কামরান আর আসকারির পেছনে তাঁদের নিজ নিজ সেনাপতিরা সারিবদ্ধভাবে অবস্থান গ্রহণের পরে, হুমায়ুন তাঁর নিজের সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য শুরু করে। তোমরা দেখো তোমাদের সামনের এই লোকগুলোকেই আমরা পরাস্ত করেছি। তারা সেই লোক যারা আমাদের রক্তপাতের কারণ এবং আমাদের বন্ধুদের হত্যাকারী। কিন্তু আমাদের লড়াই করা এই যুদ্ধটা ছিল আত্মীয় আর ভাইয়ের ভেতরে একটা সংগ্রাম। এটা আমি যেমন খুব ভালো করে জানি তোমাদের ভেতরে আরো অনেকেই সেটা হাড়ে হাড়ে জানে। আমাদের সেই সব লোকদের সাথে লড়াই করতে হয়েছে যাদের সাথে আমাদের উচিত ছিল একত্রে দলবদ্ধ হয়ে হিন্দুস্তানে আমাদের ভূমি জবরদখলকারী সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা। আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টিকারী ঈর্ষা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে অনেক বড় ব্যাপার লক্ষ্য এবং উত্তরাধিকার আর ঐতিহ্য এসব কিছুর উচিত ছিল আমাদের একত্রিত রাখা। আমাদের নিজেদের ভিতরের এই বিভক্তি থাকলে আমরা আর কখনও হিন্দুস্তানের আমাদের প্রভুত্ব অর্জন করতে পারবো না। আমরা একতাবদ্ধ হলে ঠিক এতটাই শক্তিশালী হব যে আমাদের কাউকে ভয় পাবার নেই। আমাদের শত্রুর কেবল তখন ভয় পাওয়া উচিত- আমাদের বিজয় আর উচ্চাশা তখন হবে মাত্রা ছাড়া।
এই একটা কারণের জন্য আমি শাস্তি দেবার চেয়ে, যদিও সেটাই তাঁদের প্রাপ্য, আমি পুনর্মিত্রতার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার প্রাক্তন শত্রুদের ভেতরে তোমাদের সামনে তোমরা যাদের দেখতে পাচ্ছো, আমি তাদের ক্ষমা করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কেবল একটাই শর্ত তারা হিন্দুস্তানে আমাদের সাম্রাজ্য অর্জন আর প্রসারণের জন্য আমাদের সাথে যোগ দেবে।
হুমাযন কথাটা বলেই আসকারির দিকে এগিয়ে যায় এবং একটা ছোট খঞ্জর বের করে তাঁর হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করে। আসকারিকে আলিঙ্গণ করার সময় সে টের পায় যে আসকারি শমিত হয়েছে এবং তাঁর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু তার সৎ-ভাইয়ের কান্নাভেজা গালের সাথে ঘষা খায়। তারপরে সে কামরানের দিকে এগিয়ে যায় এবং তারও হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে তাকে বুকে টেনে নেয়। কামরানের দেহ আড়ষ্ট মনে হয় কিন্তু সে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে না। হুমায়ুন যখন তার আর আসকারির হাত শূন্যে তুলে ধরে দরবারে উপস্থিত সবার উল্লাস ধ্বনির সাথে সুর মিলিয়ে চিৎকার করে উঠে বলে, আগামী হিন্দুস্তান পুনরায় আমাদের হবে, তখনও সে কোনো রকম বাধা দেয় না।
এক ঘন্টা পরে, রাজমহিষীদের নির্ধারিত আবাসস্থলে অবস্থিত হামিদার আবাসন কক্ষের দিকে হুমায়ুনকে যেতে দেখা যায়। গতকাল সন্ধ্যাবেলা গুলবদন আর আকবরকে নিয়ে সে এসেছে এবং পরিবারের সবার একসাথে পুনরায় মিলিত হবার আনন্দে তারা কামরান কিংবা তার পরিণতি নিয়ে কোনো আলাপ করেনি। সে যখন কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করছে, তখনই হামিদার অভিব্যক্তি দেখে সে বুঝতে পারে যে তার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে হামিদা আগেই জেনেছে।
আপনি কিভাবে এটা করতে পারলেন! হামিদা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। আপনি কামরানকে ক্ষমা করে দিয়েছেন- যে আপনার সন্তানকে অপহরণ করেছিল এবং কাবুলের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উপরে মানব বর্ম হিসাবে তাঁকে প্রদর্শিত করেছিল। আপনি কি পাগল হয়ে গিয়েছেন? আমার অনুভূতি আর আমাদের সন্তানের প্রতি কি আপনার কোনো দায়িত্ব নেই?
তুমি ভালো করেই জান আমি তোমাদের কতটা ভালোবাসি। এটা একটা কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। একজন শাসককে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে আরো অনেককিছু বিবেচনা করতে হয়। তাঁর সাম্রাজ্যের জন্য কি ভালো হবে তাকে সেটা অবশ্যই চিন্তা করতে হবে। আমি যদি কামরানকে মৃত্যুদণ্ড দিতাম তাহলে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুসারী আর আত্মীয়স্বজনের অনেকেই আমার অপ্রশম্য শত্রুতে পরিণত হতো, আসকারির কথা বাদই দিলাম, কান্দাহার আমার কাছে সমর্পণের কারণে যাকে আমি আগেই জান বখশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আমি যদি কামরানকে বন্দি করতাম, তাহলে সে ষড়যন্ত্র আর অসন্তোষের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতো। তাঁর সেনাপতিদের শাস্তি দিলেও ফলাফল একই। দাঁড়াতো। বিদ্রোহের কারণে আমাদের পরিবারই কেবল বিপর্যস্ত হয়নি। আমার শত্রুদের সাথে একটা আপোষ করার চেয়ে তাঁদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্য উসকে দেয়াটা বোকামী হবে। আমি যদি আবারও হিন্দুস্তান নিজের করায়ত্ত্ব করতে চাই, আমাদের এই পর্যন্ত আসতে যারা আমাদের সমর্থন করেছে তারা ছাড়াও, আমার অধীনস্ত সব জায়গিরদার আর অভিজাতদের স্বতস্ফূর্ত সমর্থন আমার প্রয়োজন হবে।
আমি অবশ্যই পারি অন্যদের আমার সাথে যুদ্ধযাত্রায় বাধ্য করতে কিংবা খাজনা দিতে, কিন্তু তারা তখন ষড়যন্ত্র শুরু করবে কিংবা পক্ষত্যাগ করার সুযোগ খুঁজবে নিদেনপক্ষে দেশে ফিরে যাবার অজুহাত খুঁজবে। আমি এসব করে আমার হারান রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারবো না। সবচেয়ে নিকটজনের কাছ থেকে পাওয়া আঘাতের ক্ষত নিরাময়ে সবচেয়ে বেশী সময় লাগে। কিন্তু আমি যদি আমার ভাইদের কাছ থেকে আঘাত নিরাময় করতে পারি তাহলে আমার সাম্রাজ্য শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে আকবরের অবস্থান তাহলে আরও নিরাপদ হবে।
