হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, কামরান কি বোঝাতে চাইছে সে তাঁকে যে শাস্তি দেবে সেটা সে মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত? সে প্রহরীদের ইঙ্গিতে চাবুকটা যেখানে রয়েছে সেখানেই রাখতে বলে নিজেই তাঁর সৎ-ভাইয়ের দিকে এগিয়ে যায়। সে কামরানের কাছাকাছি পৌঁছালে লক্ষ্য করে যে কামরানের মাথার চুল উস্কখুস্ক এবং চোখের নীচের কালিতে চরম পরিশ্রান্তির ছাপ ফুটে রয়েছে, কিন্তু তার সবুজ চোখের দৃষ্টি সরাসরি হুমায়ুনের দিকে নিবদ্ধ এবং সেখানে আনুগত্য কিংবা অনুতাপের ছায়া নেই কেবলই ঔদ্ধত্য আর তাচ্ছিল্যের চোরাস্রোত। তাঁর ঠোঁটের কোণে এমনকি উৎসিক্ত হাসির একটা আবছা ছায়া যেন খেলা করে।
সে কিভাবে আমার সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের সাহস করে? সে যা কিছু করেছে তারপরেও কিভাবে সে এতোটুকুও অনুতপ্ত না হয়ে থাকতে পারে? হুমায়ুন ভাবে, এতোগুলো বছর আমরা পরস্পরের সাথে যুদ্ধ না করলে এতোদিনে হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধার করতে পারতাম, তার কারণে এতো প্রাণহানি ঘটেছে এতোকিছুর পরেও কিভাবে সামান্যতম অনুশোচনাবোধ তার মাঝে কাজ করে না? হুমায়ুন একদৃষ্টিতে তাঁর সৎ-ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে, তাবুতে আকবরকে ছিনিয়ে নেয়ার সময় কামরান যখন ধাক্কা দিয়ে হামিদাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল তার সেই ছবিটা তার মানসপটে অনাদিষ্টভাবে ফুটে উঠে, এরপরেই সে দেখে কামানের অবিশ্রান্ত গর্জনের মাঝে কাবুলের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উপরে অরক্ষিত অসহায় আকবরকে প্রদর্শিত করা হচ্ছে। তার মাঝে সহসা আবেগের একটা আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয় এবং সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সে তার গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে কামরানের মুখে একটা ঘুষি বসিয়ে দেয়। কামরানের একটা দাঁত ভেঙে যায়, ঠোঁট দ্বিখণ্ডিত করে দিয়ে সে চেঁচিয়ে উঠে বলে, হামিদাকে অসম্মান করার জন্য এটা। সে আবারও চিৎকার করে উঠে, তার দুই চোখ অক্ষিকোটরে ধকধক করে, আর আকবরকে অপহরণের কারণে এটা! হুমায়ুন এরপরে দুহাতে কামরানের গলা টিপে ধরলে, সে মাটিতে শুয়ে পড়ে সেখানেই প্রাণপণে নিজের কুঁচকি চেপে ধরে দেহটা দুভাঁজ করে ফেলে এবং মুখ থেকে রক্ত মিশ্রিত ভাঙা দাঁতের টুকরো থু করে ফেলে কিন্তু একটা শব্দও উচ্চারণ করে না, এমনকি একটা আর্তনাদও শোনা যায় না।
হুমায়ুন ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে এবার পা তুলে, নিজের ধূর্ত আর অবাধ্য সৎ-ভাইয়ের পেটে সপাটে লাথি মারবে বলে, তখনই তার পেছন থেকে আতঙ্কিত কান্নার একটা শব্দ ভেসে আসলে সে নিজেকে সংবরণ করে। সে কাঁধ ঘুরিয়ে তাকিয়ে ভগ্নস্বাস্থ্য বৃদ্ধ কাশিমকে দুহাতে হাতির দাঁতের হাতলযুক্ত দুটো ছড়িতে ভর দিয়ে, যার উপরে সে অনেকদিন ধরেই নির্ভরশীল, পা টেনে টেনে তাঁর পক্ষে যত দ্রুত সম্ভব তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে।
সুলতান, একটু সুস্থির হোন। তাকে যদি হত্যা করতেই হয় তাহলে তৈমুরের উত্তরপুরুষের পক্ষে উপযুক্ত সম্মানের সাথেই তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার ব্যবস্থা করেন। আপনার মরহুম আব্বাজান কি মনে করবেন?
