একটা জিনিষ আমি কোনোদিনই বুঝতে পারিনি। তুমি আমার জন্য হুমকির কারণ হবার পরেও আমি দুই দুইবার তোমার জান বখশ দিয়েছি। তার চেয়েও বড় কথা, আমার হিন্দুস্তান অভিযানে আমি কেবল আমার ভাই হিসাবে তোমায় অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানাইনি বরং আমার একজন মিত্র হিসাবে তোমাকে পাশে চেয়েছিলাম… আমি তোমায় সবকিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও তুমি নিশ্চয়ই ভেবেছো যে আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি…
আসকারি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে। আপনি কোনো অন্যায় করেননি, নীচু কণ্ঠে সে অবশেষে বলে।
আপনি যা কিছু আমাকে আর কামরানকে দিতে চেয়েছেন সেসবই ছিল আপনার প্রতিভাত গৌরবের একটা ক্ষুদ্রতম অংশ- আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ড কিংবা ক্ষমতা নয়। আমি আপনার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারছি আপনি আমার কথা বুঝতে পারেননি, কিন্তু আপনার কাছে জীবন সবসময়েই আপনার তথাকথিত মহান নিয়তি।
এটা কেবল আমার একার নিয়তি নয়- আমাদের সবারই এতে অধিকার আছে।
তাই কি? আমাদের লোকদের মাঝে যে প্রবচন প্রচলিত রয়েছে, তখত, তক্তা, সিংহাসন বা শবাধার সে সম্বন্ধে কি বলবেন? সেটা কিন্তু মোটেই বাটোয়ারা করা নিয়তি না- প্রবচনটার অর্থ একটাই সবকিছুর অধিকার বিজয়ীর। হুমায়ুন, আমরা বরং খোলাখুলি আলোচনা করি- বিগত বছরগুলোতে আমরা যেমন আলোচনা করেছি সম্ভব হলে তার চেয়ে বেশী সতোর সাথে কথা বলি। আমি আপনাকে পছন্দ করি না সত্যি কিন্তু আমি আপনাকে ঘৃণাও করি না…আমি কখনও সেটা করিনি। আমি কেবল আমার নিজের জন্য কিছু একটা অর্জন করতে চাইছিলাম আমার স্থানে থাকলে আপনিও একই কাজ করতেন।
তুমি লোভ আর প্রতিহত উচ্চাশার পক্ষে সাফাই দিতে চেষ্টা করছে।
আসকারি মাথা নীচু করে নিজের হাতের বাঁধনের দিকে তাকায়। আপনি বিষয়টাকে এভাবে ব্যাখ্যা করতেই পারেন। আমি এটাকে স্বাধীন, স্বাবলম্বী হবার আকাঙ্খ হিসাবে দেখি- আমাদের মরহুম আব্বাজান যদি নিজের সাম্রাজ্য তাঁর সন্তানদের মাঝে যথাযথভাবে ভাগ করে দিতেন যেমনটা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করেছিলেন তাহলে আমি যেমন স্বাধীনতা ভোগ করতাম। সে কথা শেষ করে।
কিন্তু আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার কোনো দরকার ছিল না। হিন্দাল করেনি।
হিন্দালের উল্লেখ করায় আসকারির সাধুম্নন্য অভিব্যক্তি বদলে যায়। হিন্দাল আমাদের সবার থেকে আলাদা। সে যেমন ভদ্র ছিল তেমনি বিশাল ছিল তাঁর দৈহিক আর মানসিক গুণাবলী। সে ছলনা জানতো না এবং এতটাই অকপট ছিল যে, সে আশা করতে সবাই তার মতো এক কথার মানুষ। হামিদাকে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আপনি আপনার একজন বিশ্বস্ত মিত্র খুইয়েছিলেন… সহসা আসকারির চোখে অশ্রু ছলছল করে উঠে। আমি যদি…কিন্তু কি লাভ…।
তুমি পারলে কি করতে? হুমায়ুন তাঁর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং আসকারির কাছে এগিয়ে আসতে বহুদিন বন্দিদশায় কাটাবার কারণে তাঁর কাপড় এবং ত্বক থেকে সেঁতসেঁতে তীব্র কটুগন্ধ হুমায়ুনের নাকে ভেসে আসে।
হিন্দালকে আমি হত্যা না করলেও পারতাম।
তুমি? আমি ভেবেছিলাম কামরান কাজটা করেছে…।
সে নয়। কাজটা আমি করেছি।
কিন্তু কেন? সে কিভাবে তোমার ক্ষতি করেছিল?
আমি তাঁকে হত্যা করতে চাইনি। পুরো ব্যাপারটা একটা দুর্ঘটনা। নিয়তির নিষ্ঠুর এক সমস্থানিকতা। এক অমাবস্যার রাতে আমি আমার লোকদের নিয়ে ডাকাতির উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। অন্ধকারে দ্রুতগামী একদল অশ্বারোহীর সাথে আমাদের দেখা হয়, যারা নিজেদের পরিচয় দিতে বা থামতে রাজি হয় না। আমি তাদের দলপতিকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে সে তার পর্যান থেকে ঢলে পড়লে তার বাকি লোকেরা আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যায়। আমি যখন দলপতির দেহের দিকে তাকাই… আমি দেখি সেটা হিন্দালের মৃতদেহ… হুমায়ুনের চোখের দিকে তাকান থেকে বিরত থেকে আসকারি বোকাটে একঘেয়ে সুরে কথাগুলো বলে। আমি আমার লোকদের আদেশ দেই কাবুলের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের বাইরে তাঁর মৃতদেহটা রেখে আসতে, যাতে বন্য পশুপাখি তাঁর দেহটাকে ক্ষতবিক্ষত করার আগেই কেউ সেটা খুঁজে পায়, যাতে আপনি তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সমাধিস্থ করতে পারেন।
আমি সেটা করেছি। তার ইচ্ছা অনুসারেই তাঁকে আমাদের আব্বাজানের পাশেই কবর দেয়া হয়েছে। হুমায়ুন তখনও তার সৎ-ভাইয়ের চোখে মুখে ফুটে থাকা অনুশোচনাটা মেনে নিতে চেষ্টা করছে এমন সময় হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একটা ভাবনা তার মাথায় খেলে যেতে সহসা একটা অন্ধকার এলাকা আলোকিত হয়ে উঠে।
আমাকে আক্রমণ না করে তুমি আত্মসমর্পণ করেছিলে হিন্দালের কারণেই, তাই না? তুমি অনায়াসে আমাকে খুন করে ফেলতে পারতে…
হ্যাঁ। আমার অপরাধবোধ আমি আর বহন করতে পারছিলাম না। সবকিছুই এত নশ্বর। অনুশোচনার যে বোঝা আমি ইতিমধ্যে বহন করে চলেছি তার সাথে আরেক ভাইয়ের হত্যার দায় যোগ করতে চাইনি।
হুমায়ুন আসকারির বয়ান নিয়ে চিন্তা করার সময় টের পায় তার নিজের চোখের কোণেও অশ্রু টলটল করছে। অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে হিন্দাল দক্ষিণে এসে নিজেকে কেন বিপদের মাঝে ঠেলে দিয়েছিল, যেখানে সে জানে কামরান আর আসকারির ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর সাথে তার হয়ত দেখা হতে পারে? হিন্দাল তাঁর সাথে একটা সমঝোতার উদ্দেশ্যে কাবুলের দিকে আসছিলো এমনটা চিন্তা করা কি স্বপ্নচারিতা হবে? সে এখন আর সেটা কখনও জানতে পারবে না…
