অনুমিত দিলাম, হুমায়ুন বলে, আমি তোমার জন্য দোয়া করবো। সে কথা বলার সময় অনুভব করে কান্নায় তার গাল ভিজে যাচ্ছে। সে অনুধাবন করে, সে কাঁদছে খানিকটা, সে আর তাঁর সৎভাই সামান্য সময়ের জন্য যে নিষ্পাপ সময় অতিবাহিত করেছিল সেটা হারাবার বিষণ্ণতাবোধ থেকে আর খানিকটা নিজেদের ভিতরে যুদ্ধ করে নষ্ট করা সময়ের কথা চিন্তা করে যখন তারা একসাথে তাদের আব্বাজানের সাম্রাজ্য উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে পারতো, আর খানিকটা গতরাতে তার ইঙ্গিতে কামরানকে যে কষ্ট দেয়া হয়েছে সেটা ভেবে। তার অশ্রুধারা, অবশ্য একইসাথে, একটা প্রগাঢ় আর সর্বব্যাপী স্বস্তি প্রতিফলিত করে। সে আরো একবার হিন্দুস্তানের পাদিশাহ হতে, এমনকি নিজের সাম্রাজ্য বৃদ্ধি করতে আর বাবর যে মহান সাম্রাজ্য স্থাপণের স্বপ্ন দেখেছিল সেটা অর্জনে স্বাধীনভাবে মনোনিবেশ করতে পারবে।
৪.৪ উষ্ণ রুটি
২৪. উষ্ণ রুটি
সুলতান, ইসলাম শাহ মৃত। হিন্দুস্তানের সিংহাসন শূন্য।
অঙ্গসংবাহক যখন তার পিঠের উপরের অংশে সুগন্ধি নারিকেলের তেল ঘষে দলাইমলাই করে, হুমায়ুন- ছয় সপ্তাহ পূর্বে- যখন উত্তেজিত আহমেদ খানের কাছ থেকে সে শব্দগুলো শুনেছিল, তখনকার কথা স্মরণ করে হাসে। পরবর্তী দিনগুলোতে, হিন্দুস্তান থেকে খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে আগত ভ্রমণকারীদের বয়ে আনা গুজব আরো জোরাল হতে থাকে। তাদের কেউ বলে যে ইসলাম খান কয়েক মাস পূর্বে আকষ্মিকভাবে মারা গিয়েছে এবং তার সমর্থকেরা যখন একজন উত্তরাধিকারীর ব্যাপারে মতৈক্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করছে তখন কিছু সময়ের জন্য হলেও সাফল্যের সাথে বিষয়টা তারা গোপন করতে পেরেছে। প্রতিটা দিন এবং প্রতিটা সংবাদ সম্পর্কে অতিবাহিত হবার সাথে সাথে, হুমায়ুনের ভিতরে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হতে থাকে। সে অনুভব করে তার সিংহাসন পুনরুদ্ধারের বিশাল একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। সে যদি কাবুল ত্যাগ করে তাহলে তার সৎ-ভাইদের কাছ থেকে কাবুলের জন্য কোনোরকম হুমকির উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত হয়ে, সে এই সুযোগটা গ্রহণ করতে পারে এবং তাঁর হতাশা আর নির্বাসনের লম্বা বছরগুলোর একটা সমাপ্তি ঘটাতে পারে।
সে অতিসত্ত্বর অভিযানের জন্য নিজের বাহিনী প্রস্তুত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করে। এই মুহূর্তে, দূর্গপ্রাসাদের প্রাচীরের বাইরে, তাঁর আধিকারিকেরা তার তবকিদের গুলিবর্ষণের গতি বৃদ্ধি করতে এবং শৃঙ্খলার সাথে অস্ত্রে বারুদ, আর গুলি ভর্তি করতে এবং নিশানা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা রপ্ত করাতে কসরত করছে। তার রাজ্যের প্রত্যন্ত উপত্যকায় আর রাজ্যের বাইরে তার লোকেরা অতিরিক্ত সৈন্য সগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে। অঙ্গসংবাহক এখন হুমায়ুনের উরু আর নিতম্বে উপযুপরি মুষ্ঠাঘাত করছে যা তাঁর শারীরিক আর মানসিক প্রস্তুতির অংশ। নিজের অভিযান পরিকল্পনায় দিক নির্দেশনা লাভ করতে সে তাঁর আব্বাজানের হিন্দুস্তান আক্রমণের স্মৃতিকথা আবার পড়তে শুরু করেছে এবং তাঁর নিজের অভিযানের স্মৃতির সাথে সেগুলো তুলনা করছে।
