আতঙ্কিত জম্ভগুলো জীবন্ত মশালের ন্যায় সামনের দিকে ছুটতে থাকে। গোলন্দাজদের তাবু কিংবা তাঁদের বারুদের মজুদ জ্বালিয়ে দেয়ার আগেই জন্তুগুলোকে তীর মেরে ধরাশায়ী করো, হুমায়ুন চিৎকার করে বলে।
শীঘ্রই এগারটা ষাড়কে নীচের দিকে নেমে আসা ঢালু পথের উপরে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তাদের মৃতদেহ থেকে অগণিত তীরযষ্টি বের হয়ে আছে। কেবল একটা ষাড় ব্যাথায় উন্মত্ত হয়ে হুমায়ুনের অবস্থানের দিকে ধেয়ে আসে এবং কোনো ধরনের মারাত্মক ক্ষতি করার আগেই অবশ্য তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়। অবশ্য, হুমায়ুনের তিনজন তীরন্দাজ ষাড়গুলোকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ার সময় যখন নিজেদের নিরাপত্তা আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছিল, তখন দূর্গপ্রাসাদের ছাদ থেকে তাদের লক্ষ্য করে ছোঁড়া গুলির আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়।
পাল্টা আক্রমণের এই প্রয়াসে হুমায়ুনের মনে প্রত্যয় জন্মায় যে সে যেমনটা ভয় করেছিল সেটাকে সত্যি করে কামরান পালিয়ে যায়নি বরং সে দূর্গপ্রাসাদেই অবস্থান করছে কারণ এমন বুদ্ধি কেবল তার সৎ-ভাইয়ের মাথা থেকেই বের হওয়া সম্ভব। তাঁর চরিত্রের সাথে বিষয়টা দারুণভাবে মিলে যায়। তারা যখন উঠতি কিশোর তখন কামরান খেলা বা অন্য কোনো বিষয়ে পরাজিত হওয়াটা মেনে নিতে পারতো না, হেরে গেলেই বাচ্চাছেলেদের মতো জীহ্বা বের করে হুমায়ুনকে ভেংচি কাতো আর মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে আস্ফালন করতো এবং তারা যখন যুবক তখন এসব কিছুর সাথে যোগ হয় উচ্চকণ্ঠে অপরের উপর দোষ চাপান আর তাদের পরবর্তী মোকাবেলায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে বলে নিজেকেই প্রবোধ দেয়া। সেই সময়ে, হুমায়ুন হেসে কামরানকে আর তার এসব আচরণকে উপেক্ষা করতে যা তাঁর সৎ-ভাইয়ের ক্রোধ আরও বাড়িয়ে দিত। সে এখন অবশ্য কামরান আর তাঁর চেয়েও যেটা এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কামরানের সঙ্গীসাথীদের, মনোবল পরখ করতে বদ্ধপরিকর। নিবিষ্ট মনে কয়েক মিনিট চিন্তা করে, হুমায়ুন কামরানের উদ্দেশ্যে একটা চিঠির মুসাবিদা শুরু করে তারপরে জওহরকে ডেকে পাঠায়।
আমি চাই দূর্গপ্রাসাদে গিয়ে তুমি নিজে আমার ভাইকে এই চরমপত্রটা পৌঁছে দেবে। আমি এটা তোমাকে পড়ে শোনাব, যাতে করে তোমার জানা থাকে তুমি কি বার্তা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। খুবই সংক্ষিপ্ত একটা বার্তা আর এর বক্তব্যও চাচাছোলা। আমাদের ভগিনী গুলবদন চেষ্টা করেছিল দায়িত্ববোধ আর পারিবারিক সম্মানের প্রতি তোমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে। তুমি তাতে কর্ণপাত করনি। তুমি এর বদলে একটা শিশুর জীবনকে তোমার আপন ভাস্তে, তাকে ঝুঁকির মধ্যে আপতিত করে নিজের কপালে চুড়ান্ত কলঙ্কের কালিমা লেপন করেছে। আমার হাতে শহর কাবুলের পতন হয়েছে, সেইসাথে তোমার নিজের ভবিষ্যতও নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে, তোমার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সহানুভূতি অবশিষ্ট নেই কিন্তু তোমার অনুসারীদের কথা বিবেচনা করে আমি তোমাকে এই একটা সুযোগ দিচ্ছি। দূর্গপ্রাসাদ আমার হাতে সমর্পণ কর এবং আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে তোমার লোকদের জীবন বখশ দেব। তোমার বিষয়ে অবশ্য আমি সিদ্ধান্ত নেব আর আমি তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না। তুমি যদি এরপরেও আত্মসমর্পণ না কর, তাহলে আমি আমার সর্বশক্তি তোমার বিরুদ্ধে নিয়োজিত করবো। আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যত সময়ই প্রয়োজন হোক, আমার লোকেরা তোমার দূর্গপ্রাসাদের প্রাচীর গুঁড়িয়েই তবে থামবে এবং একবার ভেতরে প্রবেশ করতে পারলে দূর্গপ্রাসাদের সবাইকে কোনো ধরনের সহানুভূতি না দেখিয়ে হত্যা করা হবে। তোমার অভিপ্রায় আমাকে জানাবার জন্য আজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত তুমি সময় পাবে। তোমার উত্তর যদি না হয়, আমি আমার তীরন্দাজদের নির্দেশ দেব রাতের আঁধারে তোমার প্রতিরক্ষা প্রাচীরের অভ্যন্তরে এই একই বার্তা সম্বলিত তীর ছুঁড়তে, যাতে করে তোমার অনুসারীরা বুঝতে পারে তোমার কাছে তাঁদের জীবন কতটা মূল্যহীন।
বস্তুতপক্ষে, জওহর দূর্গপ্রাসাদে চরমপত্রটা পৌঁছে দিয়ে আসবার পরে একঘন্টাও অতিক্রান্ত হয়নি এবং সূর্য তখনও দিগন্তের এক বর্শা উপরে অবস্থান করছে যখন, হুমায়ুন তার অস্থায়ী সেনাছাউনির সীমানার কাছে দাঁড়িয়ে আহমেদ খানের সাথে অন্য একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময়, সে নিঃসঙ্গ এক অশ্বারোহীকে দূর্গপ্রাসাদ থেকে নীচের দিকে খাড়া হয়ে নেমে আসা ঢালু পথটা দিয়ে ধীরে ধীরে নামতে দেখে এবং তারপরে সমভূমির উপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসতে আরম্ভ করে। নিঃসঙ্গ অশ্বারোহী আরেকটু নিকটবর্তী হতে হুমায়ুন লক্ষ্য করে তাঁর বর্শার অগ্রভাগে যুদ্ধবিরতির নিশান উড়ছে। অপেক্ষা করার সময় হুমায়ুনের কাছে মনে হয় ঘড়ির কাঁটা বুঝি অসম্ভব ধীরে অগ্রসর হচ্ছে কিন্তু অবশেষে আগন্তুক অশ্বারোহী তাঁর কাছ থেকে কয়েকগজ দূরে এসে উপস্থিত হয়- এক তরুণ যোদ্ধা, ধাতব শিকলের তৈরী বর্ম পরিহিত, মাথার শিয়োস্ত্রাণে ঈগলের পালকশোভিত এবং চোখে মুখে গম্ভীর একটা অভিব্যক্তি। সে তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে, মাটিতে নেমে দাঁড়ায় এবং সে যে নিরস্ত্র সেটা বোঝাতে দুহাত দেহের দুপাশে তুলে ধরে।
