সে হামিদার দিকে তাকিয়ে আবার হাসে এবং তার ঠোঁটের বিভঙ্গ আর চোখের দ্যুতি দেখে বুঝতে পারে যে মেয়েটা জানে সে আহার পরবর্তী ভালোবাসার-পর্ব নিয়ে চিন্তা করছে এবং বিষয়টাকে সে স্বাগতই জানাবে। হুমায়ুন হাত বাড়িয়ে হামিদাকে নিজের কাছে টেনে আনবে এমন সময় হামিদার ব্যক্তিগত পরিচারিকা জয়নব বেরসিকের মতো ভেতরে প্রবেশ করে। জয়নব কিছু বলার আগেই, হুমায়ুন তার উদ্বিগ্ন মুখাবয়ব দেখে বুঝে নেয় যে অলস দুপুরবেলা সে যে উষ্ণ আর অলস রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করছিল সেটা আপাতত স্থগিত করতে হবে।
সুলতান, আহমেদ খান আপনার জরুরী উপস্থিতি কামনা করেছেন তারা আপনার সৎ-ভাই কামরানকে বন্দি করেছে। হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে জয়নবের কথার মাঝেই হামিদার মুখাবয়ব থেকে রমণ ইচ্ছুক প্রেয়সীর অভিব্যক্তি মুছে গিয়ে সেখানে বিজয়োন্মত্ত, প্রতিশোধ পরায়ন এক মায়ের ক্রুদ্ধ রূপ ফুটে উঠেছে। হামিদা তার একমাত্র ছেলের সাথে কামরানের আচরণের কারণে তাঁকে কখনও ক্ষমা করেনি- ভুলে যাবার প্রশ্নই উঠে না। আর কামরানকে হুমায়ুন এতোবার জীবন বখশ দিয়েছে বলে সে বহুবার তাকে তিরস্কার করেছে। সে প্রায়ই তার প্রিয় ফার্সী কবির কয়েকটা পংক্তি উদ্ধৃতি করে তাঁকে শোনায়: বন্ধ্যা মাটিতে কখনও মিষ্টগন্ধ ফুল ফোটে না তাই বৃথা আশায় বীজ নষ্ট করো না। পিশাচের সাথে ভালো আচরণ ভালো লোকের সাথে পৈশাচিক আচরণের ন্যায় গর্হিত।
হুমায়ুন কোনো মন্তব্য করার পূর্বেই, হামিদা চিৎকার করে উঠে, তাকে বন্দি করার জন্য আল্লাহতালাকে শুকরিয়া জানাই। আমি আশা করি এবার আর ক্ষমা করার মতো বাতুলতা আপনি প্রদর্শন করবেন না। তাঁকে তাঁর প্রাপ্যের চেয়েও বেশী সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং প্রতিবারই সে তাঁকে দেয়া সংশোধনের সুযোগ অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখান করেছে। আপনার প্রতি তাঁর ক্ষোভের শেকড় এতো গভীরে প্রোথিত যে সে কখনও তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসবে না। দ্বিতীয়বার চিন্তা করবেন না। আমার খাতিরে না হোক, আমাদের সন্তানের খাতিরে যার জীবন নিয়ে সে ছিনিমিনি খেলেছিল তাকে এই মুহূর্তে মৃত্যুদণ্ড দিন।
হুমায়ুন কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়ায় এবং তাঁর আব্বাজানের তরবারি আলমগীর নেয়ার জন্য ক্ষণিকের তরে হাঁটবার গতি মন্থর করে, তারপরে কক্ষ ত্যাগ করে। হামিদার কথায় স্পষ্টভাবে প্রকাশিত ক্ষোভের খানিকটা হলেও সে নিজের ভিতরে পূঞ্জীভূত হচ্ছে টের পায়। পরমানন্দদায়ক স্বস্তির একটা অনুভূতি এই ক্ষোভের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়- যে অবশেষে হিন্দুস্তানের উপরে ইসলাম শাহের নিয়ন্ত্রণের প্রাবল্য পরীক্ষা করার জন্য সিন্ধু নদের অপর তীরে সে যে অনুসন্ধানী অভিযানের পরিকল্পনা করেছে, সেটা কার্যে পরিণত করার সময় পশ্চাদে কামরানের হুমকি নিয়ে তাঁকে আট দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
জেনানাদের আবাসন কক্ষে প্রবেশ পথে অবস্থিত রূপার আস্তরণযুক্ত পাল্লার ভিতর দিয়ে হুমায়ুন যখন বাইরের সূর্যালোকিত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয় আহমেদ খান ইতিমধ্যে সেখানে তার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আহমেদ খান, আপনি তাকে কোথা থেকে বন্দি করেছেন এবং কিভাবে?
