সুলতান, প্রায় চার হাজার। একটা ব্যাপার আমাদের পক্ষে রয়েছে যে সিন্ধু নদ অভিমুখে আপনি অনুসন্ধানী অভিযান পরিচালনার বিষয়ে চিন্তা করায় আমরা ইতিমধ্যে কাবুলের আশেপাশে বসবাসরত গোত্রগুলো থেকে লোক নিযুক্ত করা শুরু করেছিলাম।
নতুন যাদের নেয়া হয়েছে তারা কি অনুগত থাকবে? এইসব গোত্রগুলোর মানুষ ভীষণ রগচটা আর গোত্রের ভিতরে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের কারণে নানা উপদলে বিভক্ত।
সুলতান, আমাদেরও সেই রকমই ধারণা। আপনি তো জানেন যে, আমরা তাদের নিয়োগ করার সময়েই থোক একটা অর্থ দিয়েছি এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছি প্রতিটা বিজয়ের পরে আরো দেয়া হবে।
ভালো কথা। আমরা তাহলে পাঁচদিনের ভিতরে যাত্রা করবো।
চারদিন পরে- হুমায়ুন প্রথমে যেমনটা ভেবেছিল প্রস্তুতি নিতে তারচেয়ে কম সময় লাগে- সে তার বিশাল কালো ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের ঢালু পাথুরে পথ দিয়ে নীচের সমভূমিতে অবস্থিত কুচকাওয়াজ ময়দানের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে তাঁর চার হাজার সৈন্যের বাহিনী সমবেত হয়েছে, শীতল জোরাল বাতাসে অসংখ্য নিশান পতপত করে উড়ছে। সৈন্যসারির কেন্দ্রে হুমায়ুন তার নির্ধারিত স্থান গ্রহণ করার পরে, সে মনে মনে ভাবে যে হিন্দুস্তানে একদা তাঁর অধীনে যে বিশাল বাহিনী থাকতো তারচেয়ে এখন যদিও তারা সংখ্যায় অনেক অল্প, কিন্তু কামরানকে পরাস্ত করার জন্য এই সৈন্য সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশীই হবার কথা। তার প্রায় সব লোকই অশ্বারূঢ় এবং সে যেহেতু দ্রুতগতিতে অগ্রসর হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই এইদফা তাঁর সাথে কোনো কামান নেই, তাঁর অনেক সৈন্যের সাথেই ছয় ফিট লম্বা গাদাবন্দুক তাদের ঘোড়ার পর্যানে বাধা রয়েছে। অন্যদের সাথে রয়েছে ধনুক আর পিঠে আড়াআড়িভাবে ঝুলছে তীরভর্তি তূনীর।
আহমেদ খানের গুপ্তচরেরা নিশ্চিত করেছে যে কামরান আসলেই অগ্রসর হতে শুরু করেছে এবং সাফেদ পাহাড়ী অঞ্চলের দীর্ঘ গিরিন্দর দিয়ে অগ্রসর হয়ে, এতদিনে কাবুল থেকে দশদিনেরও কম দূরত্বে তার অবস্থান করার কথা। অভিযানের স্থায়ীত্বকাল কম হবার কারণে তারা এক সপ্তাহের কম সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরের মুখোমুখি হবে বলে আশা করছে- হুমায়ুন রসদ আর তাদের বহনকারী অন্যান্য উপকরণের পরিমাণ যতটা সম্ভব সীমিত রাখতে আদেশ দিয়েছে। উপকরণের অধিকাংশই যেমন শেষরাতের কুয়াশার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য কাপড়ের তাবু, তামার ডেকচি আর বস্তাভর্তি চাল- উটের পিঠে বাঁধা বেতের ঝুড়িতে চাপান হয়েছে। অবশিষ্ট উপকরণ বহনের জন্য সৈন্যসারির পিছনে সারিবদ্ধ অবস্থায় মালবাহী ঘোড়া আর খচ্চরের দল দড়ি বাঁধা অবস্থায় অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে অপেক্ষা করছে।
