কিভাবে, সেটা করতে চান, সুলতান? জাহিদ বেগ জানতে চায়।
যে ব্যক্তি আমার সৎ-ভাইদের যে কোনজনকে বন্দি করতে পারবে তাঁকে আমি আমার দেহের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ দান করবো। আমরা সেই সাথে আমাদের নিজেদের প্রয়াসও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবো- তাদের বন্দি করার জন্য আমরা আমাদের পুরো সেনাবাহিনী নিয়োজিত করবো। আমি নিজে তাদের নেতৃত্ব দেবো। আমি সেই সাথে আমাদের সঙ্গে এই অভিযানে অংশ নেবার জন্য উপজাতীয় লোকদের বিশাল অংকের পারিশ্রমিক প্রদান করবো। পাহাড়ের প্রতিটা বলি আর চড়াই উতরাই তাদের চেনা। আশি শপথ করছি আমার সৎ-ভাইদের বন্দি করে তবেই আমি বিশ্রাম নেব।
*
সুলতান, আমাদের একটা পর্যবেক্ষক দল কারাবাগের দিক থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখেছে, আহমেদ বেগ বলে, আস্কন্দিত বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে হুমায়ুনের কাছে এসে সে তার সাদা ঘোড়ার লাগাম এত জোরে টেনে ধরে যে প্রাণীটা ফোঁসফোঁস শব্দে প্রতিবাদ করে উঠে।
তোমার মনে হয় সেখানের বসতি কেউ আক্রমণ করেছে?
সুলতান, আমি একদম নিশ্চিত ভাবে সেটা বলতে পারি।
তাহলে দেরী কেন, চলো এগিয়ে যাই। গনগনে কমলা রঙের সূর্যের নীচে নিদাঘ-তপ্ত শক্ত মাটির বুকে তাঁর ঘোড়ার খুর যখন ঢাকের বোল তুলে, হুমায়ুন নিজেকে এই আকাঁকু অন্তত দেয় যে শেষ পর্যন্ত কামরান আর আসকারির কাছাকাছি সে পৌঁছাতে পেরেছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে কাবুলের উত্তরের পাহাড়ী উপত্যকায় সে আর তার লোকেরা বিশাল এক হানাদার বাহিনীকে ক্রমাগত ধাওয়া করে চলেছে, প্রতিবারই তারা পৌঁছে কেবল পোড়া বসতি, তছনছ হওয়া ফলের বাগান আর প্রচণ্ড গরমে পচতে শুরু করা মৃতদেহ দেখতে পেয়েছে। কিন্তু কারাবাগ থেকে তারা মাত্র চার মাইল দূরে রয়েছে। হুমায়ুন তার যৌবনে বহুবার এখানে শিকারে এসেছে বলে এলাকাটা সে ভালো করেই চেনে- বিশাল, সমৃদ্ধ একটা এলাকা যেখানে আখরোট আর খুবানির বাগান রয়েছে, বাগানের মাটির দেয়ালের পাশে উইলো বনের ধারে দিয়ে বয়ে যাওয়া নহরের পানি দিয়ে, যেখানে চাষাবাদ করা হয়।
তাকে অনুসরণ করছে পাঁচশ সুসজ্জিত সৈন্যের একটা দল- অশ্বারোহী তীরন্দাজ এবং উজ্জ্বল, ইস্পাতের ফলাযুক্ত বর্শা সজ্জিত অশ্বারোহী যোদ্ধা- সে ভাবে কারাবাগ যারাই আক্রমণ করে থাকুক, তাঁদের মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট সৈন্য তাঁর সাথে রয়েছে। চূড়ায় কয়েকটা অল্পবয়সী ওকগাছ সমৃদ্ধ একটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে বাঁক নিতেই তাদের সামনে কারাবাগ এবং এর সমৃদ্ধ ফলের বাগান দৃশ্যমান হয়। হুমায়ুনের যেমনটা মনে আছে সামনের দৃশ্যপট মোটেই তেমন সুখকর নয়। ফসলের মাঠ আর ফলের বাগানে আগুন জ্বলছে এবং মাঠের উপর ভাসতে থাকা ঝাঝালো গন্ধযুক্ত ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে সে দেখে যে বসতির প্রবেশদ্বার ভাঙা। তাঁর মনে হয় ঘোড়ার খুরের বজ্রগম্ভীর শব্দ ছাপিয়ে সে আর্তনাদের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে।
