হুমায়ুনের মনে কোনো সন্দেহ নেই যে ওয়াসিম পাঠান সত্যি কথাই বলছে। আজ রাতে তোমার গ্রামের কাছে আমরা যাত্রাবিরতি করবো এবং আগামীকাল খুব ভোরে তোমার প্রস্তাবিত পথের সম্ভাব্যতা যাচাই করবো। অন্ধকার পুরোপুরি নেমে আসার আগেই আমরা যদি শিবির স্থাপন করতে চাই তাহলে আমাদের এখন। অবশ্যই দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।
*
ওয়াসিম পাঠান হুমায়ুনকে অনুরোধ করে তার ছোট জানালাবিহীন সমতল-ছাদযুক্ত মাটির বাসাটা, যাঁর ছাদে একটা ছিদ্রের সাহায্যে ধোঁয়া নির্গমনের ব্যবস্থা করে আগুন জ্বালাবার জন্য কেন্দ্রীয় উনানের বন্দোবস্ত রয়েছে, তাঁর অস্থায়ী সদর দপ্তর হিসাবে ব্যবহার করতে। নিজের বুড়ো যোদ্ধাকে সম্মান দেখাতে হুমায়ুন তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি দেয়, যদিও রাতটা সে জওহরের সতর্ক দৃষ্টির সামনে ওয়াসিম পাঠানের বাড়ির সীমানার নীচু দেয়ালের মধ্যে স্থাপিত নিজের চিরাচরিত তাবুতেই ঘুমায়। পরদিন ভোরের প্রথম আলো ফোঁটার সামান্য আগে, আহমেদ খান তাঁর কিছু লোক নিয়ে তাদের মতো একটা সৈন্যবাহিনীর জন্য ওয়াসিম পাঠানের প্রস্ত বিত পথের প্রায়োগিক সম্ভাবনা যাচাই করতে রওয়ানা দেয়। এখন সূর্য সরাসরি মাথার উপরে পৌঁছাবার কিছুক্ষণের ভিতরেই, হুমায়ুন কাছের পাহাড়ের ধুসর নুড়িপাথরে পূর্ণ ঢাল বেয়ে তাঁদের ঘোড়াগুলোকে এঁকেবেঁকে পথ করে নিয়ে নীচের দিকে নেমে আসতে দেখে।
সুলতান, পৌনে একঘন্টা পরে আহমেদ খান যখন দিনের বিবরণী, ওয়াসিম পাঠানের আড়ম্বরহীন বাসায় আগুনের চারপাশে বসে থাকা হুমায়ুন আর তার সামরিক আধিকারিকদের সামনে পেশ করার সময়, ঝড়ো বাতাসের কারণে ছাদের ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া ফিরতি পথে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করায় মাঝে মাঝে কাশতে থাকে, ওয়াসিম পাঠান আমাদের যে রাস্তাটা দেখিয়েছে সেটা দিয়ে আসলেই অস্ত্রধারী লোকদের পক্ষে উপরে যাওয়া সম্ভব, যদিও এই পথ দিয়ে পুরো বাহিনীকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। রাস্তাটা এমন একটা অবস্থানে গিয়ে শেষ হয়েছে যেখান থেকে নীচের উপত্যকা দেখা যায়, ঠিক যেখানে সেটা সংকীর্ণ হয়ে এসে একটা গিরিকন্দরে পরিণত হয়েছে। আপনার সৎ-ভাইয়ের লোকদের অতর্কিত আক্রমণের জন্য স্থানটা একেবারে আর্দশ।
কামরানের বাহিনীকে আমাদের গুপ্তদূতরা যারা অনুসরণ করছিলো তারা তাঁর অগ্রসর হবার কি বিবরণ দিয়েছে?