তার কথাগুলো শুনে হুমায়ুনের মনে হয় কেউ যেন এক বালতি ঠাণ্ডা পানি তার উপরে ঢেলে দিয়েছে, তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হয়। সে নিজের ভূপাতিত সৎ-ভাইয়ের কাছ থেকে দুরে সরে আসে। কামরান, আমি আত্মবিস্মৃত হয়েছিলাম। আমি অবিবেচকের ন্যায় নিজেকে তোমার স্তরে নামিয়ে এনেছিলাম। আমি তোমার ভাগ্য সম্বন্ধে পরে সিদ্ধান্ত নেব এবং সেটা কেবল আমার ক্রোধ প্রশমিত হবার পরেই হবে। প্রহরী! তাঁকে দাঁড় করাও। তাঁকে তাঁর কুঠরিতেই আবার নিয়ে যাও, কিন্তু সাবধান কেউ যেন তাঁর সাথে খারাপ আচরণ না করে।
হুমায়ুন সন্তুষ্টির সাথে দরবার কক্ষে সমবেত লোকদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুগন্ধি তেলের দিয়ায় জ্বলতে থাকা সলতে আর শত শত মোমবাতির আলোয় মোগলদের ঐতিহ্যবাহী সবুজ ঝালর ঝলমল করে। আজ সত্যিকার একটা বিজয় উদযাপন করতে তারা সমবেত হয়েছে। একজন মোগল শাসক হিসাবে তাঁর যোদ্ধাদের যেভাবে পুরস্কৃত করা উচিত বহুদিন হয়ে গিয়েছে। আসলে বলা উচিত বছর- সে সেভাবে করতে পারেনি। কাবুলের কোষাগার আর অস্ত্রাগার থেকে যথেষ্ট পরিমাণ কারুকার্যখচিত তরবারি আর খঞ্জর, ধাতব শিকলের তৈরী বর্ম, নিখুঁতভাবে আচ্ছাদিত, কলাই করা আর রত্ন শোভিত পানপাত্র এবং স্বর্ণ আর রৌপ্য মুদ্রা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যদিও তার আব্বাজানের আমলে এর পরিমাণ আরো বেশী ছিল- সে এবার তাঁর প্রত্যেক সেনাপতি, আধিকারিক আর অনুগত লোকদের পুরস্কৃত করতে পারবে। কামরান যে কাবুলের ঐশ্বর্যের ব্যাপারে এমন বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে হুমায়ুন কল্পনাও করেনি।
তার সেনাপতি আর আধিকারিকেরা এই মুহূর্তে পানাহারে ব্যস্ত- মাখন দিয়ে রোস্ট করা ভেড়ার বাচ্চা আর মুরগীর রসাল, মিষ্টি মাংস, আস্ত কোয়েল আর লম্বা লেজবিশিষ্ট ফিজ্যান্ট শুকনো ফলের ঝোলে মাখান, তাঁদের লেজের পালক এখনও রয়েছে তবে সেটার রঙ এখন সোনালী, এবং সুগন্ধি চাপাতি ইটের উপরে সেঁকার কারণে এখনও গরম আছে। এই বিলাসবহুল প্রাচুর্য- খাদ্য পরিবেশনের জন্য ব্যবহৃত অপরূপ বারকোশগুলো- এতোগুলো বছর বিপদ আর কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা আর শঠতার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করার পরে কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। জাহিদ বেগ আর আহমেদ খানের রণক্ষেত্রের ক্ষতচিহ্নে জর্জরিত মুখাবয়ব আর কাশিম আর সারাফের বলিরেখা পূর্ণ মুখের দিকে, যারা তাঁকে অনুসরণ করে নিদাঘতপ্ত মরুভূমি আর তুষারাবৃত পর্বত অতিক্রম করেছে। যেখানে শীত এত প্রবল যে মনে হয় মানুষের হৃৎপিণ্ড থামিয়ে দিতে পারবে, হুমায়ুনের চোখ সত্যিকারের আন্তরিকতার নিয়ে তাকায়। তার সঙ্গের যোদ্ধার সংখ্যা যখন শদুয়েকে নেমে এসেছিল এবং আজ রাতে এখানে উপস্থিত কোনো গোত্রপতির সাথে এত কম সৈন্য থাকে- এইসব বিশ্বস্ত লোকগুলো তাঁর সঙ্গ পরিত্যাগ করেনি।
