পুরোপুরি আত্মসমর্পণ ভিন্ন আর কোনো কিছুতেই আমি সন্তুষ্ট হব না।
আপনি ঠিক এই কথাটাই বলবেন, আমি শহরের লোকদের সেটা আগেই বলেছি। সুলতান, আপনি কি আমাকে চিনতে পারেননি…
লোকটার সূর্যের আলোয় শুকিয়ে যাওয়া আখরোটের মতো কুচকানো মুখাবয়বের দিকে হুমায়ুন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কেমন যেন চেনা মনে হয় মুখটা।
আমি ইউসুফ, আপনার মরহুম আব্বাজানের একসময়ের কোষাধক্ষ্য ওয়ালি গুলের সবচেয়ে বয়োজ্যষ্ঠ ভ্রাতুস্পুত্র। আপনাকে এবং আপনার সৎ-ভাই কামরানকে আমি একেবারে ছোটকালে দেখেছি… এটা সত্যিই দুঃখজনক যে আপনাদের দুজনের ভিতরে সম্পর্কের এতোখানি অবনতি হয়েছে… যুবরাজদের উচ্চাশার কারণে সাধারণ লোকদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে এটাও ঠিক মেনে নেয়া কঠিন। আমি সবসময়েই বিশ্বাস করেছি যে আপনি সম্রাট বাবরের সবচেয়ে প্রিয়পুত্র- কাবুলের ন্যায়সঙ্গত অধিপতি। কিন্তু মানুষের মনোভাব পরিবর্তনশীল এবং আজকাল সম্মানের চেয়ে নিজের স্বার্থই বোধহয় তাঁদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কামরান আপনাকে পরাজিত করতে পারবে বলে তারা যখন বিশ্বাস করেছিল, তারা তখন তার প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রদর্শন করেছিল।
শহরের নাগরিকদের এই জন্যই আমার কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পন করতে হবে। আপনি এখন ফিরে যান এবং তাঁদের বলেন যে, যদি প্রতিটা লোক শহরের সাধারণ লোকদের সাথে সাথে সেনাছাউনির সৈন্য সবাই- যদি অস্ত্র সমর্পন করে আমি তাঁদের জান বখশ দেব। আমি চাই কামান থেকে শুরু করে সব যুদ্ধাস্ত্র এবং গাদাবন্দুক থেকে শুরু করে তরবারি আর তীরধনুক সবকিছু নিয়ে এসে শহরের প্রধান তোরণদ্বারের বাইরে স্তূপ করে রাখা হোক। শহরের লোকেরা মহামারীর প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত শহর ত্যাগ করতে পারবে না। আমি আমার নিজের লোকদের বিপদে ফেলতে চাই না। কিন্তু আমি আমার হেকিমকে পাঠাবো আর সেই সাথে বিশুদ্ধ পানীয় জল আর টাটকা খাবার… তাদের জবাব কি হতে পারে?