হুমায়ুন তার আধিকারিকদের মাঝে অবস্থান গ্রহণ করা মাত্র, সে তার তূর্যবাদকদের ইঙ্গিত করে তাঁদের লম্বা পিতলের তূর্য সংঘোষণে এবং তাঁর দামামাবাদকদের ঘোড়ার দুপাশে ঝোলান দামামায় রণসংগীতের বোল তুলতে। এটা সৈন্যসারির অগ্রসর হবার সংকেত, যার সাথে যোগ হয় ঘোড়ার চিহি রব আর ঘোড়ার সাজসজ্জার টুংটাং শব্দ এবং উদ্ধত-দর্শন উটের দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ।
*
অভিযানের তৃতীয় দিন বিকেলের দিকে, দক্ষিণের দিকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া উপত্যকা ঘিরে থাকা উঁচুনীচু পাহাড়ের কাছাকাছি খুব নীচু যখন সূর্য নেমে এসেছে, হুমায়ুন সেদিন রাতের মতো অস্থায়ী শিবির স্থাপনের বিষয় নিয়ে তাঁর আধিকারিকদের সাথে যখন আলোচনা করছে তখন আহমেদ খান ঘোড়া নিয়ে অর্ধবল্পিত বেগে সেখানে উপস্থিত হয়। তাঁর পাশে আরেকটা ঘোড়ায় রয়েছে। সাদা-চুলবিশিষ্ট রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে পোড় খাওয়া চেহারার এক লোক। হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে লোকটা তার লম্বা চুলঅলা পাহাড়ী টাটু ঘোড়াটা কেবল একহাতে সামলাচ্ছে এবং তার পরণের খয়েরী পশমের হাতাওয়ালা জ্যাকেটের ডান হাতের কনুইয়ের নীচের অংশটা আলগাভাবে ঝুলে আছে। বৃদ্ধ লোকটা বিস্ময়কর দ্রুততায় ক্ষিপ্রতায় ঘোড়া থেকে নেমে এসে মাথা নত করে হুমায়ুনকে অভিবাদন জানায়।
সুলতান, আহমেদ খান শুরু করে, এর নাম ওয়াসিম পাঠান। আমাদের গুপ্তদূতদের একজন তার গ্রামে গেলে এখানে আসবার জন্য সে অনুরোধ করেছিল। সে দাবী করে সে, কনৌজের যুদ্ধের আগে পুরো সেনাবাহিনীর সামনে আপনার পুরস্কৃত করা তিনজন সৈন্যের, একজন। শেরশাহের আগুয়ান বাহিনীর সাথে এক খণ্ডযুদ্ধে তাঁর ডানহাত কনুইয়ের থেকে কাটা পড়ে এবং দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে দেশে ফিরে যাবার সময় আপনি তাঁকে এক ব্যাগ মোহর দান করেন। সে তার বক্তব্যে স্বপক্ষে প্রমাণ হিসাবে এটা দেখিয়েছে। আহমেদ খান একটা ধুসর হয়ে যাওয়া লাল মখমলের ব্যাগ বের করে, যার উপরে মোগল সম্রাটের প্রতীক নক্সা করা রয়েছে।
ওয়াসিম পাঠান আপনাকে এবং সেই ঘটনার কথা দুটোই আমার ভালো করে মনে আছে। আপনার সাথে আবার দেখা হওয়ায় আমি কৃতজ্ঞ এবং মাঝের। বছরগুলো আপনি ভালোই ছিলেন বোঝা যাচ্ছে।
সুলতান, আহমেদ খানকে আমি বলেছি আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার ঋণের একটা সামান্য অংশ আমি পরিশোধ করতে চাই। বিগত বছরগুলোতে, আমি এখান থেকে মাত্র দুই মাইল দূরে চলাচলের মূল পথের পাশে একটা উপত্যকায় অবস্থিত আমার ছোট্ট গ্রামের মোড়লে পরিণত হয়েছি। আপনি আপনার চারপাশে যে পাহাড়ী এলাকা দেখছেন আমি এখানেই জন্ম নিয়েছি এবং বড় হয়েছি আর এখানের সব পথঘাট আমার নখদর্পণে। আমার গ্রামের পেছন থেকে নুড়ি পাথরে পূর্ণ একটা ঢাল উপরের দিকে উঠে গিয়েছে এবং তারপরে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা পাথরের ভিতর দিয়ে এঁকেবেঁকে উঠে গিয়ে উপত্যকার এই প্রধান চলাচলের রাস্তা, যেখান দিয়ে আপনার বিশ্বাসঘাতক সৎ-ভাইকে অবশ্যই যেতে হবে, তাঁর উপরে একটা অবস্থানে গিয়ে শেষ হয়েছে। আপনি এই উচ্চতা থেকে তাঁকে অতর্কিত আক্রমণ করতে পারবেন, গুলিবর্ষণ করে তার লোকদের ধরাশায়ী করতে পারবেন এবং তাঁকে পেছন থেকে আক্রমণ করতে পারবেন।
