আমাকে বার্তাটা দেখাও।
জাভেদ ঝুঁকে নীচু হয়ে তার পায়ের নাগরার ভিতর থেকে বহুবার ভাঁজ করা হয়েছে এমন একটা কাগজের টুকরো বের করে সেটা হুমায়ুনের হাতে তুলে দেয়। হুমায়ুন কাগজের ভাঁজ খুলে এবং বাজে হস্তাক্ষরে তুর্কী ভাষায় লেখা ঘন পংক্তিগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। জাভেদ যা বলেছে সবই চিঠিটা নিশ্চিত করে। শেষ বাক্যগুলো অনেকটা এমন: আগাম কোনো পূর্বাভাষ না দিয়েই রোগটার প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং তরুন আর স্বাস্থ্যবানরাও এর প্রকোপ থেকে রেহাই পায়নি। প্রথমে শুরু হয় প্রচণ্ড জ্বর আর সেই সাথে বমি, তারপরে নিয়ন্ত্রণের অতীত উদারাময়, শেষে চিত্তবৈকল্য আর মৃত্যু। প্রতিদিনই দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকা মৃতদেহের স্তূপ বেড়েই চলেছে। আমরা এমন একটা ফাঁদে আটকা পড়েছি যাঁর কবল থেকে কারও রেহাই নেই। আমাদের দেহে শক্তি থাকা অবস্থায় সেনাছাউনির সৈন্যদের হত্যা করে তোরণদ্বার খুলে দেবার বিষয়ে আমরা সবসময়েই আলোচনা করছি কিন্তু আমাদের সম্ভবত সেটা করার প্রয়োজন পড়বে না। সৈন্যরাও মরতে শুরু করেছে। তারাও ভালো করেই জানে যে হয় অবরোধ তুলে নিতে হবে কিংবা আল্লাহতালা আমাদের প্রতি তাঁর করুণা প্রদর্শন করবেন অন্যথায় আরো অনেকেই মারা যাবে। কিন্তু আল্লাহতালা আমাদের উপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। তাঁকে ক্রোধান্বিত করার মতো কি এমন কাজ আমরা করেছি? ভাই আমার, আমি আশা করি এই বার্তা তোমার কাছে পৌঁছাবে কারণ আমাদের হয়ত আর দেখা হবে না।
শব্দগুলোর মর্মার্থ হুমায়ুন যখন পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে তখন তার নাড়ীর স্পন্দন দ্রুততর হয়। সে যে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল সম্ভবত এটাই সেটা কিন্তু তারপরেও জাভেদকে বিশ্বাস করাটা কি ঠিক হবে? সে হয়ত কামরানের একজন অনুচর। হুমায়ুন তার কণ্ঠস্বর শীতল আর সংযত রাখে। তুমি দেখছি তোমার ভাইয়ের সুস্বাস্থ্যের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত লাভের প্রতি বেশী আগ্রহী, যাই হোক তোমার এই তথ্য সত্যি হলে তুমি এজন্য পুরস্কৃত হবে। কিন্তু এটা যদি মিথ্যা হয় তাহলে আমি তোমার মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিচ্ছি। হুমায়ুন তাঁর দেহরক্ষীদের দিকে ঘুরে তাকায়। একে চোখে চোখে রাখবে।
জাভেদকে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হুমায়ুন তার ঘোড়ার পাঁজরে একটা গুতো দিয়ে অস্থায়ী শিবিরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত নিয়ন্ত্রক তাবুর দিকে অগ্রসর হয়, তার মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠেছে। বার্তাটায় যা বলা হয়েছে তা যদি আদতেই সত্যি হয়ে থাকে তাহলে কাবুল অচিরেই তাঁর পদানত হবে, কিন্তু তার আগে তাকে জানতে হবে কিভাবে তথ্যটা থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা লাভ করা সম্ভব।
*
