মার্জনা করবেন, সুলতান, দড়িগুলো সব জড়িয়ে গিয়েছে।
বেশ তাহলে যত দ্রুত তোমার পক্ষে সম্ভব, হুমায়ুন এবার আগের চেয়ে অনেক মোলায়েম কণ্ঠে বলে, সে বুঝতে পারে বালকের আনাড়িপনা তাঁর ক্রোধের কারণ না, আক্রমণের পথ চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর নিজের হতাশাই তাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। আমরা ওখানে ঐ ছোট্ট টিলার উপরে গাছের ছায়ায় ঘোড়া থেকে নেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেব।
হুমায়ুন ক্লান্ত ভঙ্গিতে পাঁচশ গজ দূরে অবস্থিত গাছপালাবেষ্টিত ক্ষুদ্র এলাকাটার দিকে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এসে ঘোড়া থেকে নামতে নামতে সে টের পায় যে পাহাড়ের উচ্চতা আর নতুন দিক থেকে অবলোকন একেবারে ভিন্ন একটা দৃষ্টিরূপ সৃষ্টি করেছে। সে দেখতে পায় গাছপালার উপরে পাথরের গায়ে একটা গভীর ফাটল রয়েছে যা একেবারে উপর পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্ষার মৌসুমে সম্ভবত এর ভিতর দিয়ে একটা জলপ্রপাত প্রবাহিত হয় কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা শুকনো দেখাচ্ছে। নিমেষে তৃষ্ণা আর হতাশা ভুলে গিয়ে হুমায়ুন গুপ্তদূত প্রধান আহমেন খানকে ডেকে পাঠায় তার কাছে।
তুমি কি ওখানে ঐ ফাটলটা দেখতে পাচ্ছ? তোমার কি মনে হয়? ওটা দিয়ে কি উপরে বেয়ে ওঠা সম্ভব?
সুলতান, আমি ঠিক বলতে পারছি না, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে সম্ভব। আমি নিজে গিয়ে ফাটলটা পর্যবেক্ষণ করছি।
তুমি যাবার আগে আমাদের বাকি লোকেরা যেন গাছপালার আড়ালে থাকে সেটা নিশ্চিত কর। আমরা চাইনা কেউ তাদের দেখতে পাক…এবং আল্লাহ্ ভরসা।
শুকরিয়া, সুলতান আহমেদ খান তার পর্যান থেকে একজোড়া চামড়ার জুতো বের করে। পাথরের গায়ে ভালো করে আকড়ে ধরার জন্য জুতোর তলিতে চামড়ার অতিরিক্ত পটি সেলাই করা হয়েছে। জুতো জোড়া পরিধান করে আধ মাইল বা তার কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থিত উঁচু খাড়া পাহাড়ের দিকে রওয়ানা দেয় সে। পাঁচ কি দশ মিনিট পরেই করকটে ঝোপঝাড় আর বিক্ষিপ্ত গাছপালার আড়ালে দৃশ্যপটের অন্তরালে চলে যায় সে। হুমায়ুন তারপরে উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে একটা অবয়বকে উপরে উঠে যেতে দেখে। অবয়বটা কখনও হারিয়ে যায় কিন্তু পুনরায় দৃশ্যমান হতে মনে হয় অনেকটা যেন উপরে উঠে গিয়েছে। তারপরে অবয়বটা কিছুক্ষণের জন্য একেবারেই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। হুমায়ুন তার গুপ্তদূতকে এর পরে যখন দেখতে পায় তখন সে অনেকটা নীচে নেমে এসেছে। হুমায়ুন পায়চারি করে, তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, আশঙ্কিত যে শেষ কয়েক গজ হয়তো অনতিক্রম্য