হুমায়ুন, এখনও নিজের সৎ-ভাইকে বন্দি করতেই বেশী আগ্রহী হওয়ায়, সে নিজের সাথে আরও ডজনখানেক যোদ্ধা নিয়ে সরে এসে সামনের অবরোধের দিকে এগিয়ে যায়। সে আধমাইলও যেতে পারেনি, সামনের অবরোধে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পেছনে তাঁদের দিকে পশ্চাদপসরণকারী কামরানের বিশজন যোদ্ধার একটা দল তাঁর সামনে এসে পড়ে। নিজের কালো ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে হুমায়ুন গতি বৃদ্ধি করে। তার চারপাশে যারা ছিল তারাই একই কাজ করে। দুটো দল মুখোমুখি সংঘর্ষে মিলিত হয়। কামরানের একজন যোদ্ধা হুমায়ুনের মাথা লক্ষ্য করে তরবারি চালায় কিন্তু আঘাতটা তার শিরস্ত্রাণে লেগে পিছলে যায়। হুমায়ুনের তরবারির ফলাও একই সময়ে আক্রমণকারীর কনুইয়ের উপরে আঘাত হানে। কোনো ধরনের হামলার সম্মুখীন হবার জন্য প্রস্তুত না থাকায়, কামরানের অধিকাংশ যোদ্ধার পরণেই ইস্পাতের জালির তৈরী বর্ম নেই, ফলে হুমায়ুনের তরবারির ফলা গভীরে প্রবেশ করে, অস্থি দ্বিখণ্ডিত করে এবং হাতটা দেহ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
দ্বিতীয় আরেক যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত ধারাল কস্তনী দিয়ে হুমায়ুনকে আঘাত করতে চেষ্টা করে। কস্তনীর শিকলের শেষপ্রান্তেযুক্ত গোলকের সাথে সংযুক্ত সুচালো কীলক তার মুখের সামনে বাতাস কেটে বের হয়ে যাবার সময় তাঁর নাকের অগ্রভাগে একটা আচড় কেটে যায়। তাঁর নাক অসাড় হয়ে পড়ে এবং সাথে সাথে রক্তে তাঁর মুখ আর কণ্ঠনালীর ভেতরের অংশ ভেসে যায়। সে, অবশ্য সাথে সাথে ঘোড়ার মুখ সবেগে ঘুরিয়ে নিয়ে তাঁর আক্রমণকারীর পিছু ধাওয়া করলে সে তার হাতের কস্তনী তাকে লক্ষ্য করে আরো একবার সপাটে ঘোরায় কিন্তু এবার উদভ্রান্ত ভঙ্গিতে চালাবার কারণে হুমায়ুনের অনেকদূর দিয়ে সেটা লক্ষ্যভ্রষ্ঠ হয়। হুমায়ুন লোকটাকে অতিক্রম করার সময়ে তাঁর ঘাড় বরাবর সপাটে তরবারি চালায়। আঘাতের প্রচণ্ডতায় আক্রমণকারীর শিরোস্ত্রাণ স্থানচ্যুত হয়ে, তরবারির গতি কিছুটা ব্যাহত হয় কিন্তু তারপরেও সেটা ঠিকই লোকটার ঘাড়ে আঘাত হেনে রক্তক্ষরণের জন্ম দেয়। লোকটা সামনের দিকে ঝুঁকে যেতে সে তার ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ হারায় আর জন্তুটা পিছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে তাঁকে সবেগে মাটিতে আছড়ে ফেলে, সেখানে হতভাগ্য লোকটা উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে কিন্তু অচিরেই তাঁর প্রয়াস ব্যর্থ হয় এবং নিথর হয়ে সে মাটিতে পড়ে থাকে।
সুলতান, সাবধান, আপনার পেছনে! কামরানের আরেক যোদ্ধা মাথার উপরে নিজের বাঁকান তরবারি উঁচিয়ে ধরে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসতে, হুমায়ুন যথাসময়ে ঘুরে দাঁড়ায় তাঁকে মোকাবেলা করতে। হুমায়ুন এবার যান্ত্রিকভাবে এবং সহজাত প্রবৃত্তির বশে পাল্টা আঘাত হানে- তার আক্রমণকারীর ঘোড়ার মাথার উপর দিয়ে ভেসে গিয়ে তরবারির ফলা তার কুঁচকিতে আঘাত হানে। লোকটা নিমেষে ভূপাতিত হয়।
