হুমায়ুন পর্যাণের উপরে সামান্য দুলতে দুলতে মনে মনে ভাবে, তাকে অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করতে হবে, ঠিক যেমন হিন্দালের কাছ থেকে আকবরের উদ্ধার সংক্রান্ত সংবাদের জন্য সে নিজেকে বাধ্য করেছিল অপেক্ষা করতে। একটাই সমস্যা কামরান এতো কাছে রয়েছে জানবার পরে ধৈর্য ধারণ করা কঠিন। দূর্গপ্রাসাদ অভিমুখে উঠে যাওয়া ঢালু পথটা দিয়ে ঘোড়া হাকিয়ে গিয়ে নিজের ভাইকে দ্বৈরথে আহবান করার ইচ্ছা অনেক সময়েই হুমায়ুনের মনে প্রবল হয়ে উঠে। ব্যাপারটা এমন নয় যে কামরান আহ্বানে সাড়া দিতে আগ্রহী- গলা এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয়া একটা তীরই বড় জোর হুমায়ুনের কপালে জুটতে পারে।
তার পেছনে অবস্থিত কামানগুলো থেকে পুনরায় গোলাবর্ষণের গমগম শব্দ ভেসে আসে। হুমায়ুন বহুকষ্টে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দূর্গপ্রাসাদের দিকে তাকায়। একটা ভয় যে কামরান আর সেখানে নেই আরো একবার তাকে পেয়ে বসে। ধরা যাক দূর্গপ্রাসাদ থেকে পাথরের ভিতর দিয়ে অবস্থিত একটা গোপন পথ দিয়ে অন্যত্র যাওয়া যায়। সে তাঁর কৈশোরে এমন কোনো পথ আছে বলে শোনেনি কিন্তু এমনটা অসম্ভব না যে কামরান সেরকম একটা পথ খুঁজে পেয়েছে এবং তার পক্ষ থেকে দূর্গ রক্ষার দায়িত্ব অন্যদের উপরে অর্পণ করে সে পালিয়েছে।
তার পক্ষে আর অপেক্ষা করা সম্ভব না। দুর্গপ্রাসাদে প্রচণ্ড আর আকস্মিক আক্রমণের বিষয় নিয়ে সে তার সেনাপতিদের সাথে আলোচনা করবে। এরফলে ব্যাপক প্রাণহানির সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু তাঁদের বিপুল সংখ্যাধিক্যের কারণে আক্রমণের ফলাফল নিয়ে নিশ্চিতভাবেই সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সে মাথা নীচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করে যে বরফ গলতে শুরু করায় তার ঘোড়ার খুরের নীচের মাটি আদ্রতার কারণে নরম হয়ে রয়েছে। প্রতিদিনই বরফের নীচ থেকে বের হওয়া বিরান মাঠের আকৃতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্তত ঋতু তার পক্ষে রয়েছে…
*
নাদিম খাজা আহত হয়েছেন। প্রাচীরের গায়ে তারা আরোহণী মই স্থাপণ করা আগেই দূর্গপ্রাকারের ছাদ থেকে তীরন্দাজ আর তবকির দল তাকে আর তাঁর লোকদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি করেছে, বৈরাম খান চিৎকার করে যখন হুমায়ুনকে একথা জানায় তাঁর আধঘন্টা আগেই দূর্গপ্রাসাদ অভিমুখে আক্রমণ শুরু হয়েছে। আমাদের লোকদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার সময় দূর্গরক্ষীরা নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করলে গুলি করে তাদের নিষ্ক্রিয় করতে আমাদের যতজন তবকিকে সেখানে পাঠান সম্ভব আমি পাঠাতে চেষ্টা করবো।
