ব্যাথায় চাপা আর্তনাদ করে একটা উট ভূমিশয্যা নেয়, ব্যাথায় ছটফট করতে করতে বেচারা বালিতে আছড়ে পড়লে অবোধ জটার পিঠে বাঁধা মালপত্র চারদিখে ছড়িয়ে পড়ে, উটটার বিশাল, তুলতুলে মাংসল পা বাতাসে বৃথাই আন্দোলিত হয়। আরেকটা উট, কালো পালকযুক্ত একটা তীরে এফোড়-ওফোড় হয়ে যাওয়া লম্বা গলা নিয়ে, দুলকি চালে সাগরের দিকে ছুটে যায়। প্রায় সাথে সাথেই হুমায়ুন এবং তার লোকেরা রক্ষীবাহিনীর দুর্বল সারির ভিতরে ঘোড়া নিয়ে প্রবেশ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার সময়ে দুপাশে উন্মত্তের মতো তরবারি চালাতে থাকে। কিছু গুজরাতি আক্রমণের প্রথম ধাক্কা সামলাতে না পেরে আক্ষরিক অর্থেই ভূপাতিত হয়। সামান্য যে কয়েকজন নিজেদের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে, ঘুরে দাঁড়িয়ে অপ্রত্যাশিত আক্রমণের মুখোমুখি হবার চেষ্টা করেছিল তাদের স্রেফ কচুকাটা করা হয়। বেশীরভাগই অবশ্য এতসব ঝামেলায় না গিয়ে নিজেদের ঘোড়ার গলা বরাবর ঝুঁকে নীচু হয়ে তখনও ভোলা থাকা কাম্বের প্রধান তোরণ-দ্বারের অভ্যন্তরে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছোটার জন্য জন্তুগুলোকে মিনতি করে।
হুমায়ুন আর তার দেহরক্ষীর দল তাদের পিছু ধাওয়া করে। বেশভূষায় আধিকারিকের মতো দেখতে একজনকে তার অধীনস্ত দুজন লোকের সাথে পালিয়ে যেতে দেখে হুমায়ুন যত জোরে সম্ভব ঘোড়া দাবড়ায়। ঘাড়ের উপরে হুমায়ুনের উপস্থিতি টের পেয়ে, পলায়নপর আধিকারিক ঘুরে তাকিয়ে নিজের সমূহ বিপদ বুঝতে পেরে নিজেকে বাঁচাবার জন্য নিজের পিঠের সাথে বাঁধা ঢালটা আকড়ে ধরতে চেষ্টা করে। ঢালটা সে ঠিকমতো আকড়ে ধরার আগেই, হুমায়ুনের তরবারির ধারালো ফলা বেচারার ধাতব শৃঙ্খলে নির্মিত বর্মের ঠিক উপরে লোকটার মোটা আর পেষল গলায় একটা গভীর ক্ষতস্থানের জন্ম দিলে, সে ঘোড়া থেকে আছড়ে পড়ে গিয়ে বেশ কয়েকবার গড়াগড়ি করে এবং একটা সময়ে স্থির হয়ে যায়।
চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে হুমায়ুন কাম্বের তোরণ-দ্বারের নীচে পৌঁছে যায়। উল্টে থাকা একটা টেবিল এড়াতে সে প্রাণপনে টেনে ঘোড়াটা ঘুরিয়ে নেয়, নিশ্চিতভাবেই বলে দেয়া যায় যে শুল্ক বা কর আদায়ে নিয়োজিত আধিকারিকেরা কিছুক্ষণ আগেই এখান থেকে আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে গেছে, মূল ফটকের পাশে অবস্থিত বাড়িটার পেছনে একটা ছোট চত্বরে সে শীঘ্রই এসে পৌঁছে। সেখানে বোধহয় পূর্ণোদ্যমে একটা বাজার বসেছিল। সেখানের সামনের দিকে উন্মুক্ত ছোট ছোট দোকানগুলোয় যারা ছিল বোঝাই যায় তাঁরা ব্যস্ততার সাথে সেখান থেকে চলে গিয়েছে, আতঙ্কে উজ্জ্বল বর্ণের মশলা ভর্তি ব্যাগগুলো ধূলোয় ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, মাটিতে শস্যকণা পড়ে রয়েছে সেখানে উল্টে যাওয়া একটা জালা থেকে গড়িয়ে আসা দুধ আর কমলা রঙের মসুর ডালের সাথে এখন দারুণ সখ্যতা তার। সৈন্যদের টিকিটাও কোথাও দেখা যায় না। কাফেলার রক্ষীবাহিনীর মতোই, কাম্বের প্রতিরক্ষায় যারা নিয়োজিত ছিল তাঁরা বোধহয় লড়াই করার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। গুটিকয়েক