প্রমাণিত হয়েছে কিন্তু আশা করে যে তার ধারণা হয়তো ভুল। আধঘন্টা পরে আহমেদ খানকে গাছপালাবেষ্টিত সেই পাহাড়ের চূড়ায় দেখা যায়। তার হাত বেশ কয়েক স্থানে ঘষা খেয়ে ছড়ে গিয়েছে এবং পরনের ঢোলা প্যান্টটা হাঁটুর কাছে ছিঁড়ে গিয়েছে। বন্ধুর পথে সে হেঁটেছিল বলে বাম পায়ের জুতোর তলি অনেকটাই খয়ে গিয়েছে কিন্তু তাঁর মুখে কান পর্যন্ত বিস্তৃত একটা হাসি।
সেখানে কোনো প্রতিরক্ষাকারীকে দেখা যায়নি। চূড়ো থেকে চল্লিশ ফিট নীচ পর্যন্ত বেয়ে উঠতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না কিন্তু পা রাখবার জায়গা খুব কম থাকার জন্য শেষের ফিটগুলো বেয়ে উঠা বেশ কষ্টকর। আমার মতো পাহাড়ী লোকদের পক্ষে সংকীর্ণ ফাটলের কোনো একটার দেয়ালে পিঠ দিয়ে আর অন্য দেয়ালে পা দিয়ে উপরে উঠে যাওয়া সম্ভব। অনেকের পক্ষেই সেটা অসম্ভব প্রতিপন্ন হবে বিশেষ করে যখন অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে হবে। অবশ্য এবং সে পুনরায় হাসতে শুরু করে- পাথরে ফাটল রয়েছে এবং বেশ নমনীয়ও বটে, যারা প্রথমে বেয়ে উঠবে তারা সহজেই ধাতব কিল পাথরের গায়ে গেথে দিতে পারবে ফলে কম দক্ষদের বেয়ে উঠবার ক্ষেত্রে এক ধরনের মই তৈরী হয়ে যাবে।
আমি আল্লাহতালার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি আর তোমার সাহসিকতা আর দক্ষতার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাঁচশো বাছাই করা লোক নিয়ে আগামীকাল রাতে আমরা ফিরে আসবো। আমাদের মূল বাহিনী যখন সামনে থেকে আক্রমণ করে দূর্গ প্রতিরক্ষায় নিয়োজিতদের ব্যস্ত রাখবে তখন দেয়াল বেয়ে উঠে পেছন থেকে দূর্গে প্রবেশ করবো আমরা।
*
চাঁদের ধুসর আলোয়, আহমেদ খানকে পাশে নিয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গাছগুলোর ভিতর দিয়ে পাহাড়ের সেই ফাটলটার দিকে বেয়ে উঠতে থাকে হুমায়ুন। তাঁদের পায়ের নীচে মসৃণ আর আলগা নুড়ি পাথর নিশ্চিত করে যে এটা একটা শুকিয়ে যাওয়া জলস্রোত এবং বর্ষার সময় বাস্তবিকই উপর থেকে পতিত একটা জলপ্রপাত এখান দিয়ে প্রবাহিত হয়।
যুদ্ধের কেন্দ্রে অবস্থানের জন্য বরাবরের মতোই অসহিষ্ণু হুমায়ুন, বাবা ইয়াসভালের পরামর্শ, যে তার কেন্দ্রে অবস্থান করা উচিত আক্রমণ পরিচালনার স্বার্থে, এবং পাথরের গায়ে কীলক স্থাপনের অভিযানে আহমেদ খান আর তার দেহরক্ষীদের ভিতরে দশজন সেরা পর্বতারোহীদের সাথে থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে জানে তাঁদের মতো সেও ক্ষিপ্র, চটপটে এবং প্রথম দলের সাথে গমন করলে সে তার পাঁচশ লোকের বাকিদের মনোবল বৃদ্ধি করতে পারবে। তাদের সম্রাট নিজেই ইতিমধ্যে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে গিয়েছেন এটা জানতে পারলে নিজেদের সম্মানের খাতিরে তারা অনুসরণ করতে ব্যর্থ হবে না।
