হুমায়ুন ক্রমশ প্রবল হতে থাকা অমঙ্গলের পুর্বানুভব নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় এবং ঝুঁকে গিয়ে মৃতলোকটার মাথাটা উঁচু করে তুলে ধরে। তার দিকে তাকিয়ে থাকা হিন্দালের তামাটে চোখের মণিতে কোনো ভাষা নেই। ভাইয়ের পলকহীন চোখের দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে হুমায়ুন চোখের পাতাগুলো বন্ধ করে দেয়। সে চোখের পাতা বন্ধ করার সময় ভাইয়ের মৃতদেহের উষ্ণতা অনুভব করে চমকে উঠে, তারপরে সে বুঝতে পারে যে হিন্দালের মুখটা ঘোড়ার পাজরের সাথে ঝুলছিল। সে পরিকর থেকে নিজের খঞ্জর বের করে আনে এবং দেহরক্ষীদের দূরে দাঁড়িয়ে থাকার ইঙ্গিত করে দড়ি কাঁতে শুরু করে যা দিয়ে হিন্দালের মৃতদেহটা কেউ একজন ঘোড়ার সাথে বেঁধে দিয়েছিল। সে তারপরে পরম মমতায় ভাইয়ের মৃতদেহটা আলতো করে তুলে নিয়ে, মুখটা উপরের দিকে রেখে, প্রাঙ্গণের চ্যাপ্টা, বর্গাকার পাথরের উপরে নামিয়ে রাখে। মৃতদেহটার পাশে হাটু মুড়ে বসে থাকা অবস্থায়, ঘনায়মান অন্ধকারের ভেতরে আহমেদ খানের একজন লোকের উঁচু করে ধরে রাখা একটা মশালের দপদপ করতে থাকা হলুদাভ আলোয় সে হিন্দালের গলায় একটা তাজা ক্ষতচিহ্ন দেখতে পায়- যা কেবল তীরের অগ্রভাগ দ্বারাই হওয়া সম্ভব।
শোকের বেনোজলে তার অস্তিত্ব ধুয়ে যেতে থাকে। তাঁর সৎ-ভাইদের ভিতরে সে হিন্দালকেই সবচেয়ে বেশী পছন্দ করতো। সৎ, সাহসী আর নৈতিকতাসম্পন্ন, এবং তাঁর অন্যান্য ভাইদের চেয়ে অনেক কম উচ্চাভিলাষী, সম্ভবত বাবরের সব সন্তানের ভিতরে হিন্দালই ছিল অন্তরের দিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ। ভাই আমার, আমি দোয়া করি তোমার বেহেশত নসীব হোক এবং বেঁচে থাকা অবস্থায় আমি তোমাকে যে কষ্ট দিয়েছি মৃত্যুতে তুমি আমায় সেজন্য মার্জনা করবে, হুমায়ুন ফিসফিস করে বলে। তারুণ্যে ভরপুর হিন্দালের অবয়ব এবং গর্বিত ভঙ্গিতে তাঁর আকবরকে উদ্ধার করার কাহিনী বর্ণনা করার দৃশ্য হুমায়ুনের মানসপটে ভাসতে থাকে, তার দুচোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে। হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখের পাতা মুছে, পুনরায় উঠে দাঁড়াবার আগে হুমায়ুন বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চায়, মৃতদেহটা কে খুঁজে পেয়েছে?
সুলতান, আমিই প্রথম দেখেছি, মশালধারী সৈন্যটা বলে, হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে, সদ্য যৌবনে পা দেয়া একটা ছেলে।
কোথায়?