ন্যায়ের তরে! হুমায়ুন মাথার উপরে আলমগীর বৃত্তাকারে ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করে উঠে এবং নিজের দেহরক্ষীদের পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য সে তার ঘোড়ার পাঁজরে নির্মমভাবে গুতো দিতে থাকে। সেই প্রথম ভাঙা প্রবেশদ্বারের নীচে দিয়ে বসতিতে প্রবেশ করে, বৃদ্ধ এক লোকের মৃতদেহের চারপাশে নিজের ঘোড়া নিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে যার রক্তাক্ত পৃষ্টদেশে একটা রণকুঠার গেঁথে রয়েছে। তাঁর ডান দিকে, বিশ গজ দূরে, হুমায়ুন দুজন লোককে দেখে তাদের মাথার ভেড়ার পশমের তৈরী অপরিপাটি, গোলকাকার টুপি দেখে বোঝা যায় লোকগুলো চকরা গোত্রের আতঙ্কিত একটা মেয়েকে বাসার ভেতর থেকে টেনে বের করে আনছে। তাঁদের একজন ইতিমধ্যেই নিজের ঢোলা পাজামার দড়ি খুলে ফেলেছে। হুমায়ুনকে দেখে তাদের চোয়াল ঝুলে পড়ে। মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে, সে হাচড়পাঁচড় করে সামনে থেকে সরে যায়, তারা দুজনেই নিজেদের ধনুকের উদ্দেশ্যে হাত বাড়ায় কিন্তু হুমায়ুন তাঁদের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। সে তার তরবারির এক মোক্ষম কোপে প্রথমজনের দেহ কবন্ধ করে দেয়, লোকটার ছিন্নমুণ্ড উষ্ণ বাতাসে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পাথরের সরদলে আছড়ে পড়ে। তারপরে, পিছনের দিকে ঝুঁকে গিয়ে ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে টেনে সে তার ঘোড়াকে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড় করিয়ে ফেলে এবং নিমেষ পরেই প্রাণীটাকে সামনের দিকে এগোতে বলে, যাতে এর সামনের পায়ের খুর দ্বিতীয় চকরার খুলিতে হাড় ভাঙার সন্তোষজনক শব্দ সৃষ্টি করে।
তার লোকেরা যারা তাকে অনুসরণ করে বসতিতে প্রবেশ করেছিল চারপাশে এখন প্রাণ খুলে লড়াই উপভোগ করছে। লুটেরার দল, ধর্ষণ আর লুট করার অভিপ্রায়ে আগত, পুরোপুরি অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছে। যে যেখানে পারে আড়ালের সন্ধানে দৌড়াতে শুরু করে। কিন্তু হুমায়ুনের পুরো ভাবনা জুড়ে এখন কেবল তার সৎ-ভাইয়েরা বিরাজ করছে। সে তার ঘোড়া চক্রাকারে ঘুরিয়ে, চারপাশে ধ্বস্তাধ্বস্তি, চিৎকার করতে থাকা বিশৃঙ্খল মানুষের ভীড়ে তাদের খুঁজতে চেষ্টা করে। সুলতান, মাথা নীচু করেন! আর্তনাদ, চিৎকার আর অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাপিয়ে সে আহমেদ খানের হুশিয়ারি শুনতে পায় এবং ঠিক সময়ে মাথা নীচু করে পাশের একটা বাড়ির সমতল ছাদের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাকড়া চুলের দানবাকৃতি একটা মানুষের তাঁকে লক্ষ্য করে নিক্ষিপ্ত বর্শার ফলা এড়িয়ে যায়। হুমায়ুন তার ঘোড়ার পর্যানের সাথে যুক্ত দড়ি থেকে ঝুলন্ত রণকুঠারটা তুলে নেয় এবং বাতাসের ভিতর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে সেটাকে ছুঁড়ে মারে। কুঠারটা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার বুকে এতো জোরে আঘাত করে যে সে উপর থেকে সোজা পেছনের দিকে উল্টে পড়ে, যেন গাদাবন্দুকের গুলি আঘাত করেছে।
