কামরানের লোকদের অব্যাহত গতিতে অগ্রসর হবার সুযোগ দিতে হুমায়ুন সম্ভবত মিনিট পনের অপেক্ষা করে, তারা গল্পগুজর আর হাসিঠাট্টা করতে করতে এগিয়ে যায়। ওঁত পেতে থাকার সময়ে হুমায়ুনের একবার মনে হয় সে সৈন্যসারির কেন্দ্রভাগে একটা বিশাল খয়েরী রঙের ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় তাঁর সৎ-ভাইকে দেখেছে কিন্তু দূরত্ব বেশী হবার কারণে সে নিশ্চিত হতে পারে না। বাহিনীটার পশ্চাদ্ৰক্ষীরা এবং সৈন্যবাহিনীর পিছিয়ে পড়া অনুসরণকারীরা যখন তাঁর লুকিয়ে থাকা স্থানের নীচে দিয়ে অতিক্রম করতে শুরু করে, সে তার লোকদের ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুত হতে আদেশ দেয়। তার আদেশ সাথে সাথে পালিত হয় এবং দস্তানা পরিহিত হাতের এক ঝটকায় সে তার চারশ অশ্বারোহীর মাঝে গতির সঞ্চার করে। পুরো দলটা ঢেউয়ের একটা ঝাপটার মতো নুড়িপাথরপূর্ণ ঢালের উপর দিয়ে নীচের দিকে ধেয়ে যায়।
আশেপাশের অন্য এলাকা থেকে কম দুরারোহ হওয়া সত্ত্বেও, নীচের দিকে নেমে যাওয়া রাস্তাটা বেশ ঢালু এবং হুমায়ুন নীচের দিকে নামার সময় তার পর্যাণের উপরে পিছনের দিকে ঝুঁকে গিয়ে ঘোড়াটাকে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করার ফাঁকে সে দেখে তার লোকদের একজনের ঘোড়ার পা পিছলায় এবং মুখ থুবড়ে মাটিতে আছাড় খায়, পিঠের আরোহী তাঁর গলার উপর দিয়ে ছিটকে যায় এবং মসৃণ আলগা নুড়িপাথরের উপর দিয়ে গড়াতে থাকে। অবশ্য, হুমায়ুন আর তাঁর আক্রমণকারীবাহিনী প্রায় একই সময়ে কামরানের বাহিনীর পশ্চাক্ষীদের মাঝে পৌঁছে গিয়ে, আঘাত হানতে আর বেপরোয়া তরবারি ঘোরাতে আরম্ভ করে। আক্রমণের প্রথমক্ষণেই, হুমায়ুন কালো পাগড়ি পরিহিত এক যোদ্ধাকে তাঁর পর্যাণ থেকে ছিটকে নীচে ফেলে দেয়, বেচারা তখনও ভেড়ার চামড়ার নীচে থাকা ময়ানের ভিতর থেকে তরবারি বের করতে প্রাণপনে চেষ্টা করছে। সে আরেকজনের উরুতে আঘাত করে অস্ত্রধারণের পূর্বে এই লোকও আহত হয় এবং তৃতীয় আরেকজনের বাহুর গভীরে তরবারির ফলা বসিয়ে দেয়।
কামরানের অশ্বারোহীদের দেখে মনে হয় তারা এই আক্রমণের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। সবচেয়ে পেছনের অশ্বারোহীরা সহজাত প্রবৃত্তির বশে তাঁদের আক্রমণকারীদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেষ্টা করতে গেলে, সামনে তাঁদের সহযোদ্ধাদের উপরে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা তাঁদের নিজেদের ঘোড়াগুলোকে আকঙ্কিত করে তুলে এবং কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই উপত্যকার রাস্তা ধরে ঘোড়াগুলো প্রাণপনে দৌড়াতে শুরু করে। হুমায়ুন অচিরেই পাহাড়ের গায়ে উঁচুতে বড় বড় পাথরের আড়ালে যেখানে তার তবকিরা লুকিয়ে রয়েছে, সেখান থেকে গাদাবন্দুকের প্রথম গুলির শব্দ ভেসে আসতে শুনে। রণক্ষেত্রের ধূলো আর চাপানউতোরের ভিতরে হুমায়ুন তাঁর নিজের অবস্থান থেকে, গুলির প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করতে পারে না কিন্তু সে নিজের চারপাশে বিভ্রান্তি আর বিস্ময়কে অচিরেই চরম ভয় আর আতঙ্কে রূপান্তরিত হতে দেখে।