দোকানমালিক যারা পালিয়ে যেতে পারেনি। বেশীর ভাগই শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ বা প্রায় কালো পোষাকে সজ্জিত মহিলা- সবাই তাদের আক্রমণকারীদের সামনে বালিতে মুখ গুঁজে বশ্যতা প্রকাশের ভঙ্গিতে নিজেদের প্রণত করে। সৈন্যদের বসবাসের ব্যারাকটা কোথায় খুঁজে বের কর। সেখানে যদি কোনো সৈনিককে দেখতে পাও তাকে সাথে সাথে বন্দি করবে। বন্দরে অবস্থানরত জাহাজ আর গুদামঘর থেকে তোমাদের যা ইচ্ছে নিতে পার। বাকিটা পুড়িয়ে দেবে। কেবল লক্ষ্য রাখবে তোমাদের মালপত্রের ভার যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়। সূর্যাস্তের আগেই আমরা এখান থেকে চলে যাব। কাম্বে বন্দরে আমাদের হামলার খবর যখন গুজরাতিদের কানে যাবে, তারা আমাদের অবস্থান সম্পর্কে এতটাই শঙ্কিত আর অনিশ্চিত হয়ে পড়বে যে যখন তাঁরা চম্পনীর হুমকির সম্মুখীন জানতে পারবে তখন তাঁদের মূলবাহিনী কোথায় মোতায়েন করবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সেই দূর্গ আক্রমণকারী আমাদের মূলবাহিনীর সাথে পুনরায় মিলিত হবার জন্য আমাদের দ্রুত এখান থেকে ফিরে যেতে হবে। আমরা সেখানেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করবো যার ফলে গুজরাত আমাদের করায়ত্ত হবে।
১.৩ লুট করা সমৃদ্ধি
০৩. লুট করা সমৃদ্ধি
জওহর, আমার জন্য লেবুর রস দেয়া সেই পানিটা নিয়ে এসো- হিন্দুরা এটাকে কি বলে? লিম্বু পানি? এই গরমে সেটা বেশ সতেজ করে তুলে। হুমায়ুন চম্পনীর দূর্গের বাইরে তাঁর সুরক্ষিত সৈন্য শিবিরের ঠিক মাঝে তার লাল রঙের বিশাল তাবুতে দাঁড়িয়ে যেখান থেকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাবুর গুটিয়ে রাখা নিম্নপ্রান্তের ভিতর দিয়ে, সে দুই-মাইল-দীর্ঘ পাথুরে শিলাস্তরের এক প্রান্তে দূৰ্গটার পাথরের তৈরী অতিকায় অবয়ব দেখতে পায় যা জঙ্গলের করকটে গাছগাছালির মাথার উপরে ভেসে রয়েছে গ্রীষ্মের দাবদাহে সবগুলো গাছের পাতা শুকিয়ে বাদামী আর সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে।
আজ থেকে ছয় সপ্তাহ পূর্বে হুমায়ুন অবরোধ-যজ্ঞে এসে শামিল হয়েছে। নিজের পরিষদমণ্ডলীর সাথে সে প্রথমে যেমন আলোচনা করেছিল, তার আধিকারিকেরা নিজেদের অবস্থান অবরোধক আর উভয়পার্শ্বে কামান স্থাপন করে সুরক্ষিত করেছে যাতে করে তারা অবরুদ্ধদের দ্বারা অবরোধকারীদের উপরে পরিচালিত যে কোনো আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে আর সেই সাথে অবরুদ্ধদের স্বস্তি দিতে আগত বাহিনীকে সাফল্যের সাথে প্রতিহত করতে পারবে তারা এই বাহিনীর আগমনের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত। সেই বাহিনী এখনও এসে পৌঁছায়নি আর গুপ্তদূতেরা তাঁদের আগমনের কোনো লক্ষণ এখনও পর্যন্ত বিবরণীতে উল্লেখ করেনি। শোনা যায় যে বাহাদুর শাহ তাঁর ভূখণ্ডের দক্ষিণের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত উচ্চভূমিতে অবস্থান করছেন। তিনি সম্ভবত দূর্গের শক্তিমত্তায় বিশ্বাস করেন, এবং এখানে অবস্থিত সৈন্যদের ব্যারাক হুমায়ুন আর তাঁর দলবলকে বিদায় জানাবার জন্য যথেষ্ট।