সুলতান, কাবুলের অধিবাসীরা একজন প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আধ ঘন্টা আগে, শহরের মূল তোরণদ্বার খুলে যায় এবং একটা গরুর গাড়ি একজন বৃদ্ধলোককে নিয়ে আমাদের শিবিরের দিকে হেলতে দুলতে এগিয়ে আসতে থাকে। সে আমাদের সাথে কথা বলতে আগ্রহী এটা বোঝাবার জন্য সে ছেঁড়া একটা কাপড়ের টুকরো আন্দোলিত করছিল।
ব্যাপারটা ঘটতে তাহলে মাত্র তিনদিন সময় লাগল। জাভেদের কাছ থেকে শহরের পরিস্থিতি সম্পর্কিত সমাচার লাভের সাথে সাথে হুমায়ুন শহরের চারপাশে ফাঁসের ন্যায় মোতায়েন করা সৈন্যের ব্যুহ আরো জোরদার করে। দূর্গপ্রাসাদে আক্রমণের জন্য নিয়োজিত কয়েকটা কামানও সে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে এবং, নিরাপত্তার জন্য সেগুলোকে তড়িঘড়ি করে তৈরী করা নিরাপত্তা আড়ালের পিছনে স্থাপন করে, তার গোলন্দাজদের আদেশ দেয় শহরের অধিবাসীদের আর সেনাছাউনির সৈন্যদের মনোবল দূর্বল করতে শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করতে। প্রথমদিন হত্যোদম ভঙ্গিতে কয়েকদফা পাল্টা গোলাবর্ষণ ছাড়া দূর্গপ্রাকারের ছাদের কামানগুলো নিরবই থাকে এবং শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উপরে রক্ষীসেনাদের উপস্থিতি তারচেয়েও কম চোখে পড়ে।
প্রতিনিধি লোকটাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
হুমায়ুন তার তাবুর বাইরে যখন অপেক্ষা করছে, সে মুখের উপরে সদ্য আগত বসন্তের সকালের সূর্যের ওম উপভোগ করে। চমৎকার একটা অনুভূতি। সেই সাথে তাঁর আত্মবিশ্বাসও শনৈ শনৈ বাড়তে থাকে যে বিজয় এখন তাদের স্পর্শের ভিতরে নাগালের মধ্যে এসে পড়েছে। এটাকে তার নাগালের ভিতর থেকে ফসকে যেতে দেয়াটা মোটেই উচিত হবে না।
প্রতিনিধি লোকটা বাস্তবিকই বৃদ্ধ- বস্তুতপক্ষে এতোটাই বয়োবৃদ্ধ যে একটা লম্বা, তেল চকচকে লাঠির সাহায্য ছাড়া বেচারা হাঁটতেই পারে না। হুমায়ুনের সামনে এসে সে ঝুঁকে নীচু হয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে চায় কিন্তু পারে না। সুলতান আমাকে মার্জনা করবেন, শ্ৰদ্ধার কমতি না বরং আমার বুড়ো হাড়ই আমাকে বাধা দিচ্ছে… কিন্তু আমি অসুস্থতার কবল এড়িয়ে যেতে পেরেছি। শহরের বার্তাবাহক হিসাবে আমাকে মনোনীত করার সেটাই অন্যতম কারণ।
তাকে বসার জন্য একটা তেপায়া এনে দাও। বৃদ্ধ লোকটা কষ্টকর ভঙ্গিতে নীচু হয়ে বসা পর্যন্ত হুমায়ুন অপেক্ষা করে, তারপরে জিজ্ঞেস করে। আপনি আমার জন্য কি বার্তা নিয়ে এসেছেন?
আমাদের শহরে প্রতিদিনই অসংখ্য লোক মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। আমরা এর কোনো কারণই বুঝতে পারছি না- সম্ভবত সেনাছাউনির সৈন্যরা যখন শহরের বাইরের কূপ আর ঝর্ণাগুলোয় বিষ দিয়েছিল তখনই কোনভাবে আমাদের নিজেদের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও দূষিত হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে যুবকরাই সবচেয়ে বেশী ভুগছে। কাবুল শহরের অনেক মায়েরই বুক খালি হয়েছে। এই অহেতুক যুদ্ধের কারণে আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি- এমনকি সেনাছাউনিতেও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে, আমাকে তাদের পক্ষেও আলোচনা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা এই অবরোধের একটা অবসান চাই যাতে করে যারা শহর ত্যাগ করতে চায় চলে যেতে পারে।
