হুমায়ুন উদ্ধত তরবারিটা নামিয়ে নেয় এবং চোখের উপর থেকে কফের দলাটা মুছে ফেলে। মৃত্যুই তোমার প্রাপ্য তুমি সেটা নিজেই বুঝতে পেরেছে দেখে আমি খুশি হয়েছি কিন্তু আমি আমার পরামর্শদাতাদের সাথে আলোচনা করেই তোমার ভাগ্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব। তোমায় যদি মৃত্যুদণ্ড দিতেই হয় হঠকারী প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে না সেটা ঠাণ্ডা মাথায় বিচার বিবেচনার পরেই দেয়া হবে। হুমায়ুন কক্ষ ত্যাগ করার জন্য ঘুরে দাঁড়াবার সময়, তাঁর মনে হয় কামরানের ঠোঁটের কোণে সে যেন হাল্কা হাসির একটা ছটা দেখতে পেয়েছে। সে যা দেখেছে তাঁকে তাঁর দূর্বলতা ভেবে নিয়ে কি সে হাসছে, নাকি ভেবেছে যে এইবারের মতো সে প্রাণে বেঁচে গিয়েছে?
সে কক্ষ থেকে বের হয়ে যাবার আগে শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে কামরানের দিকে যখন তাকায়, তাঁর সৎ-ভাইয়ের দৃষ্টি তখন আবারও মাটির দিকে নিবদ্ধ, মুখাবয়ব ভাবলেশহীন।
*
হুমায়ুন তার সূর্যালোকিত দরবার কক্ষে সমবেত, তার পরামর্শদাতাদের মগ্ন দৃষ্টিতে অবেক্ষণ করে। তাঁর নিজের মেজাজ তিক্ত হয়ে রয়েছে। কামরানের ভাগ্য নিয়ে তাকে একটা সিদ্ধান্তে উপণীত হতে হবে। কালক্ষেপণ করাটা দূর্বলতা বলে প্রতিয়মান হবে। সে আলোচনা শুরু করতে তাঁর পরামর্শদাতাদেরও গম্ভীর দেখায়।
আমার সৎ-ভাইয়ের জীবন বখশ দেয়া হবে কি না সেটা আমার এক্তিয়ার কিন্তু তার আগে আমি আপনাদের মতামত জানতে আগ্রহী। আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূত্রপাত করে নিঃসন্দেহে বহু লোকের প্রাণহানির জন্য সে দায়ী। তার বিরুদ্ধচারিতা আমার শক্তি খর্ব করেছে, হিন্দুস্তান পুনরায় দখলের নিমিত্তে আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটিয়েছে, সেই সাথে আমার একমাত্র সন্তান আকবরকে বিপদের সম্মুখীন করেছে। কিন্তু এতো কিছুর পরেও সে আমার সৎ-ভাই, আমার আব্বাজানের সন্তান এবং তৈমূরের রক্তের উত্তরাধিকারী। আমি এই রক্তে আমার হাত তখনই রঞ্জিত করবো যখন আমি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হব যে আমার সামনে এটা ছাড়া আর কোনো পথ নেই এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে, আর আমার রাজত্ব ও এর জনগণের মঙ্গলার্থে তার মৃত্যু প্রয়োজন। আপনাদের মতামত আমি শুনতে আগ্রহী।
সুলতান, বৈরাম খান সামনে এগিয়ে আসে, তাঁর কণ্ঠস্বর পরিষ্কার এবং স্পষ্ট, আমার মনে হয় এখানে উপস্থিত সবার পক্ষে আমি মতামত ব্যক্ত করতে পারি। এটা নিয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই আপনার স্বার্থে, আপনার সন্তান, আপনার সাম্রাজ্য আর আমাদের সবার স্বার্থে আপনার সৎ-ভাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত। কামরান আপনার ভাই নয়, সে আপনার শত্রু। তার প্রতি আপনার ভ্রাতৃসুলভ অনুভূতি থেকে নিজেকে মুক্ত করুন। একজন শাসকের সিদ্ধান্তের ভিতরে এসব অনুভূতির কোনো স্থান নেই। আপনি যদি সম্রাট হিসাবে অধিষ্ঠিত থাকতে চান এবং আপনার আর আপনার সন্তানের জন্য হিন্দুস্তানের সিংহাসন পুনরুদ্ধারে আমাদের সবার সমবেত অভিলাষ হাসিল করতে চান, তাহলে কেবল একটাই করণীয় রয়েছে। তার প্রাণদণ্ড কার্যকর করেন। সাথীরা আমার, আমি কি ঠিক বলিনি?
