সেদিন রাতে, ভোজসভার শেষের দিকে, যখন শেষপদ পরিবেশন করা শুরু হয়েছে নানারকম মিষ্টান্ন যার ভেতরে রয়েছে আখরোটের পুর দেয়া শুকনো খুবানি, পেস্তাবাদাম আর কিশমিশ দেয়া দই পনির- সবকিছুই রূপার বারকোশে সাজিয়ে আনা হয়েছে, হুমায়ুন তার সেনাপতিদের দিকে তাকায়, সবাই খাবার উপভোগ করছে আর হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আর ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করছে। সন্তুষ্টির একটা অনুভূতি তাকে আপুত করে বহুবছর সে এমনটা বোধ করেনি। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের সাহস আর দক্ষতা সম্বন্ধে তাঁর মনে কখনও কোনো সংশয় ছিল না; কিংবা নিজের অনুগত লোকদের প্রতি কোনপ্রকার দ্বিধাবোধ। কিন্তু সে জানে সে এখন হয়ত অন্য সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো শক্তির অধিকারী হয়েছে। সে ক্রমশ একজন প্রকৃত শাসক আর নেতার মতো নিজের কর্তৃত্বের ব্যাপারে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে এবং বৈরাম খানের মতো লোকদের, যাদের সাথে তাঁর পূর্ব-স্বীকৃত কোনো সম্পর্ক নেই, আনুগত্য লাভের ক্ষমতাও সে অর্জন করেছে।
কিন্তু তাঁদের কি হবে যাদের সাথে তাঁর কোনো না কোনো ধরনের সম্পর্ক রয়েছে কিন্তু যারা আনুগত্যহীন যাদের ভেতরে রয়েছে কামরান আর আসকারিকে সমর্থন করেছিল, এমনসব সেনাপতি আর অভিজাত লোকজন আর অবশ্যই এই একই দোষে দুষ্ট তার নিজের সৎ-ভাইয়েরা? হুমায়ুনের মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠে। সে দূর্গপ্রাসাদের প্রবেশ করার পরে থেকে গত ষাট ঘন্টা সে কেবলই এদের বিশেষ করে কামরানের ভবিতব্য নিয়ে চিন্তা করছে। নিজের সন্তানের জীবন হুমকির মুখে ফেলার জন্য খালি হাতে নিজের সৎ-ভাইয়ের উপর প্রতিশোধ নেয়ার আন্ত্রিক আকাঙ্খর কাছে সে আরেকটু হলেই পরাভব মানতো।
কিন্তু তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হবার পরে সে এখন অনেক সংযত হয়ে চিন্তা করতে শুরু করেছে। সে কামরানকে কখনও মন থেকে ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু তাঁর রাজবংশের মাঝে বিদ্যমান মতবিরোধ গভীর করার চেয়ে উপশমের চেষ্টা করলে সে এই বংশের ভবিষ্যতের জন্য এই প্রয়াসের প্রতি ঋণী থাকবে। তার মরহুম আব্বাজানের পবিত্র মুখাবয়ব- সেই সাথে কামরানের উজ্জ্বল সবুজ চোখ দুটো- তাঁর মানসপটে ভাসতে থাকে। সহসা আত্মবিশ্বাস আর সন্তুষ্টিবোধের একটা যুগপৎ ফরুধারা তাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। হুমায়ুন উঠে দাঁড়িয়ে জওহরকে তাঁর কাছে ডেকে আনে। কামরান আর আসকারিকে এখনই আমার সামনে উপস্থিত করো, সেই সাথে আমরা যাদের বন্দি করেছি তাদের ভিতরে যারা শীর্ষস্থানীয় সেনাপতি।
সোয়া ঘন্টা পরে, জওহর ফিসফিস করে হুমায়ুনকে জানায় যে দরবার কক্ষের দরজার পুরু পাল্লার বাইরে বন্দিরা অপেক্ষমান। হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং হাততালি দিয়ে সবাইকে নিরবতা পালন করতে বলে। তার আধিকারিকেরা তাঁদের হাতের পানপাত্র ও আহারের অনুষঙ্গ নামিয়ে রাখতে গমগম করতে থাকা কক্ষের ভেতরে প্রায় সাথে সাথে একটা অপার্থিব নিরবতা বিরাজমান হয়, তারা মিষ্টান্নের কারণে চটচটে হয়ে উঠা ঠোঁট মুছে নিয়ে এবং তাঁদের সম্রাটের প্রতি তাঁদের অখণ্ড মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে।