গোলন্দাজদের গোলাবর্ষণের মাত্রা দ্বিগুণ করার আদেশ দাও। তাঁদের কামান থেকে নির্গত ধোয়া তাদের জন্য কিছুটা হলেও আড়াল তৈরী করবে, হুমায়ুন আদেশ দেয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তাকিয়ে থাকতে সে দেখে দূর্গরক্ষীদের কয়েকজন আপাতদৃষ্টিতে আহত হয়েই, কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্য দূর্গের ছাদে অবস্থিত ছিদ্রের পেছনে অবস্থিত দেয়ালের উপর থেকে নীচে আছড়ে পড়েছে। কমপক্ষে আরো দুইজন গুলির আঘাতে পিছনের দিকে উল্টে পরার সময়ে নীচের পাথরের উপরে তাদের মাথা গিয়ে প্রথমে আঘাত করে, কিন্তু এতোকিছুর পরেও দূর্গরক্ষীদের গুলি ছোেড়ার বেগ মোটেই শ্লথ হয় না বরং হুমায়ুনের লোকেরা আর বেশী মাত্রায় আহত হতে শুরু করে। বৈরাম খান, পশ্চাদপসারণের সংকেত ঘোষণা করেন, হুমায়ুন বাধ্য হয়ে আদেশ দেয়। আমাদের আক্রমণ খুব একটা ফলপ্রসু হচ্ছে না এবং এতো বেশী মাত্রায় হতাহতের সংখ্যা আমাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব না।
হুমায়ুনের সৈন্যদের ভিতরে যারা আক্রমণের ঝাপটা সামলে নিতে পেরেছে শীঘ্রই তাঁরা তাঁর নিয়ন্ত্রক অবস্থানের পাশ দিয়ে শিবিরের দিকে ফিরতে শুরু করে, কেউ খুঁড়িয়ে হাঁটছে, অন্যদের ক্ষতস্থানে বাঁধা পট্টি থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দুইজন লোক তার পাশ দিয়ে একটা খাঁটিয়া বয়ে নিয়ে যায়, হুমায়ুন খাঁটিয়ায় শুয়ে থাকা লোকটাকে যন্ত্রণায় পশুর মতো চিৎকার করতে শোনে এবং খেয়াল করে দেখে দূর্গপ্রাকারের ছাদ থেকে আক্রমণকারীদের উপরে ঢেলে দেয়া গরম আলকাতরায় লোকটার ডান হাত আর কাঁধ ঝলসে গিয়েছে। হুমায়ুনের চোখের সামনেই লোকটার দেহটা আচমকা মোচড় দেয় এবং লাথি ছুঁড়ে, আর সহসাই যন্ত্রণার হাত থেকে সে চিরতরে মুক্তি লাভ করে। নাদিম খাজা চট আর ডালপালা দিয়ে কোনমতে তৈরী করা একটা খাঁটিয়ায় শুয়ে সবার শেষে শিবির অভিমুখে বৈরাম খান আর হুমায়ুনকে অতিক্রম করেন, তাঁর উরু থেকে একটা ভাঙা শরযষ্টি বের হয়ে রয়েছে। কিন্তু নাদিম খাজা প্রাণবন্ত কণ্ঠে বলেন, সুলতান, চিন্তা করবেন না আমি ঠিক আছি, ব্যাটাদের গায়ে জোর নেই তীরটা কেবল মাংসে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। আবারও আপনার খেদমত করতে আমি বেঁচে থাকবো।
তার এমন বিশ্বস্ত সমর্থক রয়েছে এটা ভালো লক্ষণ, কিন্তু আরো বেশী সংখ্যক প্রাণহানির সম্ভাবনা মোকাবেলা করতে প্রস্তুত ভেবে নিয়ে সে কি তাঁর বাকি সৈন্যদের উপরে ভরসা করতে পারে? বিজয় অর্জিত হলে সে তাঁদের পুরস্কৃত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিন্তু তাঁর প্রতিশ্রুতি তখনই তাঁদের কাছে অর্থবহ হবে যদি তাঁরা বিশ্বাস করে যে শেষ পর্যন্ত তারাই বিজয়ী হবে। সে কিভাবে কাবুল দখল করবে? কামরানকে কিভাবে বন্দি করবে? সে জীবনে প্রথমবারের মতো সত্যিই অসহায় বোধ করে।