হুমায়ুন কাশতে কাশতে নোতা, ধাতব স্বাদযুক্ত রক্ত থুতুর সাথে মাটিতে ফেলতে ফেলতে চারপাশে তাকিয়ে দেখে যে সে আর তার লোকেরা বিশজন আক্রমণকারীর ভিতরে আটজনকেই হত্যা করেছে এবং আরো লক্ষ্য করে, যারা তখনও বেঁচে রয়েছে তাদের যুদ্ধ করার শখ সহসাই উবে গিয়েছে এবং পালাবার পথ খুঁজছে। হুমায়ুন কিছুক্ষণের ভিতরেই আবার পাথুরে পথের চড়াই ভেঙে ঘোড়া ছোটাবার প্রয়াস নিতে গিয়ে প্রায় সাথে সাথে লক্ষ্য করে তার নিজস্ব পাঁচশত অশ্বারোহীর একটা বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে বৈরাম খান তার দিকেই এগিয়ে আসছে, তার লাল নিশান গর্বিত ভঙ্গিতে বাতাসে উড়ছে।
বৈরাম খান তাঁর ফেনারমতো ঘামে ভেজা, নাক দিয়ে সজোরে শ্বাস ফেলতে থাকা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে, তাঁর মুখ বিজয়ের গর্বিত হাসিতে উদ্ভাসিত, সে বলে, কামরানের লোকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দিগ্বিদিক ছুটে পালাচ্ছে। হুমায়ুন তার চারপাশে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারে যে তার বিজয় হাসিল হয়েছে কিন্তু একে কি সত্যিকারের বিজয় বলা যাবে? সে তার সৎ-ভাইকে বন্দি করতে ব্যর্থ হয়ে যারপরনাই হতাশ হয়েছে। হিন্দুস্তান পুনরায় অধিকারের অভিপ্রায়ে তার বিশাল কর্মযজ্ঞ নিরাপদে শুরু করার আগে তাকে অবশ্যই এই কাজটা করতেই হবে।
রাতের অন্ধকার পুরোপুরি নেমে আসবার আগেই একটা বিষয় নিশ্চিত করবেন, আমার লোকেরা যেন কামরানের যত বেশী সংখ্যক লোককে ধাওয়া করে বন্দি করতে পারে। আমার চক্রান্তকারী সৎ-ভাইকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় আমার সামনে যে হাজির করতে পারবে তাঁকে স্বর্ণমুদ্রায় পরিপূর্ণ একটা থলে আমি উপহার দেব।
৪.৩ পিশাচের মঙ্গলসাধন
২৩. পিশাচের মঙ্গলসাধন
হুমায়ুন লাল আর সোনালী জরির কারুকাজ করা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে এবং সোনার পানি দিয়ে গিল্টি করা নীচু টেবিলের উপরে স্তূপীকৃত রূপার বাসনপত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, যেখানে সজ্জিত খাবার দিয়ে সে আর হামিদা কিছুক্ষণ আগেই মধ্যাহ্নভোজন সমাপ্ত করেছে। হুমায়ুনের পছন্দ দই আর মসলা দিয়ে তন্দুরে- মাটির উনুন যা মোগল রসুইখানার আবশ্যিক অনুষঙ্গ এবং তাঁরা যেকোনো অভিযানে রওয়ানা হবার সময় এটা সঙ্গে নিতে ভুলে না- অল্প আঁচে ঝলসানো মুরগীর মাংস। হামিদা কমলা দিয়ে তৈরী আঠাল মিষ্টান্ন এক কামড় খেয়ে খুঁতখুঁতে ভঙ্গিতে তামার তৈরী একটা ছোট কারুকাজ করা পাত্রে রক্ষিত গোলাপজলে নিজের আঙ্গুল পরিষ্কার করছে দেখে সে হামিদার দিকে তাকিয়ে হাসে। হামিদাও তাঁর দিকে হেসে তাকায়। হুমায়ুন হামিদার পেছনে বুদ্বুদ উঠতে থাকা মার্বেলের তৈরী একটা ছোট প্রসবণের উপরে জানালা দিয়ে আপতিত সূর্যরশ্মির দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে তার নিজেকে সন্তুষ্ট মনে হয়।