শহর থেকে আধমাইল দূরে সবুজ রঙের কয়েকটা জুনিপার ঝোপের পাশে শাহজাদার ঘোড়াটা দড়ি বাঁধা অবস্থায় ঘাস খাচ্ছিল।
কেউ একজন তারমানে প্রাণ সংহারক তীরটা বের করে, হিন্দালকে তার ঘোড়ার সাথে বেঁধে তারপরে তাকে এমন স্থানে রেখে গিয়েছে যেখানে তাঁকে কেউ খুঁজে পাবে। হুমায়ুন অবসন্ন মনে ভাবে, পুরো ব্যাপারটার ভিতরে কামরানের কাজের ধারা স্পষ্টভাবে ফুটে রয়েছে। কামরান আর আসকারিকে ক্ষমা করার দুই মাসের ভিতরে, ক্ষমাপ্রদর্শনের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দূরে থাক, দুজনেই কাবুল থেকে পালিয়ে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে পুনরায় সবদ্ধ হয়ে, তারা হানাদারে পরিণত হয়, দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত শক্তঘাঁটি থেকে উপজাতীয় লোকদের একটা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে তারা ধেয়ে আসত- বেশীরভাগ সময়েই অরাজক কাফ্রি বা চরখা গোত্রের লোকেরা তাদের সাথে থাকতো, কিন্তু দুই ভাইয়ের কোনো বাছবিচার ছিল না, তারা যাদের খুঁজে পেতো তাদেরই ব্যবহার করতো- হুমায়ুনের সীমান্তচৌকি এবং কাবুলের সমৃদ্ধির উৎস- এর প্রাণশক্তি বণিকদের মালবাহী কাফেলা আক্রমণ করতে। আকবরকে উদ্ধারের সময় হিন্দালের বিশ্বাসঘাতকতাকে কামরান কখনও ক্ষমা করেনি এবং হিন্দালকে হত্যা করে তাঁর মৃতদেহটা একটা বার্তা হিসাবে হুমায়ুনকে পাঠাবার মতো বিদ্বেষী মনোভাব নিশ্চিতভাবেই কামরানের রয়েছে।
কিন্তু আসলেই ঠিক কি ঘটেছিল? কামরানই যদি হত্যাকারী হয়ে থাকে, হিন্দালের মৃত্যু কি তাহলে ভাগ্যচক্রে দেখা হয়ে যাবার ফলে সংঘটিত কোনো ঘটনা নাকি উত্তরের পাহাড়ী এলাকায় কামরান তাঁকে হত্যা করার জন্যই খুঁজে বের করে খুন করেছে, যেখানে আকবরকে উদ্ধার করার পরবর্তী বছরগুলোতে সে নিজের জন্য একটা আশ্রয়স্থল তৈরী করেছিল? আমার ভাইয়ের মৃতদেহ আর তাঁর ঘোড়ার পর্যাণে ঝোলান থলি খুঁজে দেখো। তাঁকে কিভাবে বা কেন এমন পরিণতি বরণ করতে হয়েছে, সে সম্বন্ধে আমাদের জানাতে পারে এমন যেকোনো কিছুর সন্ধান করো। হুমায়ুন আদেশ দিয়ে চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়, সে দাঁড়িয়ে থেকে এই কাজটা দেখতে পারবে না।
সে অন্ধকারে যেখানে দাঁড়িয়ে, আপন ভাবনা আর স্মৃতি রোমন্থনে বিভোর হয়েছিল, কয়েক মিনিট পরে একজন সৈন্য সেখানে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। সুলতান, তার ঘোড়ার পর্যাণে এই চিরকুটটা ছাড়া আমরা গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই খুঁজে পাইনি। হুমায়ুন কাগজের টুকরোটা নিয়ে মশালের আলোয় সেটা পড়ে। নির্দিষ্ট কাউকে উদ্দেশ্য না করে সংক্ষিপ্ত কয়েকটা বাক্যে হিন্দাল জানিয়েছে, যদি তাঁর কিছু হয় তাহলে তাঁকে যেন তাঁর আব্বাজানের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। সে আরও লিখেছে যে তাঁর চুনি বসান খঞ্জরটা তাঁর ইচ্ছা যেন আকবরকে দেয়া হয় যা একসময় বাবরের কোমরে শোভা পেত। সুলতান, খঞ্জরটা এখনও তার পরিকরে গোঁজা রয়েছে। সৈন্যটা এবার একটা রূপালী ময়ান এগিয়ে দিতে, এটাও চুনির কারুকাজ করা, মশালের আলোয় সেটা দ্যুতি ছড়াতে থাকে। হিন্দালকে তাহলে যেই হত্যা করে থাকুক সে চোর নয়, হুমায়ুন ভাবে। এটা থেকে সে আরও একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয় যে হিন্দাল সম্ভবত অপ্রত্যাশিতভাবে আর সহসাই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে, নিজের খঞ্জর ময়ান থেকে বের করার সময়ও সে পায়নি। সে আবারও কামরানের সবুজ চোখ, অবজ্ঞাপূর্ণ চাহনি দেখতে পায়…
