সেখানে পৌঁছাবার পরে তুমি কি জানতে পারলে?
আমি আরো কয়েকদিন পরে যখন কামরানের দুর্ভেদ্যঘাটিতে উপস্থিত হই, আমি আবিষ্কার করি যে সেটা আসলে উঁচু পাহাড়ে, একটা সংকীর্ণ উপত্যকার একপ্রান্তে অবস্থিত একটা সুরক্ষিত গ্রাম। পুরো গ্রামটা উঁচু আর প্রশস্ত মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং চারপাশে গুচ্ছ গুচ্ছ কাপড়ের তাবু টাঙানো হয়েছে সেখানে আসবার পথে আমি যাদের দেখেছি সেইসব নবাগতদের বাসস্থান। ঔষধবিক্রেতা হিসাবে আমার নিজের ছদ্মবেশের উপর আস্থা রেখে আমি মাটির দেয়ালে অবস্থিত লোহার কীলক দেয়া পাল্লা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করি এবং ভেতরে অবস্থিত ছোট একটা বাজারে গিয়ে হাজির হই। পথের দুপাশে অবস্থিত দোকানগুলোতে কাঁচা শাকসজি এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু বাজারের কেন্দ্রস্থলে একটা শক্তসমর্থ লোক স্পষ্টতই একজন আধিকারিক- এক সারি করে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভাব্য নবাগত এবং তাঁদের বাহন পরীক্ষা করছে, লোকগুলোর পেটে খোঁচা দিয়ে তাঁদের মাংসপেশী পরীক্ষা করছে, তাঁদের অস্ত্রের ধার দেখছে এবং তাঁদের ঘোড়ার দাঁত এবং পায়ের পেশী খুটিয়ে দেখছে। সে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের এক তৃতীয়াংশ পরীক্ষা করার আগেই একটা হালকা লালচে হলুদ রঙের লম্বা ঘোড়ায় উপবিষ্ট হয়ে আপনার সৎ-ভাই তার কিছু সঙ্গীসাথী নিয়ে সেখানে হাজির হয় এবং তার চারপাশে নবাগতদের সমবেত হতে বলে। হঠাৎ এক পশলা। তুষারপাত হবার কারণে সেখানের প্রেক্ষাপট আর উপস্থিত সবাইকে সাদা রঙ রাঙিয়ে দেয়ার পরে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য আরম্ভ করেন।
সে ভাষণে কি বলেছে?
সুলতান, আমাকে মার্জনা করবেন। আমি ঠিক নিশ্চিত নই তার রূঢ় কথাগুলো আমার পুনরাবৃত্তি করা উচিত হবে কিনা, কারণ কথাগুলো আপনার সাথে সম্পর্কিত।
বলতে শুরু কর। শব্দগুলো তোমার না আমার সৎ-ভাইয়ের উচ্চারিত এবং আমি সেগুলো শুনতে আগ্রহী।
বক্তব্যটা ছিল অনেকটা এমন: আমার সৎ-ভাই, মহামান্য সম্রাট একজন দুর্বল, অস্থিরচিত্ত লোক, শাসনকার্য পরিচালনার যোগ্য নয়। তাঁর দৃঢ়োক্তি সত্ত্বেও সে এখনও আফিমে আসক্ত। নেকাটা তাঁকে চলচিত্ত আর নিষ্ক্রিয় করে তুলেছে। হিন্দুস্তানের সিংহাসন পুনরুদ্ধারের অনেক সুযোগ সে পেয়েছে কিন্তু সুযোগগুলো সে কাজে লাগাতে পারেনি। সে নয়- আমি আমার রয়েছে সম্পদ আর জমির জন্য সত্যিকারের ক্ষুধা, যা আমার মরহুম আব্বাজান বাবরকে উৎসাহিত করেছিল। আমার প্রতি অনুগত থাকলে আমি তোমাদের জন্য বিশাল পুরষ্কার বয়ে আনব।
হুমায়ুন উত্তেজিত হয়ে নিজের হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে রাখে। সত্যের একটা দানার সাথে নিজের মিথ্যের মিশেল দিয়ে এমন কথা বলা ধূর্ত কামরানের চরিত্রের সাথেই মানানসই। হিন্দুস্তানের পুনরুদ্ধারে কোনো ধরনের অগ্রগতি লাভে নিজের ব্যর্থতায় অস্বস্তিকর হতাশার হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য, হ্যাঁ, সে কালেভদ্রে কখনও কখনও আবারও আফিমের প্রবোধের দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সেই ব্যর্থতার কারণ কামরান নিজে এবং তাঁর অবিরত বিদ্রোহ। হুমায়ুন নিজেকে সংযত করে। লোকগুলো কিভাবে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে?
