বাবরের স্মৃতিকথার হাতির দাঁতের মলাট বন্ধ করে, হুমায়ুন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসে। আমার পরামর্শদাতাদের এই মুহূর্তে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো, সে জওহরকে বলে। পাঁচ মিনিটের ভিতরে তাদের সবাইকে তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমার সৎ-ভাইকে অন্ধ করে দেয়া হবে, তার ক্রমাগত অপকর্মের শাস্তি হিসাবে আর সেই সাথে এখানে আমার রাজত্ব আর হিন্দুস্তানে আমাদের অধিকার পুনরুদ্ধারে সে যেন কোনো হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে। আজ রাতে সূর্য অস্ত যাবার একঘন্টা পরে শাস্তি কার্যকর করা হবে। জাহিদ বেগ, এই দায়িত্বটা আমি আপনাকে দিচ্ছি। আমার ইচ্ছা হেকিমের বিবেচনায় সবচেয়ে দ্রুততম পদ্ধতি যেন অবলম্বন করা হয় এবং আমার সৎ-ভাইকে যেন কোনো রকম হুশিয়ারি দেয়া না হয় যাতে করে কি ঘটতে চলেছে সেজন্য সে ভীত হবার সময় না পায়। আমি তার যন্ত্রণা আর কষ্ট দেখতে চাই না। জওহর, আমার পক্ষে তুমি বিষয়টা প্রত্যক্ষ করবে। অবশ্য, কামরানকে যেন জানান হয় যে আমার প্রত্যক্ষ নির্দেশে শাস্তিটা বলবৎ করা হয়েছে এবং এর পুরো দায়দায়িত্ব আমার একার। আগামীকাল মাগরিবের নামাজের কিছুক্ষণ পূর্বে তুমি আমার সৎ-ভাইকে এজন্য আমার সামনে হাজির করবে।
*
সুলতান, জওহর দেড়ঘন্টা পরে এসে জানায়, আপনার আদেশ পালিত হয়েছে। জাহিদ বেগের বাছাই করা ছয়জন লোক কারাকুঠরিতে প্রবেশের পাঁচ মিনিট কি তারও কম সময়ে পুরো ব্যাপারটা শেষ হয়েছে। তাদের ভিতরে চারজন আপনার সৎ-ভাইকে মাটিতে চেপে ধরে একেকজন তার একেক হাত পা চেপে ধরে থাকে। সে যখন ধ্বস্তাধ্বস্তি আর লাথি চেষ্টা করছে তখন পঞ্চমজন- মানুষ না বলে তাকে ভালোক বলাই উচিতোর বিশাল হাতের পাঞ্জায় কামরানের মাথাটা চেপে ধরে এবং মাথাটা স্থির রাখে। ষষ্ঠব্যক্তি আগুনের শিখায় আগেই গনগনে লাল করে রাখা সুইয়ের গোছা নিয়ে দ্রুত আপনার সৎ-ভাইয়ের দুই চোখের মণিতে পর্যায়ক্রমে বিদ্ধ করে। কামরান যন্ত্রণায় যখন বুনো পশুর মতো চিৎকার করছিল, লোকটা তখন তার দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নষ্ট করার জন্য চোখের মণিতে লবণ আর লেবুর রস ঘষে দেয়। সে তারপরে আপনার সৎ-ভাইয়ের চোখে সুতির পরিষ্কার, নরম কাপড় বেঁধে দেয় এবং জানায় যে তাঁকে আর কোনো কষ্ট দেয়া হবে না। তারপরে তাঁরা তাঁকে তাঁর শাস্তি এবং সে প্রাণে বেঁচে থাকবে- যদিও সেটা হবে একটা বিকলাঙ্গ জীবন- এসব বিবেচনা করার জন্য কারাপ্রকোষ্ঠে একাকী রেখে বের হয়ে আসে…
*
পরেরদিন সন্ধ্যাবেলা, মাগরিবের নামাজের কিছুক্ষণ আগে, কামরানকে হুমায়ুনের সামনে এনে হাজির করা হয়। তাঁর চোখে এখন আর পট্টি বাধা নেই এবং হুমায়ুনের আদেশে তাকে গোসল করিয়ে মোগল যুবরাজের উপযুক্ত পোষাক পরিহিত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। হুমায়ুন প্রহরীদের বিদায় করে দেয় এবং কোমল কণ্ঠে কামরানের সাথে কথা বলতে শুরু করে।
