আকবর আর বৈরাম খান দম নেবার জন্য প্রশিক্ষণ বন্ধ করলে, হুমায়ুন দেখে ভেড়ার চামড়ার ভারী হাতাওয়ালা আলখাল্লা পরিহিত একটা লোক, তার মুখ একটা লাল পশমী কাপড়ের নীচে ঢাকা পড়ে রয়েছে, আঙ্গিনায় প্রবেশ করছে। লোকটা জরুরী ভঙ্গিতে প্রহরীদের একজনের সাথে কথা বলে, যে প্রথমে আধিকারিকদের বাসস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে এবং তারপরে হুমায়ুনের নিজস্ব আবাসন কক্ষ দেখিয়ে দেয়। দশ মিনিট পরে, হুমায়ুন দরজায় একটা করাঘাত শুনতে পায় এবং জওহর ভিতরে প্রবেশ করে। সুলতান, আহমেদ খানের গুপ্তচরদের একজন দক্ষিণের সংবাদ নিয়ে ফিরে এসেছে। আহমেদ খান গুপ্তচরকে সশরীরে আপনার সামনে হাজির করে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবেদন পেশ করার জন্য জরুরী ভিত্তিতে আপনার দর্শন প্রার্থনা করেছেন। তারা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের ভেতরে নিয়ে এসো।
আহমেদ খানের অতি পরিচিত ছোপ ছোপ দাড়িঅলা চেহারা, কিছুক্ষণ পরে দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। হুমায়ুন ভেড়ার চামড়ার জ্যাকেট পরিহিত যে লোকটাকে আঙ্গিনায় দেখেছিল, সে আহমেদ খানের পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকটা তার মুখ থেকে লাল পশমের গলবস্ত্র আর মাথার টুপি খুলে রাখায় কয়েকদিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর মাথার পাতলা হয়ে আসা কালো চুল দেখা যায়, দুটোর কারণেই সম্ভবত তার যা বয়স, তাকে তার চেয়ে বেশী বয়স্ক মনে হয়। আহমেদ খান আর নবাগত লোকটা মাথা নীচু করে অভিবাদন জানায়।
আহমেদ খান, কি ব্যাপার?
সুলতান, এর নাম হুসেন খলিল- আমাদের সবচেয়ে সেরা আর বিশ্বস্ত গুপ্তচর। সে কিছুক্ষণ আগে দক্ষিণে খোস্তের আশেপাশের এলাকার সংবাদ নিয়ে ফিরে এসেছে।
আমি এইমাত্র যে কাফেলাটা শহরে প্রবেশ করতে দেখেছি, সেই কাফেলার সাথে সে এসেছে, তাই না? শহরে পৌঁছাবার পরে একপাত্র গরম স্যুপ কিংবা সরাইখানায় সদ্য প্রজ্জ্বলিত আগুনের সামনে বসে নিজেকে খানিকটা উষ্ণ না করে এত দ্রুত যদি সে আমাদের সাথে দেখা করতে আসে, তাহলে সে স্পষ্টতই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ বয়ে এনেছে।
সংবাদটা একাধারে গুরুত্বপূর্ণ আর সেই সাথে ভয়ানক। খোস্তের দক্ষিণে সৈন্য সগ্রহ করে আপনার সৎ-ভাই কামরান আরো একটা বিদ্রোহের পায়তারা করছে।
হুমায়ুন চোখ মুখ কুঁচকে চুপ করে থাকে। সে এমন একটা সংবাদ শোনার জন্য আপাতভাবে প্রস্তুতই ছিল কিন্তু আশা করেছিল যে হয়ত শুনতে হবে না। হিন্দালের মৃত্যু আর হজ্জের উদ্দেশ্যে আসকারি রওয়ানা দেবার পরে, হুমায়ুনের সৈন্যদের নিবিড় তল্লাশি সত্ত্বেও কামরান যেন পৃথিবীর বুক থেকে একেবারে হারিয়ে গিয়েছিল। হুমায়ুন নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে কামরান হয়ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে তার উচিত সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পরিহার করা এবং কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় পশ্চাদপসরণ করা কিংবা নির্বাসনে গিয়ে, হিন্দুস্তানের সিংহাসন খোয়াবার পরে এই প্রথম হুমায়ুনকে তাঁর সমস্ত লোকবল আর প্রচেষ্টা স্বাধীনভাবে সেটা পুনরুদ্ধারে নিবদ্ধ করা।
