আকবরের কথার উল্লেখে, হামিদার মুখাবয়ব খানিকটা কোমল দেখায়, কিন্তু তখনও সেখান থেকে অনিশ্চয়তা আর সন্দিগ্ধচিত্ততর রেশ পুরোপুরি মিলিয়ে যায় না। হামিদার জন্য বিষয়টা মেনে নেয়াটা খুব কঠিন। কামরানের উপরে নিজের ক্রোধান্বিত আক্রমণের কথা হুমায়ুন ভাবে। সে নিজের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করার সুযোগ অন্তত পেয়েছিল…
আমি কামরানকে ঘৃণা করি। আমি তাঁকে কখনও ক্ষমা করতে পারবো না।
হামিদা, কামরানকে ক্ষমা করার কথা আমি তোমাকে বলছি না। আমি খুব ভালো করেই জানি সেটা তুমি কখনও পারবে না। আমি তোমাকে কেবল বলছি যে আমার উপরে…আমার বিচার-বিবেচনায় ভরসা রাখো। কামরানকে মাফ করে দেয়ার পেছনে আমার আরো ব্যক্তিগত একটা কারণ আছে…আমার মরহুম আব্বাজানের প্রতি আমার আনুগত্য এবং সর্বোপরি মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তাঁর ব্যক্ত করা অভিপ্রায় এবং আমার সৎ-ভাইদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিশোধপরায়ন আচরণ না করা, তাঁরা যতই এর যোগ্য হোক না কেন, অনুসরণ করা। তার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা যে তার পরে আমিই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবো, সেটা মেনে নিতে তাঁদের ব্যর্থতা, আমি তাঁকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সেটা পালন করতে আমাকে বিরত রাখতে পারবে না।
হুমায়ুন সরাসরি হামিদার চোখের দিকে তাকায়। আমার সিদ্ধান্তে যদি তুমি আঘাত পেয়ে থাকো তাহলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত কিন্তু তুমি নিশ্চিতভাবে জেনো কোনো কিছুই তোমার জন্য আর আমাদের সন্তানের জন্য আমার ভালোবাসাকে বদলাতে পারবে না এবং আমার মৃত্যুর সময়ে, আল্লাহর ইচ্ছা থাকলে যার এখনও অনেক দেরী আছে, আমায় আমার আব্বাজান যেমন অধিষ্ঠিত করেছিলেন তেমনি হিন্দুস্তানের সিংহাসনে আমি আকবরকে নিরাপদে অধিষ্ঠিত করে যাবো।
আপনি যদি আমাকে বলেন যে কামরানকে বেঁচে থাকতে দিলে আকবরের ভবিষ্যত অনেকবেশী নিরাপদ হবে, তাহলে সেটা আমি অবশ্যই মেনে নিতে রাজি আছি। আমাদের সন্তানের ভবিষ্যত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি আপনাকে মিথ্যা বলতে পারবো না। আমি সর্বান্তকরণে চাই যে কামরান মারা যাক। আমি অনেক শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম যদি সেটা জানতে পারতাম।
আকবরের জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো হবে।
হামিদার মুখে অবশেষে হাসি ফুটে উঠে এবং সে হুমায়ুনের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দেয়। ঘুমাতে আসুন। অনেক রাত হল।
*
হুমায়ুন পরেরদিন সকালবেলা প্রায় দশটার সময় যখন জেনানাদের আবাসস্থল থেকে বের হয়ে আসলে দেখে মুখে আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি নিয়ে জওহর তার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে। সুলতান, সুসংবাদ… দারুণ সংবাদ। আমাদের গুপ্তচরেরা সংবাদ নিয়ে এসেছে যে শেরশাহ মারা গিয়েছে। রাজস্থানে তিনি একটা দূর্গ আক্রমণ করেছিলেন যখন আলকাতরা ভর্তি জ্বলন্ত একটা গোলক যা তার অবরোধে পারদর্শী প্রকৌশলীদের নিক্ষিপ্ত দূর্গের দেয়ালে আঘাত করে ঠিকরে এসে বারুদের গুদামে পড়ে। পুরো গুদাম বিস্ফোরিত হয়ে শেরশাহ আর তার দুজন বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। তারা বলেছে শেরশাহের দেহের টুকরো কয়েকশ গজ দূরে ছিটকে গিয়েছে।
এই সংবাদ কি নির্ভরযোগ্য?