আমি হুমায়ুন, তোমার সৎ-ভাই। আমি তোমায় নিশ্চিত করে বলছি কক্ষে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। কামরান যখন দৃষ্টিহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে সে বলতে থাকে, আমি তোমাকে জানাতে চাই যে আমার কেবলমাত্র আমারই আদেশে তোমায় অন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যারা কাজটা সম্পন্ন করেছে তাদের কোনো দোষ নেই। আমি এটা করতে বাধ্য হয়েছি কারণ আমার মনে হয়েছে যে আমি তোমার প্রতি যতই ক্ষমাসুলভ আচরণ করি, তুমি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হবে না আর আমাকে আমার সিংহাসন আর আকবরের ভবিষ্যত এবং আমাদের সাম্রাজ্য রক্ষা করতে হবে। হুমায়ুন চুপ করে থাকে এবং অপেক্ষা করে, খানিকটা হলেও আশা করে কামরান কিছু বলবে বা নিদেনপক্ষে, অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও, তাঁকে আক্রমণ করতে চেষ্টা করবে।
কিন্তু কিছুক্ষণ নিরব থাকার পরে কামরান পরাজয় মেনে নেয়া সুরে কথা বলে। আপনি আমার জীবন বখশ দিয়েছেন কিন্তু একই সাথে আমার কাছ থেকে আমার প্রিয় সবকিছু কেড়েও নিয়েছেন- আমার পরিকল্পনা, আমার উচ্চাশা। আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই। আপনি মহান আর করুণাময় পাদিশাহ হিসাবে এখন আবির্ভূত হতে পারেন যখন আপনি জানেন আমাকে কবন্ধ করে ফেলার চেয়েও নিখুঁতভাবে আপনি আমাকে ধ্বংস করেছেন…
হুমায়ুন কোনো কথা বলে না এবং কামরান কিছুক্ষণ পরে আবার বলতে থাকে। আমি আপনাকে দোষ দেই না। আমি সবসময়ে আপনার ক্ষমাশীলতাকে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেছি এবং জানি আমার শাস্তিই প্রাপ্য। গতকাল রাতে আমি যখন জেগে শুয়েছিলাম আর দৃষ্টিহীন এই চোখের ব্যাথা কমার জন্য প্রার্থনা করছিলাম এবং ভাবছিলাম যে আমি এতদিন যেভাবে জীবনযাপন করেছি সেটার সমাপ্তি ঘটেছে, আমার মনে তখন আরেকটা ভাবনার জন্ম হয়। পুরো ব্যাপারটাই একটু অদ্ভুত কিন্তু আমি যেন কেমন একটা স্বস্তিবোধ করতে থাকি… একটা অনুভূতি, যে অবশেষে, এতোবছর পরে আমি পার্থিব আকাঙ্খার বোঝা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারি। আমি আপনার কাছে। কেবল একটাই জিনিস কামনা করি এবং এটা আমি আন্তরিকতার সাথে চাইছি।
কি সেটা?
আমি এখানে আপনার করুণা বা ঘৃণার পাত্র হিসাবে বা আপনি আমাকে যেমন উদারতা প্রদর্শন করতে চান তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চাই না। আসকারির ন্যায়, আমাকেও মক্কায় তীর্থ করতে- হজ্জ্বে যাবার অনুমতি দিন। আমাকে এটা কিছুটা হলেও হয়তো আত্মিক প্রশান্তি দান করবে।
