কাছে এসো, হুমায়ুন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে।
হুমায়ুনের কাছ থেকে লোকটা যখন দশ গজ দূরে, সে প্রথাগত অভিবাদনের ভঙ্গি কুর্ণিশের রীতিতে মাটিতে পুরোপুরি আনত হয়। তারপরে সে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্য পেশ করে। মহামান্য সুলতান। আমি খুবই সংক্ষিপ্ত একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। কাবুলের দূর্গপ্রাসাদ আপনার আগমনের জন্য প্রতীক্ষা করছে।
একটা তীব্র আনন্দের অনুভূতি হুমায়ুনকে একেবারে আপ্লুত করে ফেলে। একই সাথে একটা চিন্তাও তার মনের কোণে উঁকি দেয়। সে অন্য কোনকিছু করার আগে পাহাড়ের উপর থেকে কাবুল দেখা যায় এমন স্থানে তার মরহুম আব্বাজানের গড়ে তোলা উদ্যানে সে যাবে- যেখানে রোদ, বৃষ্টি, তুষারপাত আর বায়ুপ্রবাহের মাঝে বাবরের সমাধিস্থল উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেখানে, মার্বেলের পাটাতনের পাশে হাঁটু ভেঙে বসে সে নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। বাবর যা করেছিলেন ঠিক সেভাবেই সে কাবুলকে ব্যবহার করবে তার হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধারের সূচনাস্থল হিসাবে।
*
ঝকঝকে নীলাকাশের নীচে হুমায়ুন যখন বাছাই করা লোকদের একটা দলের একেবারে অগ্রভাগে অবস্থান করে, তূর্যনিনাদের মাঝে অগ্রসর হতে শুরু করে, যেখানে তাঁর কাবুল অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকল গোত্রের প্রতিনিধি রয়েছে, উপরের দূর্গপ্রাসাদের দিকে অগ্রসর হবার সময়ে প্রথমে সে তার মোতায়েন করা কামানগুলোকে অতিক্রম করে, তারপরে সেই স্থান যেখান থেকে সে দূর্গপ্রাকারের ছাদে শিশু আকবরকে মানব বর্ম হিসাবে প্রদর্শিত হতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পরেছিল, সবশেষে পিঠে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে অস্থিচর্মসার ষাড়ের দল যে উঁচু তোরণদ্বারের নীচে দিয়ে ধেয়ে এসেছিল সেটা অতিক্রম করে সে দূর্গপ্রাসাদের অভ্যন্তরে সূর্যালোকিত আঙ্গিনায় এসে উপস্থিত হয়। সে যখন তাঁর বিশাল কালো ঘোড়াটার পিঠ থেকে নীচে নামছে তখন পারস্য ত্যাগ করে আসবার পর থেকে সে যা অর্জন করেছে সেজন্য দারুণ একটা গর্ববোধ তাঁকে জারিত করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্য, সে আকবরকে উদ্ধার করেছে, কিন্তু সেই সাথে সে কামরান আর আসকারির উপরে পুনরায় নিজের কর্তৃত্ব অর্জন করেছে এবং কাবুলের সালতানাত পুনরায় করায়ত্ত করেছে।
বৈরাম খান, নাদিম খাজা এবং তার পেছনে অনুসরণরত অন্যান্য সেনাপতিরা নিজেদের উল্লাস চেপে রাখবার কোনো চেষ্টাই করে না, তার রাস্তার দুপাশে সমবেত শহরবাসীর উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে এবং নিজেদের এই কষ্টার্জিত বিজয় উপভোগ করে। কিন্তু হুমায়ুনের মনের ভিতরে এই আনন্দের মাঝেও বিষণ্ণ সব চিন্তা উঁকি দেয়। গতরাতে আব্বাজানের কবরের পাশে হাঁটু ভেঙে বসে সে শপথ করেছে আর কখনও সাম্রাজ্যহীন সম্রাটের ভাগ্য সে বরণ করবে না। বাবরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরো একবার হিন্দুস্তান দখল করার পূর্বে, সে কাবুল এবং এই রাজ্যের পুরো এলাকায় তার শাসনকে অনাক্রম্য করে তুলবে। সে পাশ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের প্রতিটা জমিদার, যারা তাঁর অনুগত হিসাবে শাসনকার্য পরিচালনা করে তাদের বাধ্য করবে তার অধিরাজত্বের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রদর্শন করতে। এইসব জমিদারদের অনেকেই কামরানকে সমর্থণ করেছিল এবং বাবরের সাথে হিন্দুস্তান অভিযানে যখন হুমায়ুন তার সঙ্গী হয় তখন সদ্যযুবা কামরান কাবুলে অবস্থান করে, সেই সময় থেকেই জমিদারদের অনেকের সাথে তার বন্ধুত্ব আর মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এদের বিষয়ে অনেক সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শক্তির দম্ভ দেখিয়ে সাময়িকভাবে হয়ত তাদের আনুগত্য অর্জন করা সম্ভব কিন্তু সে যখন হিন্দুস্তান অভিযানে রওয়ানা হবে তখন কি হবে? তারা তখন নিশ্চিতভাবেই বিদ্রোহ করবে।
প্রথমে, অবশ্য তাঁকে তাঁর সৎ-ভাইয়ের ব্যাপারটার একটা ফয়সালা করতে হবে যাকে সে দুই বছর আগে শেষবারের মতো সামনা সামনি দেখেছিল যখন এক তুষারঝড়ের রাতে নিজের তাবুতে ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজের গলায় তার খঞ্জরের ফলা দেখতে পেয়েছিল। কামরান কোথায়? সে জওহরের কাছে জানতে চায়, যে বরাবরের মতোই এখনও তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আমাকে বলা হয়েছে দূর্গপ্রাসাদের নীচে ভূগর্ভস্থ কুঠরিতে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
তাকে এখনই এই প্রাঙ্গণে আমার সামনে নিয়ে এসো।
জ্বী, সুলতান।
কয়েক মিনিট পরে, হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে একটা নীচু দরজা দিয়ে, যার পেছনের সিঁড়ি নীচের ভূগর্ভস্থ কামরার দিকে নেমে গিয়েছে, কামরান বের হয়ে আসছে, সহসা সূর্যালোকসম্পাতের কারণে সে চোখ পিটপিট করছে। তার দুই পায়ে ভারী শিকলের বোঝা এবং দুজন সশস্ত্র প্রহরী তাঁকে অনুসরণ করছে। অবশ্য, তার দুই হাত ভোলাই রয়েছে এবং শহরে প্রবেশের আনুষ্ঠানিকতা শেষে হুমায়ুনের সেনাপতিদের ঘোড়াগুলোকে আস্তাবলে ফিরিয়ে নিতে ব্যস্ত তিনজন সহিসকে অতিক্রম করার সময়, সে সহসা তাঁদের একজনের কাছ থেকে অশ্বচালনায় ব্যবহৃত একটা লম্বা চাবুক ছিনিয়ে নেয়। তাঁকে অনুসরণরত প্রহরীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই ছিঁচকে অপরাধীদের কড়িকাঠে ঝুলিয়ে চাবকানোর জন্য নিয়ে যাবার সময় যেমন তাদের গলায় চাবুকটা ঝুলিয়ে রাখা হয় ঠিক সেভাবে সে চাবুকটা নিজের গলায় ঝুলিয়ে দেয়।
