*
অনেকেই এখন মোগলদের সবুজ নিশানের নীচে ফিরে আসতে প্রস্তুত।
এইসব না করে, কামরান আর আসকারির এই হুমকি দীর্ঘায়িত কোনো অভিযান সূচনা করা তার জন্য অসম্ভব করে তুলেছে। শেরশাহের প্রধান আধিকারিকেরা একত্রিত হয়ে নতুন সম্রাট পছন্দের সময় পেয়েছে। শেরশাহের বড় ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করে সামরিক দক্ষতার চেয়ে যিনি তাঁর বিলাসিতার কারণে বেশী পরিচিত। তারা তাঁর ছোট ছেলে ইসলাম শাহকে নির্বাচিত করে, যার প্রথম কাজই ছিল বড় ভাইকে হত্যার আদেশ দেয়া। হুমায়ুন বিষয়টার তাৎপর্য ঠিকই বুঝতে পেরেছে। কামরান আর আসকারিকে মার্জনা করার পরিবর্তে সে যদি প্রাণদণ্ড দিত, তাহলে ইসলাম শাহের পরিবর্তে আগ্রার তখতে সে অধিষ্ঠিত থাকতো।
তার সৎ-ভাইয়েরা যে এতোদিন তাঁর পরিকল্পনাকে বিলম্বিত করবে, এটা হুমায়ুনকে একাধারে ক্রুদ্ধ এবং ব্যথিত করে তুলে। তাঁর ক্ষমা প্রদর্শনের প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতাবোধ কোথায়? কামরানের ব্যাপারে তাঁর বোধকরি বিস্মিত হওয়াটা মানায় না, তাঁর প্রতি কামরানের ঈর্ষা আর ঘৃণা আপাতভাবেই অপ্রশম্য, কিন্তু আসকারি কিভাবে এমন শঠতার সাথে তাঁর উদারতার প্রতিদান দেয়? কান্দাহারে আসকারি যখন তার কাছে আত্মসমর্পন করে, তাকে দেখে মনে হয়েছিল সে অনুশোচনা বোধ করছে, এমনকি নিজের কৃতকর্মের জন্য সে লজ্জিত। সেই অনুভূতিগুলো হয়ত যথার্থই ছিল কিন্তু কামরানের প্রভাবে প্ররোচনায় সেগুলো বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। আসকারি তাঁর পুরোটা জীবন কামরানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসেছে…
আপেল গাছের নীচে জন্মান মিষ্টি ঘাসের উপর তার ঘোড়াটাকে দিয়ে চরতে দিয়ে জওহর যেখানে প্রাণীটার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেদিকে মন্থর পায়ে হেঁটে যাবার সময়েও হুমায়ুনের মনের ভিতরে নানা ধরনের চিন্তা খেলা করতে থাকে। ঘোড়ার পর্যাণে উঠে বসেই দূর্গপ্রাসাদে দ্রুত ফিরে যাবার অভিপ্রায়ে হুমায়ুন প্রাণীটার পাজরে গুঁতো দেয়। সে মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হিন্দালের মৃত্যু একটা ইশারা যে আর অপেক্ষা করাটা সমীচিন হবে না, সত্যের অপলাপ আর না, আবেগপূর্ণ আশায় বুক বাধার দিন শেষ যে তার সৎ-ভাইয়েরা হয়ত এখনও কোনো মীমাংসায় পৌঁছাতে পারবে। তাদেরকে নিজেদের পাহাড়ী আড্ডাখানা থেকে দাবড়ে বের করার প্রচেষ্টা তাঁর এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। আরো দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে কিছু একটা করতে হবে…
