- তাকিয়ে দেখো কমলা রঙের বাঘ সম্বলিত নিশানটা কেমন পতপত করে উড়ছে…
আমাদের সৈন্য সংখ্যা কত?
বারো হাজার।
আমার দাদাজান যখন হিন্দুস্তান অভিযানে রওয়ানা হয়েছিলেন তখন তার সাথে অনেকবেশী সৈন্য ছিল।
সত্যি কথা, কিন্তু আমাদের সাথে তখনকার তুলনায় অনেক বেশী কামান, আর বন্দুক রয়েছে এবং প্রতিদিনই আমাদের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের কাছে সংবাদ আছে যে ইসলাম শাহের অনেক জায়গীরদার হিন্দুস্তানে তাঁদের সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়া মাত্র আমাদের সাথে যোগ দেবে।
কিভাবে আপনি এতো নিশ্চিত এই ব্যাপারে?
হুমায়ুনের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। বহু বছর পূর্বে তাঁদের পিতার ঠিক যেমন আমাকে পরিত্যাগ করেছিল, তাঁদের বিশ্বাস তারা জানে কে শেষপর্যন্ত বিজয়ী হবে?
তার মানে আমাদের সাফল্যের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাসই আমাদের বিজয়ী করবে?
হ্যাঁ- তোমার চারপাশের লোকেরা তোমার সাফল্যের ব্যাপারে আস্থাশীল হলে বিজয়ের পথে তুমি অনেকদূর এগিয়ে যাবে। এই আস্থা একবার নষ্ট হয়ে গেলে সেটা পুনরুদ্ধার করা ভীষণ কঠিন। এই একটা শিক্ষা আমি বহু মূল্যে শিখেছি। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে এইবার যেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। আমাদের অর্জিত প্রতিটা বিজয়ে আস্থার জোয়ার ফুলে ফেঁপে উঠে আমাদের প্রতিপক্ষের অবশিষ্ট শক্তিটুকুও ধুয়ে মুছে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
আব্বাজান, আমি বুঝতে পেরেছি।
হুমায়ুন তাঁর সন্তানের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করে যে আকবর হয়তো আসলেও বুঝতে পেরেছে। গত এক বছরে তার ভিতরে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তার দৈহিক গড়ন আর আকৃতির কারণেই কেবল না, তাঁর বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আর অন্যদের বিচার করার ব্যাপারে তাঁর ক্রমশ বাড়তে থাকা বিচক্ষণতাবোধের কারণে বয়সের তুলনায় তাকে অনেক পরিণত মনে হয়। হুমায়ুন গত রাতে হামিদার সাথে তাঁর আলোচনার কথা স্মরণ করে যখন, সে তাঁকে জানায় যে কয়েকদিনের ভিতরে সে যখন হিন্দুস্তান অভিযানে রওয়ানা দিবে তখন তার ইচ্ছা সে আকবরকে সাথে করে নিয়ে যাবে। সে হামিদাকে মনে করিয়ে দেয় যে বাবর আকবরের বয়সীই ছিল যখন সে রাজা হয়েছিল। সে তাকে বলে যে আকবরকে তার সাথে নিয়ে গেলে রাজবংশের ভবিষ্যতের ব্যাপারে আস্থা জোরদার হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে ইসলাম শাহের মতো তাঁর পতন ঘটলে সবাই দেখবে যে তার একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী রয়েছে।
হুমায়ুন আশা করেছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে আকবরকে যেসব বিপদের সম্মুখীন হতে হবে সেসবের কথা চিন্তা করে, হামিদা প্রতিবাদ করবে কিন্তু যদিও তার চোখ প্রথমে ঠিকই অশ্রুসজল হয়ে উঠে কিন্তু সে প্রাণপন চেষ্টায় নিজেকে সামলে নেয়। আমি জানি সে আপনার সাথে গেলে সেটাই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। একজন মায়ের পক্ষে নিজের ছেলেকে যুদ্ধযাত্রা করতে দেখাটা ভীষণ কঠিন একটা ব্যাপার কিন্তু সে অচিরেই প্রাপ্তবয়স্ক যুবকে পরিণত হবে। আমার উচিত নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়া যে আমার বয়স মাত্র দুই বেশী ছিল যখন আমি আমার পরিবার পরিজন ত্যাগ করেছিলাম- আপনার জীবন আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট নানা বিপদ বরণ করে নিতে বিষয়টা নিয়ে আমি কখনও অনুতপ্ত হইনি।
