হুমায়ুনের কানে তাঁর রক্ত ধপধপ শব্দে বাড়ি মারতে থাকে। লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করতে পেরে তার বেশ ভালোই লাগে। সে তার মুখ মোছার সবুজ কাপড়টা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে, সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে বেঁচে থাকা অবশিষ্ট গুটিকয়েক লুটেরা কুয়ার উপরের কাঠের কাঠামোর সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা কয়েকটা ঘোড়ার দিকে ছুটে যাচ্ছে। একজনও যেন পালাতে না পারে। নিজের ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পালাতে থাকা লোকগুলোর দিকে দৌড়াতে শুরু করার আগে সে চিৎকার করে বলে। হানাদারদের একজন মাত্র লাফিয়ে নিজের ঘোড়ায় উঠতে যাবে, এমন সময় সে সামনের দিকে ঝুঁকে এসে তাঁর কাঁধ চেপে ধরে এবং প্রচণ্ড এক ধাক্কায় তাকে মাটিতে ছিটকে ফেলে দেয়। হুমায়ুন তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠে, তুমি কার লোক? এই মুহূর্তে আমার প্রশ্নের জবাব দাও নতুবা আমার তরবারির ফলা তোমার কণ্ঠনালি ছিন্ন করবে। লোকটা বাতাসের অভাবে হাঁসফাস করে এবং কথা বলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করার মাঝেই হুমায়ুন পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুনে।
তারা সবাই আমার লোক। আমি আত্মসমর্পণ করছি। আসেন এসব বিরোধের একেবারে অবসান ঘটাই।
হুমায়ুন ঘুরে তাকিয়ে তাঁর কাছ থেকে মাত্র চারগজ দূরে আসকারিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, কৃশকায় মুখটা তার ডান ভ্রর উপরের ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে ভেজা। তাঁর পায়ের কাছে নিজের বাঁকান তরবারি এবং নিক্ষেপক খঞ্জর পড়ে রয়েছে। আসকারির লোকেরা যখন দেখে তাদের দলপতি কি করেছে, বাকি লোকেরা তখন নিজেদের অস্ত্র ত্যাগ করে।
হুমায়ুনের লোকেরা ইতিমধ্যে চারপাশ থেকে তাঁদের ঘিরে ফেলেছে। সবকটাকে বেঁধে ফেল, সে আদেশ দেয়। তারপরে, ঘোড়া থেকে নেমে সে মন্থর পায়ে আসকারির দিকে এগিয়ে যায়। নিজের ভাইয়ের এহেন আচরণের কারণে খানিকটা বিভ্রান্ত এবং আসকারি যদি নিজের অস্ত্র ফেলে না দিয়ে ব্যবহার করলে সে তার হাতে মৃত্যুর কত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল সেটা বুঝতে পেরে, দুটো অনুভূতির সম্মিলন তাকে একটা সহজাত আবেগের শরণ নিতে বাধ্য করে- ক্রোধ।
আমার লোকদের আমাদের লোকদের এমন ক্ষতি আর ধ্বংস সাধনের সাহস তোমার কিভাবে হলো?
আসকারি কোনো উত্তর দেয় না।
একাকি কোনো কিছু করার সাহস তোমার কখনও ছিল না। কামরান নিশ্চয়ই আশেপাশেই কোথাও রয়েছে। কোথায় সে?
আসকারি তাঁর মুখের ক্ষতস্থান থেকে তখনও গড়াতে থাকা রক্ত হাত দিয়ে মুছে নেয়। আপনি ভুল করছেন। গত পাঁচমাস কামরানের সাথে আমার দেখা হয়নি। আমি জানি না সে কোথায়। তাঁর চোখের কালো মণি হুমায়ুনের দিকে সরাসরি তাকায়।
হুমায়ুন তাঁর কাছে এগিয়ে আসে এবং কেউ যাতে তাদের কথোপকথন শুনতে পায় সেজন্য গলার স্বর নামিয়ে নেয়। আমি তোমার কথা বুঝতে পারলাম না। তুমি এখানে উপস্থিত রয়েছে সেটা বোঝার আগেই তুমি পেছন থেকে আমাকে আক্রমণ করতে পারতে।
হ্যাঁ।
কি মনে করে তুমি নিজেকে বিরত রাখলে?
আসকারি কাঁধ ঝাঁকায় এবং দৃষ্টি সরিয়ে অন্যত্র তাকিয়ে থাকে। হুমায়ুন শক্ত করে তাঁর কাঁধ চেপে ধরে। নির্দোষ লোকদের আক্রমণ করতে, এইসব দুবৃত্তদের- সে চাপা ক্রোধে যুঁসতে থাকা কয়েকজন চকরার দিকে ইঙ্গিত করে তার লোকেরা দড়ি দিয়ে মুরগীর মতো যাদের দুহাত পিছনে বেঁধেছে- খুন আর ধর্ষণ করার অনুমতি দিতে তুমি দ্বিধা করনা, তাহলে নিজের আপন রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়কে আক্রমণ করতে কেন ইতস্তত করলে…?
হুমায়ুন…
না, আমি বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখেছি, আমি আসলে জানতে আগ্রহী নই। ব্যাপারটা সম্ভবত কাপুরুষোচিত। তুমি জানতে যে আমায় আক্রমণ করলে আমার লোকেরা তোমায় খুন করে ফেলবে। তুমি কত অনুতপ্ত আর কিভাবে যা কিছু ঘটেছ সবকিছুর জন্য কামরান দায়ী- সে সম্বন্ধে আমি আর নতুন করে কোনো মিথ্যা কথা শুনতে চাই না। হুমায়ুন ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দেহরক্ষীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠে, একে আমার সামনে থেকে নিয়ে যার এবং কাবুলে পৌঁছান পর্যন্ত আমি যেন এর চেহারা আর না দেখি। তার চেহারা দেখলে আমি নিজেই লজ্জিত হয়ে উঠি।
*
হুমায়ুন কাবুলে ফিরে আসবার পরে দশদিন অতিবাহিত হয়, হেমন্তের আগমনে যখন গাছেরা লাল আর সোনালী রঙে সাজতে শুরু করে, সে অবশেষে আসকারিকে তাঁর সামনে পুনরায় উপস্থিত করার আদেশ দেয়। নিজের লোকদের কাছে সে নির্জলা সত্যি কথাটাই বলে তাঁর সৎ-ভাইয়ের এহেন অধঃপতন আর তাঁদের পরিবারের প্রতি যে অসম্মান সে বয়ে এনেছে সেজন্য নিজের সৎ-ভাইয়ের কারণে সে লজ্জিত। ভূগর্ভস্থ অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে বন্দি থাকার কারণে পূর্বের চেয়ে মলিন আর কৃশকায় হয়ে উঠা আসকারি হাত বাঁধা, পায়ে শেকল পরিহিত আর প্রহরী পরিবেষ্টিত অবস্থায় পা টেনে টেনে হুমায়ুনের ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করে। আমাদের একা থাকতে দাও, হুমায়ুন তাঁদের আদেশ দেয়, কিন্তু আমি ডাকলেই শুনতে পাবে এমন জায়গায় থাকো। তাদের পেছনে উঁত কাঠের তৈরী দুই পাল্লার দরজাটা বন্ধ হতে হুমায়ুন তার গিল্টি করা চেয়ারের দিকে হেঁটে গিয়ে, বসে এবং চোয়ালে হাত রেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে আসকারির মুখের দিকে তাকায়।