সেদিন রাতের বেলা, হুমায়ুন তার দরবার কক্ষে যখন প্রবেশ করছে, সে দেখে তাঁর সেনাপতি এবং পরামর্শদাতারা ইতিমধ্যেই সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে। তাঁদের মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে সে এখনও নিজের অজান্তে একজন লোককে খুঁজতে থাকে কাশিম, যার শান্ত বিবেচনাবোধ এবং নিরঙ্কুশ আনুগত্য তাঁর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ শাসনামলের গুটিকয়েক অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যের অন্যতম ছিল। কিন্তু গত শীতে, বরফাবৃত আঙ্গিনা অতিক্রম করার সময়ে কশিম পা পিছলে পড়ে গিয়ে নিজের ডান উরুর হাড় ভেঙে ফেলেন। তাঁর হাকিমেরা আফিম দিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে রাখলেও তাঁর বৃদ্ধ শরীরের জন্য আঘাতটা বড্ড বেশী মারাত্মক ছিল। তিনি সংজ্ঞাহীনতার অতলে ডুবে যান এবং দুইদিন পরে সারাজীবন সবকিছু যেভাবে সম্পন্ন করেছেন ঠিক সেভাবেই নিরবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ফারগানার বালক-রাজা হিসাবে তার রাজত্বকালের শুরুর দিকের অনিশ্চিত দিনগুলোতে তিনি বাবরের সাথে ছিলেন, ঠিক যেমন তিনি সবসময়ে হুমায়ুনের পাশে থেকেছেন। হুমায়ুন তার শান্ত, আশ্বাসদায়ক উপস্থিতি আর তাঁর মৃদু কণ্ঠে ক্রমাগত মূল্যবান উপদেশ শুনতে ভীষণভাবে অভ্যস্ত। তাঁর মৃত্যু মানে আক্ষরিক অর্থেই অতীতের সাথে সম্পর্কছেদ।
কিন্তু হুমায়ুনকে এখন ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে হবে। নিজের সিংহাসনে পিঠ সোজা করে উপবিষ্ঠ হয়ে সে শুরু করে। আমার সৎ-ভাইদের ব্যাপারে আমার ধৈৰ্য শেষ হয়ে গিয়েছে। তাদের সেনাবাহিনী যতক্ষণ না ধ্বংস করা হচ্ছে এবং তাঁদের বন্দি করা হচ্ছে তারা সবসময়ে একটা হুমকি হিসাবে বিরাজ করবে।
আমাদের সেনাবাহিনীর বরাত মন্দ…একদিন আমরা নিশ্চয়ই তাদের বন্দি করতে পারবো, জাহিদ বেগ বলে। কামরান আর আসকারিকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হওয়াকে সে নিজের সম্মানের জন্য হানিকর বলে গন্য করে।
আমরা এখন যেভাবে চেষ্টা করছি সেভাবে করতে থাকলে আমরা সন্দেহ আছে- যদি আমাদের কপাল খুব ভালো না হয়। আমার অনেক দিন থেকেই সন্দেহ যে আমাদের সেনাবাহিনীতে আর শহরেও তাদের গুপ্তচর রয়েছে। সেজন্যই তারা সবসময়ে আমাদের ফাঁকি দিতে পারছে, আমাদের শক্তি আর সময় অপচয়ে বাধ্য করছে যা অন্যত্র আরো কার্যকরী উপায়ে ব্যবহৃত হতে পারতো।
কিন্তু আমরা আর কিভাবে চেষ্টা করতে পারি? জাহিদ বেগ।
আমি সেজন্যই আপনাকে এখানে ডেকে পাঠিয়েছি। কামরান, আসকারি আর তাঁদের পাহাড়ি হানাদারদের পরাস্ত করা কোনোমতেই আমাদের সাধ্যাতীত কোনো ব্যাপার নয়। কাবুল প্রাচুর্যময় একটা রাজ্য। বণিকের দল যারা ব্যবসার কাছে এখানে আসে এবং আমাদের সরাইখানায় অবস্থান করে তাদের সংখ্যা প্রচুর। তাদের দেয়া খাজনায় আমাদের কোষাগার সমৃদ্ধ করে। আমি এই সম্পদ আমার দীর্ঘ দিন যাবত স্থগিত অবস্থায় থাকা হিন্দুস্তান অভিযানের জন্য সঞ্চিত রাখছিলাম কিন্তু আমি এখন এই সম্পদের কিয়দংশ পরিমাণ আমার সৎ-ভাইদের সমস্যা চিরতরে দূর করার জন্য ব্যয় করছে আগ্রহী…