ইউসুফের গাঢ় বাদামী চোখ প্রায় অশ্রু সজল হয়ে উঠে। সুলতান, আপনার এই করুণা প্রদর্শনের জন্য তাঁরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে।
ইউসুফ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় এবং তার হাতের লাঠির উপরে পুরোপুরি ভর দিয়ে সে যে গরুর গাড়িতে করে এখানে এসেছে, সেদিকে এগিয়ে যায় আর তাতে উঠে বসে। অচিরেই দেখা যায় গাড়িটা তাকে নিয়ে ফিরতি পথে শহরের দিকে ফিরে চলেছে এবং তাকে গ্রহণ করার জন্য প্রধান তোরণদ্বারে পাল্লা দুটো খুলে দেয়া হয়। হুমায়ুন তার তাবুর সামনে পায়চারি করতে করতে ভাবে তাঁর বেধে দেয়া শর্তের প্রত্যুত্তরে পাল্লা দুটো কি এত সহজেই তার সামনে খুলে যাবে, নিজের ভাবনায় সে এতোই বিভোর ছিল যে দুপুরের খাবারের জন্য জওহর তাঁকে ডাকতে আসলে উত্তর দেবার কথা তার খেয়াল থাকে না। এক ঘন্টা অতিক্রান্ত হয় এবং তারপরে আরও এক ঘন্টা। তারপরে শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের ভেতর থেকে একটা শোরগোলের শব্দ ভেসে আসে, প্রথমে খুবই ক্ষীণ কিন্তু অচিরেই সেটা জোরাল হতে আরম্ভ করে… সহস্র কণ্ঠের উল্লসিত আওয়াজ। এর একটাই অর্থ হতে পারে যে শহরের অধিবাসীরা আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পলকের ভিতরে, তোরণদ্বারের পাল্লাগুলো হা করে খুলে দেয়া হয় এবং ভেতর থেকে বেশ কয়েকটা গরুর গাড়ি দ্রুত গতিতে বাইরে বের হয়ে আসে। শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর আর শহরের চারপাশে চক্রব্যুহ তৈরী করে অবস্থানরত হুমায়ুনের সৈন্যদের মধ্যবর্তী ভূমির মাঝামাঝি স্থানে তারা যখন পৌঁছায়, সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে এবং গাড়ির সারথি আর তার পেছনে বসে থাকা লোকেরা গাড়ির পেছনে থাকা মালামাল কোনো ধরনের ভণিতা না করে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র, ধনুক আর গাদাবন্দুকগুলো সূর্যের আলোয় চকচক করে ছুঁড়ে ফেলতে শুরু করলে মাটিতে একটা স্তূপের সৃষ্টি হয়।
হুমায়ুন হাসে। আত্মসমর্পনের শর্ত নির্ধারণে তাঁর কোনো ধরনের ভুল হয়নি। শহরটা এখন তার কিন্তু আসল কাজ এখনও কিছুই হয়নি। দৃর্গপ্রাসাদে এখনও বহাল তবিয়তে কামরানের অনুগত সৈন্যরা অবস্থান করছে। হুমায়ুন ভালো করেই জানে যে তার সৎ-ভাই যদি এখনও সেখানে অবস্থান করে থাকে, তাহলে শহরের আত্মসমর্পনের এই দৃশ্য সেও দেখছে। এখন তাঁর প্রতিক্রিয়া কি হবে?
উত্তরটা জানতে খুব বেশী সময় অপেক্ষা করতে হয় না। দূর্গপ্রাসাদের প্রাকারবেষ্টিত ছাদ থেকে কামরানের অনুগত সৈন্যরা হুমায়ুনের কামানের অবস্থান লক্ষ্য করে এক ঝাঁক তীর নিক্ষেপ করে। তারা সেই সাথে দূর্গ প্রাচীরের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে স্থাপিত ক্ষুদ্রাকৃতি কামান থেকে গোলা বর্ষণও করে। তারপরে হুমায়ুন দূর্গপ্রাসাদের প্রধান তোরণদ্বারের উপরে স্থাপিত নহবতখানা থেকে ঢাকের গমগমে শব্দ আর সেই সাথে তূর্যবাদন শুনতে পায় এবং তাকিয়ে দেখে তোরণদ্বারের পাল্লা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। কামরান কি তাহলে আত্মসমর্পন করবে বলে মনস্থির করেছে? না। সহসা হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে দূর্গে অবস্থানরত সৈন্যরা বাতাসে লম্বা চাবুক আন্দোলিত করে ডজনখানেক অস্থিচর্মসার ষাড় তাড়িয়ে নিয়ে এসে পশুগুলোকে তোরণদ্বার দিয়ে বের করে এবং দূর্গ থেকে নেমে আসা ঢালু পথ দিয়ে হুমায়ুনের অবস্থানের দিকে তাদের দাবড়ে দেয়, জম্ভগুলোর পিঠে শুকনো খড়ের আটি বেঁধে দিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে।