কামরানের যোদ্ধাদের অনেকেই দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাবার এবং বন্দুকের গুলির নিশানা থেকে বাঁচার অভিপ্রায়ে চেষ্টা করে নিজেদের ঘোড়াগুলোকে পেছনের দুইপায়ে ভর দিয়ে দাঁড় করিয়ে ঘুরিয়ে নিতে এবং পেছনে অবস্থিত আক্রমণকারীদের ভিতর দিয়ে তাদের এগিয়ে যেতে বাধ্য করতে। তাদের কারো প্রয়াস সফল হয় না; তাঁদের প্রত্যেকেই হয় মৃত্যুবরণ করে কিংবা ঘোড়া থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ে। অন্যরা চেষ্টা করে নুড়িপাথরেপূর্ণ খাড়া ঢাল দিয়ে উপরের দিকে উঠতে। হুমায়ুন পেছন থেকে তাদের অনেককেই ঘোড়া থেকে ছিটকে মাটিতে পড়তে দেখে, খুব সম্ভবত তার তবকিরা তাদের গুলি করে ঘায়েল করেছে। মাত্র বিশ মিনিটের ভিতরে, কামরানের জোড়াতালি দেয়া সেনাবাহিনীর একাত্তবোধ আর নিয়মানুবর্তিতা উবে যেতে শুরু করে। স্থানে স্থানে তাঁর প্রাণ ভয়ে ভীত, আর জান বাঁচাতে বেপরোয়া লোকেরা নিজেদের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে এবং আত্মসমর্পনের প্রতীক হিসাবে দুহাত মাথা উপরে তুলে রেখে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ায়।
হুমায়ুন নিজের কিছু সৈন্যকে তাঁর চারপাশে জড়ো করে, সে তার কালো ঘোড়াটাকে কামরানের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া বাহিনীর ভিতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায় তার সৎ-ভাইয়ের খোঁজে, সে এগিয়ে যাবার সময়ে ডানে বামে কোনো বাছবিচার না করে তরবারি চালায়। একবার হুমায়ুনের মনে হয়, সে তাঁকে তাঁর খয়েরী ঘোড়ায় উপবিষ্ট দেখতে পেয়েছে কিন্তু সে মরীয়া হয়ে কাছাকাছি যাবার পরে বুঝতে পারে ঘোড়াটার আরোহী এক তরুণ, সম্ভবত একজন পদস্থ যোদ্ধা যে পালাবার জন্য পাগলের মতো নিজের ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিতে থাকে কিন্তু সে তারপরেও তাঁর শিরস্ত্রাণবিহীন মাথা লক্ষ্য করে হুমায়ুনের তরবারির ক্রোধ এড়াতে পারে না এবং পাকা তরমুজের ন্যায় তার ছিন্নমস্তক মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকে।
উত্তরদিক থেকে, যেখানে বৈরাম খানের নেতৃত্বে তাঁর মূল বাহিনীর অবরোধের আড়াল থেকে কামরানের পলায়নপর লোকদের মোকাবেলা করার কথা, চিৎকারের শব্দ ভেসে আসলে বোঝা যায় যে সেখানেও লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটেছে। পাহাড়ের উপর থেকে নীচের জটলাবদ্ধ যোদ্ধাদের ভিতরে শত্রু এবং মিত্র ঠিকমতো সনাক্ত করতে না পেরে আর নিজেদের গাদাবন্দুকের ধোঁয়ায় নিজেরাই আপাতভাবে ঝাপসা দেখতে শুরু করলে হুমায়ুনের তবকিরা বন্দুক ফেলে দিয়ে ময়ান থেকে তরবারি বের করে মাথার উপরে আন্দোলিত করতে করতে নীচের এলোপাথাড়ি যুদ্ধের দিকে নুড়িপাথরের উপর দিয়ে পিছলে নামতে শুরু করে।
