আপনার বিড়ম্বনা আমি বুঝতে পারছি, হুমায়ুনের হাত ধরে কোমল কণ্ঠে গুলবদন বলে। আপনি কখনও কথা দিয়ে কথার বরখেলাপ করেননি। মনে আছে আপনার অমার্তদের বিরক্তি সত্ত্বেও ভিস্তিঅলা নিজামকে দেয়া প্রতিশ্রুতির প্রতি, যে আপনার সিংহাসনে সে এক কি দুই ঘন্টার জন্য অধিষ্ঠিত হবে, আপনি কিভাবে সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। আপনি সবসময়ে নিজের কথা রাখেন, তাই আপনি মাঝে মাঝে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন যে অন্যরা যেমন শেরশাহ, যে চওসার যুদ্ধের আগে আপনার সাথে ছলনার আশ্রয় নিয়েছিল বা আপনার নিজের সৎ-ভাইয়েরা তেমন কিছু করবে না। আপনি কামরানকে এত সুযোগ দিয়েছেন এবং সে অবলীলায় যেভাবে আপনার করুণার সুযোগ নিয়েছে যে আমার নিজেরই মনে হয় যে আমাদের আব্বাজানকে আপনি যদি কোনো প্রতিশ্রুতি কখনও দিয়েও থাকেন সেটা তাঁর ক্রমাগত শঠতার কারণে নাকচ হয়ে গিয়েছে… সে চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবে। আমাকে যদি অকপটে বলতে বলেন আমি বলবো তার মরাই উচিত। আমাদের আব্বাজান যে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য এতো কঠোর সংগ্রাম করেছিলেন সেই সাম্রাজ্যের জন্য এটা মঙ্গলজনক হবে। কামরানের সমস্যা দূর হলেই কেবল আপনি হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধারের জন্য একাগ্রচিত্তে মনোনিবেশ করতে পারবেন।
হুমায়ুন অনেকক্ষণ কোনো কথা না বলে চুপ করে বসে থাকে। সে অবশেষে সতর্কতার সাথে বলতে শুরু করে। আমি জানি তোমার যুক্তি ঠিক আছে। আমি এটাও জানি আমাদের আব্বাজান সবসময়ে বলতেন আমি বড় বেশী নিঃসঙ্গতা পছন্দ করি…কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে আমি কোথাও গিয়ে কিছুক্ষণ একাকী বিষয়টা নিতে ভাবতে চাই।
আমাদের আব্বাজানের স্মৃতিকথা আপনি সাথে করে নিয়ে যেয়ে দেখতে পারেন যদি সেখান থেকে কোনো নির্দেশনা বা সান্ত্বনা পান? আর তাছাড়া, তিনি যেমনটা বলেছেন তেমনি করে সেসব আপনারই লেখা, জীবনযাপন আর শাসন কার্যের জন্য নির্দেশনা প্রদান।
হুমায়ুন, কিছুক্ষণ পরে, কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের প্রাচীরে অবস্থিত সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষণ চৌকির পাথুরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে। তাঁর হাতে হাতির দাঁত দিয়ে বাধান তাঁর আব্বাজানের স্মৃতিকথা যা সে তার উত্থানপতনের মাঝেও সযত্নে সংরক্ষণ করেছে। সে জওহরকে কঠোর আদেশ দিয়ে পর্যবেক্ষণ চৌকির প্রবেশদ্বারে বসিয়ে রেখে এসেছে, যে কেউ যেন ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না পায়। হুমায়ুন যখন সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে, একটা সমতল ছাদে এসে উপস্থিত হয়, সে টের পায় যে দিনের উষ্ণতা হ্রাস পাচ্ছে। ঘন্টাখানেকের ভিতরেই সন্ধ্যা নামবে। তারকারাজি তাকে কি দিক নির্দেশনা দেয় সেটা পর্যবেক্ষণের জন্য তার হয়ত তারা ফোঁটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত কিন্তু সে তারপরে কি মনে করে ভাবনাটা নাকচ করে দেয়। সে জীবনে যত পরীক্ষা আর আশাহতের বেদনার সম্মুখীন হয়েছে সেখান থেকে সে একটা শিক্ষাই লাভ করেছে যে সে তার স্ত্রী বা রক্তসম্পর্কের আত্মীয়, তার পরামর্শদাতাদের মতো তারকারাজির উপরে নিজের সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারে না।
বাবর তাঁকে বলেছিলেন যে তিনি বাল্যকালেই বুঝতে পেরেছিলেন যে একজন শাসককে শাসনকার্য পরিচালনা করতেই হবে। এটা শাসককে তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অতুলনীয় সুযোগ আর স্বাধীনতা দান করে, কিন্তু সেই সাথে এটা তার ভূমিকাকে ভীষণ একাকিত্বে ভরিয়ে দেয়। তাকে কেবল সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না বাকি জীবনটা তাঁকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে হাশরের ময়দানে তাঁকে এজন্য জবাবদিহি করতে হবে।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে শুরু করলে, হুমায়ুন তাঁর আব্বাজানের স্মৃতিকথা খুলে আনমনে পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকে। তার চোখ প্রথমেই একটা অনুচ্ছেদের দিকে আকৃষ্ট হয় যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে, কিভাবে তৈমূর তার এক অভিযানের সময় স্তেপের অধিবাসীদের ভিতরে প্রচলিত সনাতন রীতি অনুযায়ী করুণার বিরল দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেছিলেন এবং তাঁর নিজের পরিবারের একজন শক্তিশালী সদস্য যে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করেছিল তাঁকে হত্যা না করে কেবল অন্ধ করে দিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সৃষ্টির সম্ভাবনা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। বিদ্রোহ দমনের একটা পন্থা হিসাবে বাবর এটা সমর্থন করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন যে আজও অনেক গোত্রের ভিতরে এমন শাস্তির বিধান প্রচলিত রয়েছে এবং এটাকে তারা ন্যায্য আর যথার্থ বলে বিবেচনা করে।
হুমায়ুন সাথে সাথে বুঝতে পারে যে কামরানের এটাই নিয়তি হওয়া উচিত। দৃষ্টিহীন হবার সাথে সাথে তাঁর হুমকিও দূর হবে। কোনো বিদ্রোহী গোত্রপতি আর কখনও কামরানকে হুমায়ুনের প্রতিপক্ষ হিসাবে বিবেচনা করবে না। তার সৎ-ভাইও হয়তো নিজের কৃতকর্ম বিবেচনার সময় পাবে এবং শেষ বিচারের ডাক আসবার আগে হয়তো সে অনুতপ্তও হতে পারে। শাস্তিটা খুবই নিষ্ঠুর হবে, কিন্তু হুমায়ুন জানে যে এটা বলবৎ করে কিছুটা করুণা প্রদর্শনের জন্য নিজের সহজাত প্রবৃত্তির প্রতি সে সম্মান প্রদর্শন করবে এবং সেই সাথে নিজের সৎ-ভাইদের প্রতি অচিন্তনীয় হিংস্রতা থেকে বিরত থাকতে তাঁর আব্বাজানের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা হলেও মান্য করা হবে।