দুইদিন পূর্বে কামরানকে তাঁর শেষ বিদ্রোহের সময় সমর্থন করেছিল এমন একজন পাতি গোত্রপতিকে আমরা বন্দি করতে সক্ষম হই। আমরা তাঁকে বন্দি অবস্থায় দূর্গপ্রাসাদে নিয়ে এসে ভূগর্ভস্থ কারাপ্রকোষ্ঠে আটকে রাখি। আজ খুব সকালে সে আমার সাথে দেখা করতে চায় এবং নিজের কৃতকর্মের শাস্তি লাঘব করার অভিপ্রায়ে সে আকার ইঙ্গিতে বলে, যে সে জানে কামরানকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে। আমি তাঁকে জানাই যে সুলতানের সাথে আলোচনা না করে তার সাথে কোনো ধরনের চুক্তি করতে পারবো না, কিন্তু নিজের ভালো চাইলে তার উচিত হবে। অনর্থক কালক্ষেপন না করে- সে যা জানে সবকিছু আমাকে খুলে বলা। সে একটা বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারে যে কামরানকে যদি খুঁজে পাওয়া যায় তবে আপনিও অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করবেন না। সে তখন বলে, তার বিশ্বাস যে কামরান কাবুল শহরের যেখানে দরিদ্র লোকেরা বাস করে- ট্যানারীর আশেপাশের এলাকা। সেখানে লুকিয়ে রয়েছে। আমি যখন তাঁকে চাপ দেই সে স্বীকার করে যে তার তথ্যটা কমপক্ষে এক সপ্তাহের পুরান এবং তাঁর তথ্যদাতা, কামরানের সামরিক শিবির অনুসরণকারী একটা ছিঁচকে চোর, স্বভাবতই তাঁর কথার উপরে খুব একটা ভরসা রাখা যায় না। আমি অবশ্য সাথে সাথে চিন্তা করে দেখি আমাদের শক্তিশালী একটা বাহিনীকে সেখানে পাঠিয়ে পুরো ট্যানারী এলাকা ঘিরে ফেলে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সুলতান, আমি সেটা করেছিলাম বলে আমি দারুণ গর্বিত। আমাদের সৈন্যরা যখন এক চামারের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যাঁর পরিবার দক্ষিণ থেকে এসেছে, সেই চামারকে কেন যেন আতঙ্কিত মনে হয় এবং সে সৈন্যদের বাসায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়, দাবী করে যে তার শ্বাশুড়ি ভীষণ অসুস্থ গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়েছে। আমার সৈন্যরা তাকে ধাক্কা দিয়ে পথ থেকে সরিয়ে দেয় এবং স্তূপ করে রাখা চামড়া একপাশে ছুঁড়ে দিয়ে, পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে তল্লাশি করে এবং তারা বর্শার ফলা এমনকি চামড়া পাকা করার জন্য তামার পাত্রে রাখা রং আর প্রশাবের ভিতরেও প্রবিষ্ট করায়। তারা কিছুই খুঁজে পায় না, কিন্তু তারা তারপরেও নিশ্চিত যে চামার লোকটা কিছু একটা বা কোনো লোককে গোপন করার চেষ্টা করছে, তারা শেষপর্যন্ত বাড়ির উপরের তলায় পর্দা দিয়ে ঘিরে রাখা অংশে প্রবেশ করে, যেখানে চামার লোকটা দাবী করেছে যে তার অসুস্থ শ্বাশুড়ি অবস্থান করছে। তারা সেখানে কয়েকটা নোংরা কম্বলের নীচে একটা দেহ চাপা দেয়া রয়েছে দেখতে পায়। তাঁরা কম্বল সরিয়ে নীচে বিশাল হাত আর পায়ের বিরাটাকৃতি একটা অবয়ব দেখতে পায় তাঁদের মনে হয়, অবয়বটা কোনো মেয়েমানুষের তুলনা বিশাল শিশুর মতো কুকড়ে শুয়ে রয়েছে। আমাদের তথাকথিত শ্বাশুড়ির পরণে মেয়েদের অপরিচ্ছন্ন পোষাক আর তার মুখটা আরব মেয়েদের মতো মোটা কালো হেজাব দিয়ে ঢাকা। তাঁকে শান্তিতে মরতে দেয়ার জন্য সে উচ্চকণ্ঠে সকরুণ আর্তি জানায়। তল্লাশি পরিচালনাকারী আধিকারিক অবশ্য এসব আর্তিতে কান না দিয়ে হেজাব তুলে দেখার জন্য এগিয়ে যায়। সে হেজাব তুলতে গেলে, অবয়বটা তাঁর পরণের মেয়েলী আলখাল্লার পুরু ভঁজের ভেতর থেকে একটা খঞ্জর বের করে এবং তার বাহুতে আঘাত করে। আধিকারিকের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সৈন্য দ্রুত মহিলার পোষাক পরিহিত লোকটাকে নিরস্ত্র করে এবং তার হেজাব না তুলেই তারা নিশ্চিত হয়ে যায় সে কোনো মহিলা না বরং কয়েকদিনের না কামান খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত আপনার সৎ-ভাই।
