সে প্রথমে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে এবং চিৎকার করে বলে যে আপনি একজন অপদার্থ শাসক এবং সেই ন্যায়সঙ্গত সম্রাট; আরও বলে যে আমার লোকেরা একজন অকালকুষ্মণ্ডের মোসাহেব এবং তাদের উচিত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া এবং তাকে ছেড়ে দেয়া। অবশ্য, কিছুক্ষণ পরেই সে নিরব হয়ে যায়, মনে হয় ভাগ্যের উপরে সে নিজেকে সোপর্দ করেছে।
আমার সৎ-ভাই এখন কোথায় আছে?
সুলতান, দূর্গপ্রাসাদের নীচে ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষে।
হুমায়ুন মানসপটে, কাবুলের দূর্গপ্রাকারের উপরে তিনবছরের আকবরকে যেন দেখতে পায় এবং পুনরায় নিজের সৎ-ভাইয়ের প্রতি একটা অদম্য ক্রোধ তাকে অন্ধ করে তুলে। আকবর কত সহজে মারা যেতে পারতো। কামরানের বিদ্রোহের ফলে কত লোক মারা গিয়েছে? সে রত্নখচিত ময়ান থেকে তার আলমগীর বের করে আনে।
আহমেদ খান, আমাকে কামরানের কাছে নিয়ে চলেন।
আহমেদ খান প্রাঙ্গণের উপর দিয়ে দ্রুত পথ দেখিয়ে এগিয়ে যায়, একটা নীচু দরজার নীচে দিয়ে, যার উভয়পার্শ্বে প্রহরী মোতায়েন করা রয়েছে, প্রবেশ করে এবং খাড়া একপ্রস্থ সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে যা দূর্গপ্রাসাদের তলদেশে নেমে গিয়েছে। হুমায়ুন চোখ পিটপিট করে অভ্যন্তরের গলিপথের অন্ধকারে দৃষ্টি সইয়ে নিতে চেষ্টা করে, যেখানে কেবল একটা তেলের প্রদীপ একটা চোরকুঠরির ভিতরে জ্বলছে। তার দৃষ্টি কিছুটা পরিষ্কার হতে তাঁর মনে হয় একটা বিশাল উঁদুরকে সে দেয়াল বরাবর দৌড়ে যেতে দেখেছে। সে মনে মনে ভাবে, নিজের বিশ্বাসঘাতক ভাইকে বিদ্রোহের মহামারী দ্বারা অন্যদের আক্রান্ত করা থেকে সে অন্তত থামাতে পেরেছে এবং সে তার তরবারির হাতল আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তারা অবশ্য ইতিমধ্যে কামরানের কারাকক্ষের দরজার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছে, আহমেদ খানের চারজন সৈন্য যেখানে পাহারা দিচ্ছে।
আমি একা ভিতরে প্রবেশ করতে চাই, হুমায়ুন গম্ভীর কণ্ঠে বলে। আমি একা অনুশোচনাহীন বিশ্বাসঘাতকের সাথে বোঝাঁপড়া করতে চাই। আমার হাতেই কেবল আমার পরিবারের রক্ত ঝরবে।
পুরু কাঠের দরজার উপরের আর নীচের ভারী লোহার ছিটকিনি একজন প্রহরী খুলে দেয়। হুমায়ুন মাথা নীচু করে কারাকুঠরির ভেতরে প্রবেশ করে এবং কামরান, ভেতরের খড় দেয়া মেঝের উপরে, স্যাঁতসেঁতে পাথরের দেয়ালে পিঠ দিয়ে বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে বসে রয়েছে, পাঁচ বছরের বেশী সময় যাকে সে চোখে দেখেনি। ধরা পড়ার সময় তাঁর পরণে যা ছিল সেই খয়েরী মেয়েলি আলখাল্লা এখনও তার গায়ে রয়েছে। তাঁর পরণের কাপড়চোপড় শতছিন্ন এবং তার মাথার ভারী কালো হেজাবটা এখন পেছনে তুলে রাখায় তাকে বিদ্রোহী নয় বরং কেমন যেন হাস্যকর দেখায়।
কিছুক্ষণ পরে, কামরান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সে হুমায়ুনের চোখের দিকে তাকান থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং সেই প্রথম নিরবতা ভঙ্গ করে কথা শুরু করে। আমি আমার প্রাণ বখশ দিতে তোমায় বলবো না। তাই মোটেই ভেবো না যে আমি তোমার পায়ে লুটিয়ে পড়ে তোমার করুণা ভিক্ষা করবো। তোমার হাতে আমি আমাদের আব্বাজানের তরবারি দেখেছি। ওটা ব্যবহার কর। আমায় হত্যা কর। আমি যদি তোমার অবস্থানে থাকতাম তাহলে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতাম না… আমি কেবল একটা জিনিষ তোমার কাছে চাই… এবং কথা শেষ না করে এই প্রথমবার সে তাঁর সবুজ চোখের দৃষ্টি উঁচু করে আর প্রাসরি হুমায়ুনের চোখের দিকে তাকায়। আমাদের আব্বাজানের পাশে আমাকে সমাধিস্থ করো।
হুমায়ুন পলকহীন চোখে পাল্টা তাকিয়ে থাকে। তুমি তাঁর স্মৃতিকে অসম্মান দেখাবার পরেও আমি কেন সেটা করবো? আমার কাছে তুমি যত প্রতিশ্রুতি করেছো সবগুলো ভাঙার পরেও, শান্তি আর মীমাংসার জন্য আমার সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরেও, এবং সবচেয়ে যেটা মারাত্মক আমার সন্তানের জীবন বিপদের মুখে ফেলার পরেও আমি কেন সেটা করতে যাব?
নিজেকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন তুমি যা করতে পছন্দ করতে। কিন্তু আমার মৃতদেহ কোথায় শায়িত রয়েছে আমি কেবল সেটা নিয়ে চিন্তিত। ঝামেলাটা শেষ কর। আমার মতো, সবাই তোমায় যেমন দূর্বল ভাবে, প্রমাণ করো, তুমি মোটেই সেরকম নও। হুমায়ুনের মুখের কাছে কামরান নিজের মুখ নিয়ে আসে এবং তার চোখে পচা চর্বির মতো দুর্গন্ধযুক্ত একদলা কফ নিক্ষেপ করে।
কিন্তু হুমায়ুন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। মৃত্যুশয্যায় বাবরের শেষ কথাগুলোর পেছনে নিহিত সত্যিকারের প্রাজ্ঞতা, নিজের ভাইদের কখনও কোনো ক্ষতি করবে না, তোমার যতই মনে হোক সেটা তাঁদের প্রাপ্য, এক নতুন মাত্রায় তাঁর সামনে প্রতিভাত হয়। হুমায়ুনের সাথে সাথে তার ভাইদেরও বাবর রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে নিজের ভাইকে যদি সে হত্যা করে তাহলে কি সে শান্তিতে বাঁচতে পারবে? এই নোংরা প্রকোষ্ঠে তাঁকে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করে, কামরান- যে তাকে খুব ভালো করেই চেনে তার জন্য তার শেষ ফাঁদটা পেতেছে, নৈতিকতা বর্জন করে হুমায়ুন যেন নিজেকে তার স্তরে নামিয়ে আনার ধৃষ্টতা দেখায়, আর রাগের মাথায় প্রমাণ করে যে করুণা নয়, দূর্বলতাই তাঁর পূর্ববর্তী সব মীমাংসা প্রয়াসের পেছনে কাজ করেছে।
