হ্যাঁ, সুলতান আছে। এখান থেকে আরো পৌনে একমাইল দূরে উচ্চভূমির পাশে বায়ুপ্রবাহের বিপরীত দিকে একটা সমতল এলাকা রয়েছে, যেখানে আমরা অস্থায়ী শিবির স্থাপন করতে পারবো। আমি সেখান থেকে পথ দেখিয়ে আপনাকে নীচের দিকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব যেখানে আলগা পাথরে ভর্তি ঢাল অনেক সহনীয় ভঙ্গিতে নিচের চলাচলের পথের দিকে নেমে গিয়েছে এবং এই পথটা দিয়ে কোনো দক্ষ অশ্বারোহীর পক্ষে এঁকেবেঁকে না নেমে সরাসরি ধেয়ে নেমে এসে আক্রমণ করা সম্ভব।
পরের দিন সকাল হবার একঘন্টা আগে তীব্র শীতের ভিতরে যখন হুমায়ুন দুহাত দিয়ে নিজের পাজরের দুপাশে চাপড় মারছে নিজেকে উষ্ণ রাখতে এবং সামনের দীর্ঘদিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে, আহমেদ খান তাঁকে এসে জানায় যে তবকিদের একজন যে নীচের রাস্তা দেখা যায় এমন একটা বিশেষ উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেছিল রাতেরবেলা শীতের তীব্রতায় মারা গিয়েছে। আহাম্মকটার মরাই উচিত, আহমেদ খানের নির্দয় ব্যাখ্যা। ব্যাটা পানির বদলে সুরা নিয়ে গিয়েছিল আর পর্যাপ্ত কম্বল নিতেও তার মনে ছিল না।
অন্য তবকিরা সজাগ আর সতর্ক রয়েছে?
হ্যাঁ, সুলতান।
তারা কি নিজেদের অস্ত্র পরীক্ষা করে অবস্থান গ্রহণ করেছে?
সেটাও করেছে, সুলতান।
দারুণ। বাকি লোকদের এখন ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুত হতে বল। ভোরের প্রথম আলো ফোঁটার সাথে সাথে আমি গতকাল ওয়াসিম পাঠানের সাথে যে পথটার সম্ভাব্যতা যাচাই করে এসেছিলাম সেই পথে যাত্রা করবো, যা কামরানের বাহিনীর পেছনের দিকে আক্রমণ করার জন্য সত্যিই একটা আদর্শ সূচনা বিন্দু। পথটা সংকীর্ণ এবং বরফাবৃত আর কয়েক স্থানে খাড়াভাবে নেমে গিয়েছে। আমার লোকদের বলবেন সতর্ক থাকতে, বিশেষ করে বাতাসের বেগ এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এক ঘন্টা পরে, হুমায়ুন, উত্তরদিক থেকে প্রবাহিত হিম শীতল বাতাসের কারণে তার মুখ পশমের গলবস্ত্র দিয়ে ভালোমতো আবৃত থাকা সত্ত্বেও তাঁর নাকের অগ্রভাগ অসাড় হয়ে উঠেছে, তাদের যাত্রা পথের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটা মাত্র অতিক্রম করেছে, যা দুই ফিটেরও কম চওড়া আর দুপাশেই খাড়া ঢাল নীচের দিকে নেমে গিয়েছে, এমন সময় পেছন থেকে সে একটা আর্তনাদ শুনতে পায়, সেইসাথে একটা ভোঁতা শব্দ এবং তারপরে নীচ থেকে দ্বিতীয় আরেকটা ভারী পতনের শব্দ ভেসে আসে। সে তার ঘোড়ার পর্যাণের উপরে ঘুরে তাকিয়ে দেখে তাকে অনুসরণরত এক অশ্বারোহী উচ্চভূমির সংকীর্ণ অংশ থেকে ঘোড়াসহ নীচে পড়ে গিয়েছে, সম্ভবত ক্রমশ জোরাল হতে থাকা ভারী দমকা বাতাসের তোড়ে পড়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। হতভাগ্য লোকটার ভেড়ার চামড়ার আলখাল্লা পরিহিত দেহটা মাত্র ত্রিশ ফিট নীচে একটা সরু পাথরের তাকের উপরে চার হাতপা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে কিন্তু তার ঘোড়াটা আরো নীচে পাহাড়ের তীক্ষ্ণ অভিক্ষিপ্ত পাথুরে অংশে আছড়ে পড়েছে যা প্রাণীটার দেহ ছিন্নভিন্ন করে নাড়ীভুড়ি বের করে ফেলেছে।