শেরশাহের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযানে সে কোথায় ভুল করেছিল এবং অন্যত্র যেমন গুজরাতে সে কেন সাফল্য লাভ করেছিল সেটার বোঝার জন্য সে তার সেনাপতিদের সাথে, বিশেষ করে আহমেদ খানের সাথে দীর্ঘসময় আলোচনা করেছে। নিজের কক্ষে একাকী বসে থাকার সময় একদিন সন্ধ্যা নামার বেশ কিছুক্ষণ পরে সে নিজের জন্য পুরো ব্যাপারটার একটা সংক্ষিপ্তসার প্রস্তুত করে। ভালোমতো প্রস্তুতি গ্রহণ কর, দ্রুত আর নিশ্চায়করূপে চিন্তা আর কাজ কর। তোমার মোকাবেলা করতে তোমার প্রতিপক্ষকে বাধ্য কর এবং কখনও যেন এর বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি না হয়।
বিগত বছরগুলোতে সে আবারও নিজেকে গজনীর সুরা উপভোগ করার অনুমতি দিয়েছে এবং কাবুল দখল করার পর থেকে সে মাঝে মাঝে কেবল আফিমের উদ্বেগ-হরণকারী স্বস্তির পরিচর্যা গ্রহণ করে। যুদ্ধের কঠোরতার জন্য নিজের দেহকে শক্ত আর মনকে শাণিত করতে এখন নিজের ভিতরে একটা ব্যাপক টানাপোড়েনের পড়ে আর ইচ্ছাশক্তির বিপুল প্রয়োগ ঘটিয়ে সে আফিম আর সুরা দুটো গ্রহণ করা থেকে নিজেকে বিরত করেছে। সে আবারও মল্লযুদ্ধ শুরু করেছে এবং অঙ্গসংবাহক তাঁকে তাঁর প্রতিদিনের কসরতের জন্য প্রস্তুত করছে। দ্রুত একটা ইশারা করে লোকটাকে তার কাজ বন্ধ করতে বলে, হুমায়ুন গড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে তারপরে উঠে দাঁড়ায়। সে সুতির লম্বা একটা পাজামা কোমড়ে গলিয়ে নেয়, লড়াইয়ের সময় তাঁর পরণে কেবল এটাই থাকে, এবং মসৃণ হলুদ মসলিনের পর্দার ভিতর দিয়ে পাশের কামরার দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে লম্বা, পেষল দেহের অধিকারী এক বাদখশানি, তাঁর প্রতিপক্ষ, একইরকম পোষাক পরিহিত অবস্থায় এবং তেল মালিশ করে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
বায়েজিদ খান, একদম ইতস্তত করবে না। হুমায়ুন মৃদু হাসে। তুমি আমাকে দারুণ শিখিয়েছে। আমাকে যদি দশ মিনিটের ভিতরে পরাস্ত করতে পার তাহলে তোমার জন্য মোহর ভর্তি একটা থলি অপেক্ষা করছে। এখন চলো বিষয়টা নিষ্পত্তি করা যাক।
দুইজন লোক বৃত্তাকারে পরস্পরের চারপাশে ঘুরতে থাকে, কে প্রথম আক্রমণ করে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করে। হুমায়ুনই প্রথম দ্রুত সামনে এগিয়ে এসে বায়েজিদ খানের বাহু আকড়ে ধরে তাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলতে চেষ্টা করে। বায়েজিদ খান অবশ্য একটা মোচড় দিয়ে হুমায়ুনের পাঞ্জা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় এবং হুমায়ুনের কাঁধ আকড়ে ধরে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে ভারসাম্যহীন করতে চেষ্টা করে। হুমায়ুন ধাক্কাটা সামলে নেয় এবং দুজনে একে অপরের কাঁধ আকড়ে ধরে, ধ্বস্তাধ্বস্তি করে, নিজেদের শক্তি পরখ করে। তারপরে বায়েজিদ খান হুমায়ুনের হাঁটুর পেছনে চকিতে একটা লাথি মারলে হুমায়ুন হোঁচট খায়। হুমায়ুন মাটিতে পড়ে যায় এবং বায়েজিদ খান মাটির উপরে পাতা গালিচায় তার বাহু চেপে ধরে প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘটাতে হুমায়ুনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