তারা তাকে উৎসাহিত করে এবং সে তাঁর সঙ্গীদের একজনকে ইশারা করলে, সে সবুজ চামড়া দিয়ে তৈরী বিশাল একটা বটুয়া বের করে। আপনার সৎ-ভাই সেখান থেকে কিছু রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে প্রত্যেককে পাঁচটা করে দিয়ে, বলে, এগুলো তোমরা ভবিষ্যতে লাভ করবে এমন অসংখ্য পুরস্কারের একটা মামুলি স্মারক। লোভে চকচক করতে থাকা চোখে তারা গর্জে উঠে বলে কামরান পাদিশাহ! আমৃত্যু আমরা আপনাকে অনুসরণ করবো।
সেটা হবে খুবই সংক্ষিপ্ত একটা যাত্রা। কামরান আর তারা যদি তাঁদের বিদ্রোহ অব্যাহত রাখে তাহলে নিশ্চিতভাবেই সবাই বেঘোরে মারা পড়বে। কিন্তু তুমি আপাতত বলতে থাকো।
আমি সেই বসতিতে চারদিন অবস্থান করে, নবাগতদের সাথে কথা বলি এবং তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির উপরে নজর রাখি। একজন পক্ককেশ আধিকারিক, অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে যিনি হাত পায়ের স্ফীতিতে ভুগছিলেন যার জন্য আমি তাঁকে সরিষার একটা পটি লাগাবার পরামর্শ দেই- আমি আল্লাহতালার প্রতি কৃতজ্ঞ- যা থেকে বোধহয় তিনি উপকার লাভ করেন, আমাকে জানান যে আর এক সপ্তাহরে ভিতরে তারা কাবুলের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা আরম্ভ করবেন। আমি এরপরে আর অপেক্ষা করাটা সমীচিন মনে করিনি এবং ফিরতি পথে যাত্রা শুরু করি। দশদিন আগে, ডাকাত আর যথেচ্ছাচারী গোত্রগুলোর হাত থেকে বাঁচতে আমি একটা কাফেলার সাথে যোগ দেই- যারা আজকে শহরে প্রবেশ করেছে।
হুসেন খলিল, তুমি তোমার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে। আহমেদ খান, গুপ্তদূতদের একটা দলকে এই মুহূর্তে পাঠান আমার ভাইয়ের অগ্রসর হবার চিহ্ন খুঁজে দেখতে।
সুলতান, আমি ইতিমধ্যেই আপনার কথামতো কাজ করেছি।
আধঘন্টার ভিতরেই দূর্গপ্রাসাদের অভ্যন্তরের বিশাল এক অগ্নিকুণ্ড দ্বারা উষ্ণ একটা কামরায় হুমায়ুনের চারপাশে তার সামরিক উপদেষ্টারা সমবেত হয়। হুমায়ুন প্রথমে হুসেন খলিলের প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার সবাইকে জানায় এবং তারপরে চোখে ক্রোধ আর কণ্ঠে ইস্পাতশীতল প্রতিজ্ঞা জারিত করে বলে, আমি আমার সৎ-ভাইয়ের রাষ্ট্রদ্রোহীতা আর সহ্য করবো না। গুপ্তদূত তার আক্রমণের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হবার বিষয়টা নিশ্চিত করায় আমি সে কাবুলের কাছে পৌঁছাবার পূর্বে আমরা এগিয়ে গিয়ে তাকে মোকাবেলা করি, সম্ভব হলে গিরিপথে তাঁকে অতর্কিতে আক্রমণ করা। সে কথা থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপরে জিজ্ঞেস করে, বৈরাম খান, আমরা খুব দ্রুত কত সৈন্যের সমাবেশ ঘটাতে পারবো?
