হুমায়ুন তন্ময় হয়ে ভাবে, যদি সেটা হয়ে থাকে তবে এখনও পর্যন্ত তার ধারণাই সঠিক বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। সে আর তার ঝানু পোড় খাওয়া সেনাপতিরা সম্ভাব্য সব উপায়ে চেষ্টা করে দেখেছে কিন্তু সাফল্য তাঁদের ধরা দেয়নি। দূর্গের চওড়া পাথরের দেয়ালে তাঁদের কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে, কিন্তু গোলন্দাজ বাহিনীর অনেক সদস্য দূর্গের প্রকারবেষ্টিত সমতল ছাদ থেকে নিক্ষিপ্ত গুলির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে যখন তাঁরা কামানগুলোকে কার্যকর রাখতে প্রযত্ন হয়েছে। গোলন্দাজেরা একবার যখন দূর্গের দেয়ালের একটা ক্ষুদ্র অংশ ভেঙে ফেলতে সফল হয় তখন হুমায়ুনের লোকেরা যখন পাথরে ভাঙা টুকরো টপকে এবং তার ভিতর দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করলে, গুজরাতিরা তাদের মাস্কেট দিয়ে হুমায়ুনের লোকদের দিকে গুলি করে পাখির মতো তাদের ধরাশায়ী করেছে। তাঁর লোকদের ভেতরে যারা প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল, তারা পরবর্তীতে নিজেদের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছে দূর্গ অভ্যন্তরে আরেকটা দেয়াল রয়েছে, গুজরাতিরা যার আড়াল ব্যবহার করে তাঁদের উপরে বুলেট আর তীর নিক্ষেপ করেছে এবং সাফল্যের সাথে তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করেছে। অন্য আরেকবার, পাথরের দূর্গ প্রাচীরের উন্মুক্ত পরিসরে খুব ভালোভাবে সুরক্ষিত গুজরাতি কামানগুলো, সামনাসামনি আক্রমণের একটা ধাক্কা ছত্রভঙ্গ করে দিতে সক্ষম হয় মোগলরা তখনও তাদের দেয়াল বেয়ে উঠবার মইগুলো স্থাপণ করার জন্য দূর্গ প্রাচীরের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি।
মৃত মোগল যযাদ্ধাদের কালো হয়ে যাওয়া এবং পচে ফুলে উঠা দেহগুলো দূর্গ প্রাচীরের সামনে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থেকে পচনক্রিয়া শুরু হতে গা-গুলিয়ে উঠা মিষ্টি একটা গন্ধে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠে এবং সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে কালচে-বেগুনী রঙের ডুমো মাছির ঝাঁক এসে উপস্থিত হয় যার সংখ্যা এখন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাঁর পুরো শিবিরে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে। আহত সহযোদ্ধাদের উদ্ধার করতে বা মৃতদের লাশগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে এতো বেশী লোক প্রাণ হারায় যে রাতের আঁধার ব্যাতীত এমন প্রয়াসের প্রতি হুমায়ুন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয় এবং তারপরেও হতাহতের সংখ্যা প্রচুর।
জওহর তাঁর প্রিয় পানীয় নিয়ে পুনরায় হাজির হলে ভাবনায় তখনকার মতো ছেদ পড়ে হুমায়ুনের। সে যখন শীতল উপভোগ্য তরল পান করছে তখন আরেকবার বাইরের দিকে তাকায় এবং মধ্যাহ্নের আকাশে কালো মেঘ জমতে দেখে। মেঘের রঙ আরো কালো হবে এবং আসন্ন বর্ষাকালের কারণে এখন আরো ঘন ঘন এমন বৃষ্টি হবে। বৃষ্টির কারণে দূর্গের অভ্যন্তরে অবস্থানরত প্রতিরোধকারীদের পানীয় জলের সমস্যা আপাতত মিটে যাবে আর হুমায়ুনের আক্রমণ প্রয়াসকে আরো বেশী কঠিন করে তুলবে। বর্ষাকাল তাঁর শিবিরে রোগের প্রাদুর্ভাব বয়ে আনতে পারে।
জওহর, স্থানীয় লোকেরা কি বলে আশেপাশের এলাকায় কখন বৃষ্টি হয়?
সুলতান, জুলাই মাসের মাঝামাঝি।
হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়, সে মনঃস্থির করে ফেলেছে। আমাদের অবশ্যই তার আগে এখানে আসবার উদ্দেশ্য হাসিল করতে হবে। আমাদের সামনাসামনি আক্রমণ একেবারেই ফলপ্রসু হচ্ছে না। আমাদের বিকল্প কিছু একটা খুঁজে বের করতে হবে এবং সেটা অচিরেই করতে হবে। আগামীকাল আমি নিজে আমাদের গুপ্তদূত সর্দারদের সাথে বের হব দেখতে যে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুজরাতিদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে এমন কোনো দুর্বলতা আমরা যদি সনাক্ত করতে পারি।
*
উন্মুক্ত পাথুরে শিলাস্তর, যার একেবারে পূর্বপ্রান্তে আপাতদৃষ্টিতে দুর্ভেদ্য চম্পনীর দূর্গ দাঁড়িয়ে আছে, দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে সে যখন তাঁর ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে চলেছে তখন হুমায়ুন তাঁর ধাতব শৃঙ্খল নির্মিত বর্মের নীচে কুলকুল করে ঘামতে থাকে। হতাশার একটা তীব্র অনুভূতি তার শারীরিক অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সে এবং তার গুপ্তদূতের দল শিলাস্তরের উত্তর দিকে এক নিষ্ফল তথ্যানুসন্ধান অভিযানে ইতিমধ্যে পাঁচটি উষ্ণ ঘন্টা অতিবাহিত করছে এবং দক্ষিণদিকের অর্ধেকটা ইতিমধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছে তারা। সে নিজে বা তার কোনো গুপ্তদূত যখনই ভেবেছে তারা একটা অরক্ষিত স্থান সনাক্ত করতে পেরেছে, যেখান দিয়ে তাঁর লোকেরা হয়ত উপরে উঠবার প্রয়াস পাবে, প্রতিবারই আরোহনকারী সৈনিকের পক্ষে দুরুত্তর কোনো ঝুলে থাকা পাথরে আছড়ে পড়ে সেই সম্ভাবনার সমাপ্তি ঘটেছে। একবার এক গুপ্তদূত বাহুদ্বয় শস্য মাড়ানোর কস্তনীর মতো আন্দোলিত করে, পেছনের দিকে আছড়ে পড়ার আগে পাথুরে দেয়ালের একটা ফাটল দিয়ে উপরের দিকে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পথ বেয়ে উঠে গেলে, মাস্কেটের একটা গুলির শব্দে যখন চারপাশের স্তব্ধতা খানখান হয়ে যায়, তখন সবাই বাস্তবিকই বুঝতে পারে যে পাহাড়ের কিনারে কোনো একটা বলির আড়ালে একটা গুপ্ত প্রতিরক্ষামূলক ফাঁড়ি রয়েছে।
জওহর, আমাকে একটু পানি দাও, একটা সুতির কাপড় দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে হুমায়ুন আদেশ দেয়। বাছা জলদি করো, জওহর তাঁর পর্যানের দুপাশে ঝোলান থলির ভিতরে পানির খোঁজে হাতড়াতে থাকলে সে গলা চড়ায়।