হুমায়ুন অবশ্য মনে মনে ঠিকই জানতো যে তাঁর ভ্রাতৃসম শত্রুদের ভিতরে কামরান সবচেয়ে দৃঢ়সংকল্প আর উদ্যমী এবং এটা অসম্ভব সে তার বিদ্রোহের প্রয়াস পরিহার করে হুমায়ুনকে স্বাধীনভাবে হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেবে। তাদের ভিতরে কোনো ধরনের শান্তি, কোনো ধরনের সন্ধি হওয়া অসম্ভব। কামরান কখনও তার মনের গভীরে গেঁথে যাওয়া বিশ্বাস থেকে সৃষ্ট ক্ষোভ বর্জন করেনি, যে বয়সে পাঁচ মাসের বড় হবার কারণে বাবর মারা যাবার আগে তাকেই সবকিছু দিয়ে গিয়েছে। সে সম্ভবত এটাও মনে মনে বিশ্বাস করে যে, বাবর তাঁর চেয়ে অপদার্থ হুমায়ুনকে বেশী ভালোবাসতো- খুব সম্ভব তাঁর কুটিল চরিত্রে মা গুলরুখ এই ধারণাটা ছেলের ভেতরে ঢুকিয়েছে। হুমায়ুন এসব কিছুই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না কিন্তু সে জানে, তাঁকে আরো একবার তার সৎ-ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং এইবার চিরতরে তাঁর হুমকির সমাপ্তি ঘটাতে হবে। কামরান ঠিক কোনো জায়গায় রয়েছে?
বালুচ আর আমাদের আফগান ভূখণ্ডের সীমানার কাছে, আহমেদ খান উত্তর দেয়। উঁচু পাহাড়, নির্জন উপত্যকা আর দূরবর্তী গুহার কারণে এলাকাটা বিদ্রোহী আর ডাকাতদের আত্মগোপন করে থাকার জন্য দারুণ এবং স্থানীয়দের সমর্থণ ছাড়া কারো পক্ষে সেখানে প্রবেশ করা অসম্ভব। কিন্তু হুসেন খলিল হয়ত তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা বলতে আগ্রহী?
অবশ্যই।
হুসেন খলিল এক পা থেকে অন্য পায়ে ভর স্থানান্তর করে এবং চোখ মাটির দিকে নিবদ্ধ রেখে খানিকটা সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে বলতে আরম্ভ করে, সে কথা বলার সাথে সাথে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে।
আহমেদ খানের আদেশে আমি অটমান ঔষধবিক্রেতার ছদ্মবেশে দক্ষিণে গমন করি- ঔষধপত্রের বিষয়ে আমার যৎসামান্য জ্ঞান আছে। আমি খোস্তের কাছাকাছি পৌঁছাবার পরে আমি একটা গুজব শুনতে পাই যে সেখান থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে একটা দুর্গম পাহাড়ী দূর্গে আপনার সৎ-ভাই আশ্রয় নিয়েছে। আমি সেখানে যাবার সিদ্ধান্ত নেই এবং খাড়া, পাথুরে রাস্তা, অগণিত গিরিপথ আর ছোট, আঁকাবাঁকা, কিন্তু খরস্রোতা নদী অতিক্রম করে একাকী রওয়ানা দেই। আমি যখন গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছাই, লক্ষ্য করি যে পথের ধারে অবস্থিত বিশ্রামাগার আর চায়ের দোকানগুলোয় লোকের উপচে পড়া ভীড়। দোকানগুলোর প্রায় সব খরিদ্দারই আমার মতো একই দিকে ভ্রমণ করছে। তাদের প্রায় সবাই সশস্ত্র এবং শক্তসমর্থ। আপনার সৎ-ভাইয়ের সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য তাঁরা রওয়ানা হয়েছে সেটা বোঝার জন্য খুব একটা মাথা খাটাবার প্রয়োজন হয় না এবং বস্তুত পক্ষে তাঁদের অনেকেই মনেপ্রাণে এতটাই প্রস্তুত যে কথাটা তারা লুকাবার দরকারও মনে করে না। আমি অবশ্য তারপরেও দূর্গটা নিজের চোখে দেখতে এবং ফিরে আসবার আগে সেখানে আপনার সৎ-ভাই কামরানের উপস্থিতি আর তাঁর অনুগত বাহিনীর সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানবার সিদ্ধান্ত নেই।