গুপ্তচরেরা বলেছে বেশ কয়েকটা সূত্র থেকে সংবাদটা তারা জেনেছে। তাঁদের সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।
সংবাদটা বিশ্বাস করতে হুমায়ুনের বেশ কষ্ট হয়। এটা যেন তাঁর নিজের সৎ-ভাইদের ক্ষমা করা আর প্রজাদের একত্রিত করার সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করছে। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে হিন্দুস্তানের সিংহাসন পুনরায় করতে তাঁদের খুব দ্রুত এবং সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমার সেনাপতিদের আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। আমার সৎ-ভাইদেরও আমাদের সাথে যোগ দিতে দাও। আমাদের পরিবারের নিয়তি পরিপূর্ণ করতে আমরা একত্রে যাত্রা করবো।
৪.১ মোগলদের প্রত্যাবর্তন – চতুর্থ পর্ব
চতুর্থ পর্ব – মোগলদের প্রত্যাবর্তন
২১. এক ভাইয়ের মর্মবেদনা
সুলতান, আপনাকে এখনই একবার আসতে হবে।
হুমায়ুন বুটি দ্বারা খচিত করা কালো চামড়ার ময়ানে ইস্পাতের উপরে হাতির দাঁতের কারুকাজ করা তরবারির ফলাটা- অধীনস্ত এক জায়গীরদার সম্প্রতি উপহারটা পাঠিয়েছে পুনরায় ঢুকিয়ে দেয় যা সে মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। জওহর, কি ব্যাপার?
জওহর দুহাত প্রসারিত করে অসহায় একটা ভঙ্গি করে এবং হুমায়ুন তার মুখাবয়বে ভীষণ বিপর্যস্ত একটা অভিব্যক্তি প্রত্যক্ষ করলে সে আর কোনো প্রশ্ন না করে তাকে অনুসরণ করে। সন্ধ্যা দ্রুত ঘনিয়ে আসছে এবং হুমায়ুন যখন দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নিচের প্রাঙ্গণে নামতে থাকে, ইট পাথরের কঠিন অবয়ব তখন বেগুনী ছায়ার আড়ালে মসৃণ হতে শুরু করেছে। তোরণদ্বারের ঠিক ভেতরেই আহমেদ খানের চারজন লোক একটা বাদামী রঙের লম্বা ঘোড়ার চারপাশে জটলা করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হুমায়ুন ঘোড়াটার কাছাকাছি যেতে লক্ষ্য করে যে প্রাণীটার গলা আর কাঁধে গাঢ় একটা কিছুর দাগ রয়েছে যা মাছি আকৃষ্ট করছে, এবং তাঁকে অভিবাদন জানাতে তার লোকেরা ঘোড়াটার কাছ থেকে সরে দাঁড়াতে, সে দেখে পর্যানের উপরে মুখ নীচের দিকে করা অবস্থায় একটা দেহ বাধা রয়েছে, দেহটা মৃত হরিণের মতোই নিথর। ঘোড়াটার গায়ের চামড়ায় রঙের তারতম্য জমাট রক্তের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মৃতদেহটাই কেবল তার অখণ্ড মনোযোগ আকর্ষণ করে। সে যদিও চোখের সামনের দৃশ্যটা বিশ্বাস করতে চায় না কিন্তু পেষল দেহটা সে বোধহয় চিনতে পেরেছে, যার নির্জীব হাত আর পা এতোই লম্বা যে ঘোড়র পেটের নীচে অব্দি সেগুলো ঝুলে রয়েছে।