দরবারে উপস্থিত সবাই সম্মিলিত কণ্ঠে এবং কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই উত্তর দেয়, হ্যাঁ!
অন্যকোন সমাধানের পক্ষে আপনাদের কারো কি কোনো সাফাই দেবার নেই, হুমায়ুন জানতে চায়।
না, সুলতান।
ধন্যবাদ। আপনাদের পরামর্শ আমি ভেবে দেখবো। হুমায়ুন আর একটা কথা না বলে দরবারকক্ষ ত্যাগ করে, তার ভ্রু কুচকে রয়েছে। তার পরামর্শদাতাদের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়াটা খুব সহজ কাজ না। তাদের কেউই তার মতো কামরানের রক্ত ধারণ করে না। সে কি করছে সেবিষয়ে সচেতনভাবে কোনো চিন্তা না করেই হুমায়ুন জেনানাদের কক্ষের দিকে হাঁটতে শুরু করে এবং সেখানে পৌঁছে সে সরাসরি গুলবদনের কামরায় যায়। তার সৎ-বোন বেগুনী রঙের একটা ঢোলা রেশমের আলখাল্লা গায়ে জড়িয়ে নীচু একটা গিল্টি করা কেদারায় বসে রয়েছে আর তাঁর পরিচারিকা হাতির দাঁতের তৈরী একটা চিরুণী দিয়ে তাঁর কালো চুল আচড়ে দিচ্ছে। গুলবদন হুমায়ুনের মুখের অভিব্যক্তি দেখা মাত্র পরিচারিকাকে বিদায় দেয়। কি ব্যাপার ভাইজান?
তুমি কি জানো তারা আবারও কামরানকে বন্দি করেছে এবং এই মুহূর্তে সে ভূগর্ভস্থ কারাকুঠরিতে বন্দি রয়েছে?
অবশ্যই জানি।
তার নিয়তির ব্যাপারে আমি আমার বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকতে চাই। আমি বুঝতে পারছি যে তার অসংখ্য অপকর্মের জন্য সাধারণ রীতিনীতি অনুযায়ী তার মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য এবং আমার পরামর্শদাতারা একবাক্যে রায় দিয়েছে যে এইবার তাকে মরতেই হবে। তাকে পুনরায় আমার কজার ভিতরে পাবার ক্ষণটা আমি প্রায়শই যখন কল্পনা করতাম আকবরের প্রতি তাঁর দুর্ব্যবহারের কারণেই কেবল আমার মনে হত নিজ হাতে তাঁকে হত্যা করি, এবং হামিদা- আকবরের মা হিসাবে- এটা করতে আমাকে মিনতি করতো। অবশ্য, আমার ক্রোধ প্রশমিত হলে আমি বুঝতে পারি রাগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়াটা আমার ঠিক হবে না, আমাদের সাম্রাজ্যের জন্য কোনটা উত্তম হবে সিদ্ধান্ত নেবার সময় সেটাও মাথায় রাখতে হবে। ভাইদের কোনো ক্ষতি না করার জন্য আব্বাজানের নিষেধের কথা আমার স্মরণ আছে আর তাই সিদ্ধান্ত নিতে আমি ইতস্তত করছি।
