কিন্তু হুমায়ুন দারুণ ক্ষিপ্র আর সে গড়িয়ে নীচ থেকে সরে যায়। বায়েজিদ খান গালিচার উপরে আছড়ে পড়তে হুমায়ুন তাঁর পিঠের উপর লাফিয়ে পড়ে এবং নিজের হাঁটু তার পিঠে চেপে ধরে বায়েজিদের দুই হাত পেছন দিকে টেনে ধরে। বায়েজিদ খান যতই ধ্বস্তাধ্বস্তি করুক, সে নিজেকে হুমায়ুনের হাত থেকে মুক্ত করতে পারে না। সুলতান, অনেক হয়েছে। আপনি দ্বিতীয়বারের মতো আমাকে পরাস্ত করেছেন।
আমার মনে হয়, প্রথমবারের মতো। আমার তীব্র সন্দেহ আছে যে আগেরবার তুমি আমাকে জিতিয়ে দিয়েছিলে কিন্তু এবার আমিই জিতেছি।
সুলতানের সন্দেহ হয়ত অমূলক না।
ফাঠেহুমায়ুন তাঁর মালিশ কক্ষে ফিরে আসে এবং মল্লযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাঁর পরিচারকেরা উষ্ণ, কর্পূর-সুবাসিত পানি দিয়ে তামার যে আয়তাকার বিশাল স্নানের পাত্র ভরে রেখেছে সেটায় নিজের ঘাম আর তেলে চকচক করতে থাকা দেহ ধুয়ে নিজেকে পরিষ্কার করে। সে সুতির একটা মোটা তোয়ালে দিয়ে নিজেকে শুষ্ক করে চন্দন-সুবাসিত চক পাউডার দেহে ছিটিয়ে দেয়ার ফাঁকে, সে সামনের বার্নিশ করা আয়নায় নিজের নগ্ন দেহের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাঁর পেশীসমূহ একমাস আগের তুলনায় এখন অনেক বেশী স্পষ্ট আর সুগঠিত। সে ভাবে তাকে দেখে মনেই হয় না সে ছেচল্লিশ বছরের একজন বৃদ্ধ, এবং তার মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠে। শারীরিক কসরতটা বোধহয় তাঁকে সাহায্য করছে তার মনকে কেন্দ্রীভূত করতে এবং পরিষ্কার করে চিন্তা করতে। একারণেই সে আরও ঘনঘন রতিক্রিয়ায় মিলিত হতে পারছে।
হুমায়ুন তাঁর পরিচারকদের সহায়তায় দ্রুত পোষাক পরিধান করে তাঁর পরামর্শদাতাদের সাথে বৈঠকে মিলিত হবার জন্য প্রস্তুত হয়। কয়েক মিনিট পরে, সোনার বকলেশ দেয়া গাঢ় নীল রঙের টিউনিক আর সম্মুখভাগে ময়ূরের লম্বা পালক শোভিত দুধ সাদা রঙের পাগড়ি পরিধান করে সে মন্ত্রণা কক্ষে প্রবেশ করে।
আহমেদ খান, হিন্দুস্তানের সর্বশেষ খবরাখবর কি? আজ সকালে কি আরেকটা কাফেলা আসেনি?
জ্বী, সুলতান। কাফেলাটা আমাদের জন্য যা সুসংবাদ সেটাই এসে নিশ্চিত করেছে। ইসমাইল শাহের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশ নেই। তারচেয়েও বড় কথা, আজকের কাফেলার সাথে আগত ধনাঢ্য এক ব্যবসায়ী বলেছে যে দিল্লীর আশেপাশে সিংহাসনের তিন দাবীদারের ভিতরে লড়াই শুরু হয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অভাবে ডাকাতেরা অবাধে ডাকাতি করছে, রাতের বেলা ধনবান ব্যক্তিদের বাড়িতে হামলা করে খুন, ধর্ষণ আর ডাকাতি করছে। আমাদের এই বণিক তাঁর সম্পদের কিছুটা লুকিয়ে রেখে, বাকি সম্পদ আর পরিবার সাথে নিয়ে কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিয়ে উত্তরে আপনার রাজ্যে নিরাপত্তার আশায় এসেছে, যতক্ষণ না হিন্দুস্তানে কি ঘটছে তিনি বুঝতে পারেন। কাফেলার অন্য সদস্যরা তার কথার সপক্ষে গোলযোগের নানা প্রাসঙ্গিক বর্ণনা দিয়েছে। একজন বলেছে যে ডাকাতেরা গেঁটেবাতে আক্রান্ত এক ধনী বৃদ্ধার আঙ্গুল থেকে মূল্যবান আংটি খুলতে না পেরে, তার আঙ্গুলটাই কেটে ফেলেছে এবং রক্তক্ষরণের ফলে মারা যাবার জন্য তাঁকে ফেলে রেখে গিয়েছে।
সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা যে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, লড়াই আর অরাজকতার ফলে আমরা সেই কাঙ্খিত সুযোগ লাভ করবো এবং আমাদের ন্যায়সঙ্গত রাজ্যের অধিবাসীদের ন্যায়বিচার আর আইনের শাসন ফিরিয়ে দিতে পিরবো। এই তিন দাবীদার সম্বন্ধে আমরা কি জানি?
একজন আদিল শাহু, ইসমাইল শাহের প্রিয়তমা স্ত্রীর ভাই- তার পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র সন্তানের জননী। আদিল শাহ্ ক্ষমতার লোভে এতোটাই উন্মত্ত হয়ে উঠেছে যে সে রক্তের সম্পর্কের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে হারেমে প্রবেশ করে এবং মাংসের জন্য কসাই যেভাবে পশু জবাই করে সেভাবে সে নিজের বোনের সামনে তাঁর সন্তানের গলা কেটে তাঁকে হত্যা করে। সে তারপরে নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে।
হুমায়ুন বিরক্তিতে মুখ কুচকায়। কামরানের পক্ষেও এতটা নীচে নামা অসম্ভব ছিল। আর বাকি দুজন?
ইসমাইল শাহের আত্মীয় সম্পর্কিত এক ভাই এদের ভিতরে সবচেয়ে শক্তিশালী, যে সিকান্দার শাহ্ হিসাবে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেছে। সে আদিল শাহকে ইতিমধ্যে যুদ্ধে একবার পরাজিত করেছে কিন্তু নিজের বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে তৃতীয় দাবীদার, তার্তার খান, আমরা যাদের পরাস্ত করেছিলাম সেই পুরাতন লোদী বংশের বর্তমান প্রধান এবং গুজরাতের সুলতানের সাথে মিলিত হয়ে যে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তার কর্মকাণ্ডের কারণে।
এদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে- কারা তাঁদের শত্রু আর মিত্র, তাঁদের ব্যক্তিগত শক্তি আর দূর্বলতা, তাঁদের সৈন্যসংখ্যা, কত টাকা আছে, সবকিছু আমাদের জানতে হবে।
আমরা সম্প্রতি আগত পর্যটকদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করবো। এবং সেই সাথে অবশ্যই আরো বেশী সংখ্যায় গুপ্তদূত আর গুপ্তচর প্রেরণ করবো।
আমাদের অভিযান পরিকল্পনা বিস্তারিত আলোচনার উদ্দেশ্যে আমরা আগামীকাল আবার আলোচনা শুরু করবো। হুমায়ুন মন্ত্রণাকক্ষ ত্যাগ করার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। সে ঘুরে দাঁড়াবার মাঝেই অবশ্য আহমেদ খান তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে একটা ছোট চারকোণাকৃতি কাগজ হুমায়ুনের হাতে গুঁজে দেয়।
