বৈরাম খান, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত? আমি জানি আমি বিশ্বাস করতে পারি আমি সত্যি কথাটাই বলবেন।
আমার মনে হয় আমরা দুজনেই জানি সামনাসামনি আক্রমণের সিদ্ধান্তটা একটা ভুল ছিল- হতাশার গর্ভে জন্ম নেয়া একটা ভুল। আমাদের অবশ্যই কঠোর অবরোধ বজায় রেখে আরো একবার ধৈর্য ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত রসদ সংগ্রহের জন্য আমরা আমাদের লোকদের অন্যত্র প্রেরণ করতে পারি এবং সেটা আমরা করবোও কিন্তু কামরান আর তার বাহিনীর পক্ষে সেটা সম্ভব না। তাঁদের সামনে পরিত্রাণ লাভের কোনো আশাই নেই। আমরা যদি আমাদের স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তাহলে আমাদের অনেক আগেই তাদের মনোবলে ভাঙ্গনের খেলা শুরু হবে।
বিচক্ষণ পরামর্শ। অবরোধ জোরদার করতে সবাইকে প্রয়োজনীয় আদেশ জানিয়ে দেন।
হুমায়ুন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বের হয়ে তাঁর শিবিরের সীমানার চারপাশে পাহারা দেবার জন্য প্রহরীদের এক অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাবার সময় কয়েকটা ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর সে শুনতে পায়। ছাগল বা ভেড়ার মালিকানা নিয়ে সম্ভবত আরেকটা বচসা। সে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টা চিন্তা করে না। সে আরেকটু এগিয়ে গেলে বচসার কারণ প্রত্যক্ষ করে। হুমায়ুনের ছয়জন সৈন্যের মাঝে, যাদের প্রত্যেকের হাতে উদ্ধত তরবারি রয়েছে, খঞ্জর হাতে খোঁচা খোঁচা ভাবে কামান এক মাথা চুল নিয়ে একটা লোক অকুতোভয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে। এখানে এসব কি হচ্ছে?
তাকে চিনতে পারার সাথে সাথে, সৈন্যরা নিজেদের বুক হাত দিয়ে স্পর্শ করে। হুমায়ুন দেখে লোকটার চঞ্চল চোখ তার ঘোড়ার সোনার কলাই করা লাগাম আর তার পরনের ভেড়ার চামড়ার আলখাল্লার কারুকার্যখচিত বকলেসের উপর ঘুরে বেড়ায়, সে কে হতে পারে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।
আমি তোমাদের সম্রাট। কে তুমি আর কেন এখানে ঝামেলা করছো?
লোকটাকে হতবাক দেখায় কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়। আমার নাম জাভেদ, ঘিলজাই গোত্রের লোক আমি। আমি এসব শুরু করিনি। আপনার সৈন্যরা আমাকে একজন গুপ্তচর মনে করেছে…
সত্যিই কি তুমি?
না। আমি প্রকাশ্যে আপনার শিবিরে এসেছি। আমার কাছে তথ্য আছে।
কি সম্বন্ধে?