হুমায়ুনের চোখের সামনেই আরেকজন আরোহী এবং তাঁর ঘোড়া পথের উপর থেকে উল্টে গিয়ে নীচের ধুসর তীক্ষ্ণ অভিক্ষিপ্ত অংশে আছড়ে পড়ে। হুমায়ুন দেরী না করে কণ্ঠস্বরে জরুরীভাব ফুটিয়ে তুলে আদেশ দিতে আরম্ভ করে। আমার কথা পেছনে পৌঁছে দাও। কোনো লোকের যদি নিজের উপর কিংবা তার ঘোড়া সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয় তাহলে সে যেন ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে এবং ঘোড়াকে নিয়ে পায়ে হেঁটে সবচেয়ে সংকীর্ণ আর ফাঁকা অংশটা অতিক্রম করে। এর ভিতরে লজ্জিত হবার কোনো কারণ নেই।
এই আদেশের পরে, আর কোনো অসুবিধা হয় না, হুমায়ুনের বাকী লোকেরা নিরাপদে জায়গাটা অতিক্রম করে কেবল একজনের তামাটে বর্ণের ঘোড়া বরফের উপরে হোঁচট খায়, যখন সে লাগাম ধরে প্রাণীটাকে জায়গাটা পার করছিল। বিশাল প্রাণীটা শীতল বাতাসে পাগলের মতো চারপায়ের খুর আন্দোলিত করতে করতে আছড়ে পড়ার সময়, নিজের আরোহীকেও কালো দাড়িঅলা, ছোটখাট চেহারার এক বাদখশানি যোদ্ধা- পতনের শূন্যতায় টেনে নেয়, হতভাগ্য লোকটা মরীয়া হয়ে ঘোড়াটাকে শান্ত করার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকায় সময়মতো হাতের লাগাম ছেড়ে দেয়ার আগেই সে নিজেও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং পথের জীবন থেকে মৃত্যুতে ঝাঁপ দেয়।
আধঘন্টা পরে, হুমায়ুন আর তাঁর লোকেরা নিজেদের এবং তাঁদের ঘোড়াগুলোকে সবুজাভ-ধুসর নুড়িপাথরপূর্ণ ঢালের শীর্ষদেশে এলোমেলো পাথরের মাঝে তাদের পক্ষে যতটা সম্ভব আড়াল করে রাখে, যেখান থেকে তারা কামরানের লোকদের অতর্কিতে আক্রমণ করার আশা করে। হুমায়ুন জানে তাদের বেশ কয়েক ঘন্টা এখানে অপেক্ষা করতে হবে। তাঁর কাছে গুপ্তচরদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী কামরানের লোকজন দুপুর দুইটা কি তিনটার আগে এই এলাকা দিয়ে অতিক্রম করবে না। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগ মুহূর্তে জয় পরাজয় নির্ধারণী কোনো যুদ্ধের জন্য তারা খুব অল্প সময়ই পাবে।
বস্তুতপক্ষে ঘড়ির কাঁটা তিনটার ঘর অতিক্রম করার আরো কিছুক্ষণ পরে হুমায়ুন নিজে যখন মনোসংযোগের জন্য চোখ কুঁচকে একটা অতিকায় পাথরের আড়াল থেকে উঁকি দেয় তখনই সে কামরানের অগ্রবর্তী বাহিনীর প্রথম দলকে নীচের রাস্তা দিয়ে উপরের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। তাদের সাথে মনে হয় না যে কোনো প্রহরী বা গুপ্তদূতের দল রয়েছে এবং কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক সারিবদ্ধ বিন্যাসও তারা বজায় রাখার চেষ্টা করে না। স্পষ্টতই, অতর্কিত কোনো আক্রমণের ব্যাপারে তারা একেবারেই অসন্দিগ্ধ রয়েছে। হুমায়ুন ইঙ্গিতে আহমেদ খানকে কাছে আসতে বলে। আমি সংকেত না দেয়া পর্যন্ত আমার লোকেরা যেন আক্রমণ না করে- এই বার্তাটা সবার কাছে পৌঁছে দাও। তাঁদের পশ্চাদভাগে আমরা আক্রমণ করতে সক্ষম হবার আগে আমাদের বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ তাঁদের যথেষ্ট সংখ্যক সৈন্য সামনে এগিয়ে না যায়। আমরা যখন আক্রমণে যাব, সেটা যেন দ্রুত আর তীব্র হয়, কামরানকে নিজের লোকদের একত্রিত করার কোনো সুযোগ দেয়া যাবে না।
