ভ্রমণকারীদের একজন এই সীলমোহর করা বার্তাটা নিয়ে এসেছে, সে আমাদের প্রহরীদের কাছে বলেছে কেবল আপনার দেখার জন্য এই বার্তাটা। সে বলেছে তার পরিবারের একজন সদস্য- একজন নাবিক যে সম্প্রতি আরব থেকে ফিরে এসেছে এবং সে কাবুল যাচ্ছে শুনে তাঁকে অনুরোধ করেছে চিঠিটা আপনাকে পৌঁছে দিতে। সুলতান, বিষয়টা হয়ত কিছুই না কিন্তু আমার মনে হয়েছে। আপনার এটা খোলা উচিত।
আহমেদ খান, আপনাকে ধন্যবাদ। আমি কক্ষে ফিরে গিয়েই বার্তাটা পাঠ করবো।
সোয়া ঘন্টা পরে, হুমায়ুন জেনানাদের আবাসন এলাকায় প্রবেশ করে এবং সরাসরি হামিদার কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়। হামিদা মুখ তুলে তাকিয়ে বলে, আমি শুনলাম হিন্দুস্তান থেকে ভালো খবর এসেছে…।
হুমায়ুন স্মিত হাসে, কিন্তু তার হাসি আর চোখের দৃষ্টিতে বিষণ্ণতার মেঘ ভীড় করে থাকে। হিন্দুস্তানের সংবাদ আসলেই ভালো কিন্তু আমি আজ আরেকটা মনখারাপ করা সংবাদ পেয়েছি। খবরটা আসকারি সংক্রান্ত। তুমি নিশ্চয়ই জানো, আঠার মাস আগে পবিত্র ভূমি মক্কায় যাবার জন্য কাম্বে থেকে জাহাজে আরোহন করার পরে, আমি তার আর কোনো সংবাদ না পেয়ে অনেকদিন থেকে থেকেই। আশঙ্কা করছিলাম যে সে হয়তো কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। আমি আজ তার ভাগ্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি…
আহমেদ খান তাঁকে যে কাগজটা দিয়েছিল হুমায়ুন সেটা তাঁর আলখাল্লার পকেট থেকে বের করে আনে। কাগজটায় অসংখ্য ভাঁজ আর সেটা কুঁচকে গিয়েছে। বার্তাটার প্রেরক মোহাম্মদ আজহারুদ্দিন- আমার ভাইয়ের দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান হিসাবে আমি যাকে পাঠিয়েছিলাম। বার্তাটায় সংক্ষেপে বলা হয়েছে কিভাবে কাম্বে থেকে যাত্রা শুরু করার পরে অনুকূল বাতাসের বরাভয়ে তারা কেমন দ্রুতগতিতে মক্কার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছিল, তারা আরব উপকূলে অবস্থিত সালালা বন্দর থেকে যখন মাত্র বিশ মাইল দূরে অবস্থান করছে, এমন সময় জলদস্যুদের তিনটি দ্রুতগতিসম্পন্ন জাহাজের একটা বহর তাঁদের ধাওয়া করে ধরে ফেলে। জলদস্যুরা জাহাজে উঠতে চেষ্টা করলে আসকারি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় কিন্তু প্রতিপক্ষের সংখ্যার কাছে সে পরাজিত হয় এবং তরবারি হাতে মৃত্যুবরণ করে। তাঁর সাথে আরো অনেকেই মৃত্যুবরণ করে। মোহাম্মদ আজহারুদ্দিন মারাত্মকভাবে আহত হন এবং অবশিষ্ট দেহরক্ষী আর তাদের সাথে থাকা টাকাপয়সাসহ বন্দি হন। তিনি সুস্থ হলে মাস্কাটের বিশাল ক্রীতদাসের বাজারে শহরের বাইরে অবস্থিত খনিতে কাজ করার জন্য তাঁকে বিক্রি করে দেয়া হয়। ছয়মাস পূর্বে তিনি বন্দিদশা থেকে পলায়ন করেন এবং দেশে ফিরে আসবার পূর্বে তিনি প্রথমেই এই বার্তাটা আমার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।
আল্লাহতালা নিশ্চয়ই আসকারিকে তার কৃতকর্মের জন্য মার্জনা করে এবং তার আত্মাকে বেহেশত নসীব করবেন, হামিদা বলে। সে কিছুক্ষণ পরে আবার বলে, সে যাই হোক, তাঁর মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিতভাবে পাবার পরে আপনি একটা দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেলেন যে নির্বাসিত অবস্থায় আপনার বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র করার জন্য সে আত্মগোপন করেনি।
কথা সত্যি, কিন্তু সে কখনও কামরানের মতো জাত প্রতিপক্ষ ছিল না এবং আমার প্রায়ই মনে হয় নিজের ভাই আর মায়ের প্রতি আনুগত্য থেকেই সে আমার বিরুদ্ধাচারণ করেছে। হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার পূর্বে সে বলেছিল বিদ্রোহের সব ভাবনা সে ত্যাগ করেছে। আমি তখন তার কথা বিশ্বাস করেছিলাম। তাঁর মৃত্যু আমাকে আরও সচেতন করে তুলেছে যে আমার আব্বাজান তার পরিবারের জন্য যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটা পূরণ করার জন্য এখন কেবল আমি একাই বেঁচে রয়েছি।
আপনি অনেকদিন ধরেই তাঁর স্মৃতির প্রতি বিশ্বস্ত তার একমাত্র সন্তান।
কিন্তু আমি তার গড়ে তোলা সাম্রাজ্যের বিশাল অংশ হারিয়েছি এবং সেটা পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছি, তাঁর রাজত্ব বৃদ্ধি করার কথা না হয় বাদই দিলাম। আমি তোমার এবং আমার নিজের, আর সেই সাথে আমার আব্বাজানের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছি। আমার নিয়ত পবিত্র ছিল কিন্তু আমি একাগ্রচিত্তে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট প্রয়াস নেইনি।
পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। হজ্জের উদ্দেশ্যে আসকারি আর কামরান রওয়ানা হবার পর থেকে আমি আপনার ভিতরে সত্যিকারের দৃঢ়সংকল্প লক্ষ্য করছি। আপনি এখন আর নিছক আমোদ কিংবা অলস কল্পনায় নিজের মনকে বিভ্রান্ত হতে দেন না। আপনি সবসময় চেয়েছেন যা আপনার নিজের সেটা উদ্ধার করতে, কিন্তু সময় আর একাগ্রতা নিয়ে আপনি এখন সেটা অর্জনের জন্য চেষ্টা করছেন।
আমিও সেটাই আশা করি। আমি কিভাবে আমার সিংহাসন হারিয়েছি, আকবরকে যখন আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল তখন আমাদের সবচেয়ে হতাশ সময়ে তোমার মুখ, বরফে জমে আর অর্ধভুক্ত অবস্থায় শাহের শরণার্থী হিসাবে আমরা পারস্য গমন করেছিলাম, এইসব তিক্ত স্মৃতিগুলো অঙ্কুশের মতো ব্যবহার করে আমি হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধারে আমার সমস্ত শক্তি নিবদ্ধ করেছি।
আপনি সাফল্য লাভ করছেন। আমি জানি আপনি কেবল এক কদম অগ্রসর হবার কথাই চিন্তা করেন না, বরং পুরো যাত্রাপথের পরিকল্পনা আপনার মাথায় রয়েছে।
আমি প্রার্থনা করি এটা যেন আমাকে আমার সিংহাসনের কাছে পৌঁছে দেয়।