সেটা নির্ভর করবে মূল্যের উপর।
জাভেদের উদ্ধত কথাবার্তায় ক্ষিপ্ত হয়ে, সৈন্যদের একজন সামনে এগিয়ে এসে বর্শার বাঁট দিয়ে তার পিঠের কৃশতম অংশে আঘাত করে তাঁকে মাটিতে ফেলে দেয়। সম্রাটের সামনে নতজানু হয়ে বসা দস্তুর। শ্রদ্ধা প্রদর্শনের রীতি কি দেশ থেকে উঠে গিয়েছে…
হুমায়ুন কোনো কথা বলার আগে লোকটাকে কিছুক্ষণ সেঁতসেঁতে মাটিতে পড়ে থাকতে দেয়। উঠে দাঁড়াও। জাভেদ টলমল করতে করতে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায় এবং প্রথমবারের মতো তাঁকে সামান্য বিচলিত দেখায়।
আমি আমার প্রশ্নটা আবার করছি। তোমার কাছে কি তথ্য রয়েছে? আমি তুমি না ঠিক করবো সেটার জন্য মূল্যপ্রদান করা সঙ্গত হবে কিনা। আমাকে যদি তুমি না বলো, আমার লোকেরা তাহলে তোমাকে বাধ্য করবে সেটা বলতে।
জাভেদ ইতস্তত করে। হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, লোকটা কি আসলেই অপরিশীলিত সরলমনা? একজন আহাম্মকের পক্ষেই কেবল সম্ভব সরাসরি কোনো সেনাছাউনিতে এসে সম্রাটের সাথে কোনো কিছু নিয়ে দর কষাকষি করার ধৃষ্টতা দেখান। কিন্তু জাভেদকে দেখে মনে হয় সে মনস্থির করে ফেলেছে। শহরে মহামারী দেখা দিয়েছে। দুই কি তিনশ লোক ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে এবং প্রতি মুহূর্তে বাজারে আরো মৃতদেহ এসে জমা হচ্ছে…
কবে থেকে এটা শুরু হয়েছে?
কয়েকদিন আগে প্রথম প্রকোপটা দেখা দেয়।
তুমি কিভাবে জানতে পেরেছো?
আমার ভাইয়ের কাছ থেকে সে শহরের ভিতরে রয়েছে। আমি আর আমার ভাই, আমরা খচ্চর আর ঘোড়ার ব্যাপারী। প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও আমরা কাবুলের বণিকদের কাছে আমাদের জন্তুগুলো বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছিলাম বরফ গলতে শুরু করার সাথে সাথে কাফেলার বহর যাতায়াত আরম্ভ করলে মালামাল পরিবহণের জন্য যাদের ভারবাহী প্রাণী প্রয়োজন হবে। পাহাড়ে আমি আমাদের জন্তুগুলোকে চরাতে নিয়ে গিয়েছিলাম এমন সময় আপনার আগুয়ান বাহিনীর খবর শুনতে পেয়ে কাবুল সেনানিবাসের অধিনায়ক তোরণদ্বার বন্ধ করার আদেশ দেন। আমার ভাই- যে শহরের সরাইখানাগুলোর একটায় ব্যবসায়িক লেনদেনের তদারকি করছিল- শহরের ভেতরে আটকা পড়ে। অবরোধ শুরু হবার পরবর্তী সপ্তাহগুলোকে আমি অবশ্য তার কাছ থেকে কিছুই জানতে পারিনি। কিন্তু আমার শিকারী কুকুরটা তাঁর কাছে ছিল। তিন রাত্রি আগের কথা, পাহাড়ের পাদদেশে আমার ছাউনিতে কুকুরটা ফিরে এসেছে জন্তুটার গলার বকলেসে একটা চিঠি আটকান ছিল। আমার ভাই নিশ্চয়ই শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উপর দিয়ে কুকুরটাকে নীচে নামাবার একটা পথ খুঁজে বের করেছিল, যদিও জন্তুটা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল বেচারার পেটের একপাশ দারুণভাবে ছড়ে গিয়েছে এবং রক্তক্ষরণ হয়েছে আর একটা পা খোঁড়া হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তারপরেও জটা আমাকে ঠিকই খুঁজে বের করেছে।
বার্তায় আর কি বলা হয়েছে? তোমার কাছে কেন মনে হয়েছে যে খবরটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে?
জাভেদের চোখে মুখে আবার সেই ধূর্ততা ফিরে আসে। আমার ভাই শহরে বিদ্যমান ভয় আর আতঙ্কের কথা লিখেছে। সে বলেছে শহরবাসীরা অবরোধের অবসান চায় যাতে তারা শহর আর সেখানে বিদ্যমান মহামারীর প্রকোপ থেকে দূরে যেতে পারে। সে বিশ্বাস করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শহরবাসীরা সেনাছাউনির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে শহরের মূল তোরণদ্বার আপনার জন্য খুলে দিতে পারে।