আমার অনুগত সেনাপতিবৃন্দ, আমাদের বিজয় আমরা উদযাপন করেছি এবং আমাদের শত্রুকে পরাস্ত করায় আমাদের উল্লসিত হওয়াটা ন্যায়সঙ্গত, কিন্তু আমাদের আরাধ্য কেবল অর্ধেক অর্জিত হয়েছে। আমাদের এখন অবশ্যই ভবিষ্যতের দিকে আর হিন্দুস্তানের উপর পুনরায় প্রভুত্ব স্থাপণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। আমাকে অবশ্য প্রথমে সেইসব লোকদের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যারা তোমাদের থেকে আলাদা, আমার প্রতি কোনোরকম আনুগত্য তারা প্রদর্শন করেনি এবং রক্তের সম্পর্ক আর পুরুষানুক্রমিক দায়িত্ববোধ অবহেলা করেছে। বন্দিদের ভেতরে নিয়ে এসো।
দরবার কক্ষের দরজার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন পরিচারক পাল্লা দুটো খুলে দিতে কামরান পায়ে হেঁটে দরবারে প্রবেশ করে। তাঁর দুহাত পিছমোড়া করে বাঁধা কিন্তু তাঁর পায়ে কোনরকম বেড়ি পরানো হয়নি। মাথা উঁচু, পিঠ টানটান সোজা করা এবং কালশিটে পড়া, বাজপাখির মতো নাকযুক্ত মুখাবয়বে আবেগের লেশমাত্র নেই, সে ডানে বামে কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা সামনের দিকে হাঁটতে থাকে যতক্ষণ না তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসা প্রহরীরা হুমায়ুনের দশ ফিট সামনে তাঁকে থামতে ইঙ্গিত করে। তার ঠিক পেছনেই রয়েছে আসকারি, যাকে দূর্গপ্রাসাদে নিয়ে আসার পরে আরামদায়ক ব্যক্তিগত আবাসন কক্ষে অন্তরীণ রাখা হয়েছে কিন্তু তারও হাত অবশ্য পিছমোড়া করে বাঁধা। সে যদিও নিশ্চিতভাবেই জানে যে তাঁর ভাইয়ের চেয়ে তার ভয় কম, কারণ হুমায়ুন নিজে তাঁকে তাঁর প্রাণ বখশ দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কামরানের চেয়ে তার অভিব্যক্তি অনেক বেশী আড়ষ্ট। তাঁর কপালে হাল্কা স্বেদবিন্দু ফুটে রয়েছে, এবং চারপাশে তাকিয়ে সে হুমায়ুনের লোকদের ভিতরে যাদের চিনতে পারে তাদের উদ্দেশ্যে সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে হাসতে চেষ্টা করে। কামরান আর আসকারির দশজন বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতি তার ঠিক পেছনেই রয়েছে। দশজন সেনাপতির ভেতরে রয়েছে ঝাকড়া চুলের মোটাসোটা এক উজবেক যোদ্ধা যার নাম হাসান খলিল, এবং শাহি বেগ নামে আরেকজন, ছোটখাট দেখতে কিন্তু দুর্দান্ত সাহসী এক তাজিক, যার বাম গালে একটা সাদা সীসা-রঙের একটা ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। সে ছিল কাবুলে কামরানের প্রধান সেনাপতি এবং বস্তুত পক্ষে হুমায়ুনের নিজের সেনাপতি জাহিদ বেগের আত্মীয় সম্পর্কিত ভাই। শাহি বেগ দরবার কক্ষে যখন প্রবেশ করে, হুমায়ুন লক্ষ্য করে দুই যোদ্ধার দৃষ্টি এক পলকের জন্য পরস্পরের সাথে মিলিত হয় কিন্তু তারপরে দুজনেই সাথে সাথে অন্যদিকে তাকায়।