আগামীকালের পরের দিন দুপুরবেলা অতর্কিত আক্রমণের জন্য নির্ধারিত স্থানের নীচে দিয়ে তাঁদের অতিক্রম করার কথা।
তাহলে, সবধরনের বিতর্কের সমাপ্তি টেনে দিয়ে হুমায়ুন বলে, আমি মনস্থির করে ফেলেছি। আমরা আমাদের ছয়শ সেরা যোদ্ধাকে, যাদের ভিতরে আমাদের বেশীরভাগ গাদাবন্দুকধারী তবকিরা থাকবে, অতর্কিত হামলার জন্য নির্ধারিত স্থানে পাঠাব। জাহিদ বেগ সৈন্য নির্বাচনের দায়িত্ব আপনার। তাদের বলে দেবেন নিজেদের অস্ত্র ছাড়াও কম্বল আর পশুর চামড়া সাথে নেয়, উপরে আমরা যে রাত অতিবাহিত করবো সেসময় নিজেদের উষ্ণ রাখতে আর সেই সাথে দুইদিনের জন্য পর্যাপ্ত পানি আর শুকনো খাবার। আমাদের অবস্থান যাতে কোনোমতে প্রকাশ না পায় সেজন্য আমরা উষ্ণতার জন্য কিংবা রান্নার জন্য আগুন জ্বালাবো না। বৈরাম খান আমাদের বাকি লোকেরা এখানে আপনার নেতৃত্বে অবস্থান করবে, কামরানের লোকদের ভিতরে যারা প্রাণে বেঁচে গিয়ে মূল সড়ক দিয়ে কাবুলের পথে উত্তরে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করবে তাদের জন্য রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
পরের দিন সকালবেলা, পরিষ্কার নীল আকাশের নীচে এবং একপাশে নিজের কষ্টসহিষ্ণু টাটুঘোড়ায় উপবিষ্ট ওয়াসিম পাঠান আর অন্যপাশে নিজের চিরাচরিত খয়েরী রঙের ঘোটকীতে উপবিষ্ট আহমেদ খানকে নিয়ে হুমায়ুন ওয়াসিম পাঠানের ছোট গ্রাম ছেড়ে কাছের পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে উপরের দিকে উঠে যাওয়া নুড়িপাথরেপূর্ণ ঢাল অনুসরণ করে। এক ঘন্টা পরে, সে আর সৈন্যসারির প্রথমাংশ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাথরে পূর্ণ এলাকায় এসে পৌঁছে এবং ধীরে ধীরে আর একসারিতে বিন্যস্ত হয়ে পাথরের ভিতর দিয়ে আর গিরিখাতে তুষারপাতের ফলে সংগৃহিত জমাট বরফের ভিতর দিয়ে পথ করে নিয়ে আরো উপরে উঠতে থাকে। আরো দেড়ঘন্টা অতিবাহিত হবার পরে, ওয়াসিম পাঠান প্রায় আধ মাইল দূরে পর্বতশীর্ষের একটা সরু দীর্ঘ উচ্চভূমিরেখার দিকে ইঙ্গিত করে। সুলতান, ঐ উঁচু এলাকার অপর পাশেই প্রধান সড়ক অবস্থিত যা কাবুল থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গিয়েছে- ঐ পথ দিয়েই আপনার ভাই আসবে।
হুমায়ুন আর আহমেদ খান ওয়াসিম পাঠানকে অনুসরণ করে যে নিজের অবশিষ্ট হাতটা দিয়েই নিজের ঘোড়াটাকে আরও পাথর এবং বোল্ডারের ভিতর দিয়ে উঁচুভূমির শীর্ষভাগের দিকে এগিয়ে যায়। শীর্ষভাগে উপস্থিত হলে, জায়গাটা তখনও পুরু বরফের আবরণে ঢাকা, হুমায়ুন লক্ষ্য করে যে নীচের রাস্তার উপরে সেটা একটা ভীষণ সুবিধাজনক অবস্থানের সৃষ্টি করেছে এবং কাবুলের দিকে অগ্রসরমান কোনো অসন্দিগ্ধ বাহিনী লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের জন্য তকিদের লুকিয়ে থাকার পক্ষে নীচের পাথরের ফাটল একেবারে যথার্থ।
হুমায়ুন আক্রমণ পরিকল্পনা বলতে শুরু করে। কামরান আর তার বাহিনী আমাদের প্রত্যাশার পূর্বেই উপস্থিত হলে কোনো ধরনের জটিলতা পরিহারের উদ্দেশ্যে তবকিরা এইসব পাথরের ফাটলেই নিজেদের আহার আর নিদ্রার ব্যবস্থা করবে। আহমেদ খান অবিলম্বে তাদের নিজেদের অস্ত্র, বিছানা আর রসদ নিয়ে অবস্থান গ্রহণের আদেশ দেন। কিন্তু ওয়াসিম পাঠান আমরা বাকিরা কি করবো? আশেপাশে কি কোনো সমতল এলাকা রয়েছে- যেখানে উচ্চভূমি বরাবর আরো অগ্রসর হয়ে পর্যবেক্ষনের পূর্বে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করতে পারি? আমাদের এমন একটা স্থান খুঁজে বের করতে হবে যেখান থেকে আমরা কামরানের বাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণ করতে পারি, যাতে তাঁরা সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে আমাদের তবকিদের গুলির কবলে পড়বে।
