হুমায়ুন মুখাবয়ব সহসা কুঁচকে যায়। অতীতে হিন্দালের প্রশ্নাতীত আনুগত্য, যেন তার প্রাপ্য, এমনটা আশা করে সে নিজেকে কি কামরানের চেয়ে খুব একটা আলাদা বলে দাবী করতে পারে? সম্ভবত না। সে আশা করে যে উৎকণ্ঠা আর ভয়ে কামরান এখন ঘামছে, কিন্তু এটা প্রতিশোধের খেলায় ব্যক্তিগত হিসাবের জের টানার সময় না। বিজয় অর্জনের দ্রুততম পথ খুঁজে পাওয়াটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং যা মোটেই সহজ কাজ না। দূর্গপ্রাসাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে রসদ মজুদ রয়েছে। কামরান আর তার অনুগত লোকেরা ভালো করেই জানে যে পরাজিত হলে তাঁদের প্রতি সামান্য অনুকম্পাও প্রদর্শন করা হবে না তাই দূর্গপ্রাসাদে জীবন বাজি রেখে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
হামিদার প্রায়োগিক প্রজ্ঞা আর সান্ত্বনাদায়ক অনুত্তেজিত উপস্থিতির জন্য ব্যাকুল হয়ে হুমায়ুনের মনে হয়, সে যদি এই মুহূর্তে তার পাশে থাকতো। হুমায়ুন যদিও ভালো করেই জানে যে সে ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে যে আকবর, গুলবদন আর অন্যান্য অভিজাত রমণীদের সাথে হামিদা মূল বাহিনীর পেছনে সুসজ্জিত দেহরক্ষীদের দ্বারা নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যুহের ভিতরে অবস্থান করে তাঁদের অনুসরন করবে এবং কাবুল থেকে নিরাপদ দূরত্বে তাদের জন্য অপেক্ষা করবে। সে চায় না তাঁর স্ত্রী আর পুত্রের জীবন আবারও ঝুঁকির সম্মুখীন হোক। কিন্তু যত দ্রুত শহরটা আরো একবার তার আয়ত্বে আসবে, সে দ্রুত তাকে সেখানে নিয়ে আসতে পারবে। অন্তত, এতো কষ্ট আর অন্তর্জালা সহ্য করার পরে তাঁর রাণীর প্রাপ্য সম্মানের গুরুত্ব কেমন সেটা জানা উচিত আর শীঘই, সে নিজেকে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে যে, সম্রাজ্ঞীর মহিমা সে লাভ করবে।
*
সহসা হুমায়ুনের ঠিক পেছনে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের শব্দ তাকে বধির করে দেয় এবং গরম বাতাসের একটা হলকা তাঁকে মাটিতে ছিটকে ফেলে, সে ভূপাতিত হবার সময়ে পাথরের সাথে মাথা ধাক্কা খেলে হাজার আলোর ঝলকানি দেখে। তার চোখে মুখে কাদা আর বরফে কিচকিচ করতে থাকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে তার চোখ খুলতে সক্ষম হয়। সে ধীরে ধীরে অনুধাবন করে যে তার চারপাশে খোলামকুচির মতো পিতলের টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে আর বরফাবৃত মাটিতে গেঁথে থাকা তাজা মাংসের টুকরো চুমকির মতো দেখায়। একটা চিল কোথা থেকে উড়ে আসে এবং তার বাঁকান ঠোঁট দিয়ে একটা টুকরো ঠোকরাতে আরম্ভ করে। তাঁর মাথার ভিতরে জমাট বাধা স্তব্ধতা পুরো দৃশ্যটাকে আরো বেশী দুঃস্বপ্নময়তা দান করতে হুমায়ুন দুহাতে তার কান চেপে ধরে। সে কান চেপে ধরলে, কপালের ডান দিকের একটা ক্ষতস্থান থেকে তার ডান হাতের আঙ্গুলে টপটপ করে রক্ত ঝরতে শুরু করে।
তার কানের ভেতরে সহসা আবার পটকা ফোঁটার মতো শব্দ বাজতে আরম্ভ করে- তার শ্রবণশক্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে… সে বুঝতে পারে দূর্গপ্রাসাদের প্রাচীরের উপর থেকে প্রাসাদ রক্ষীদের উন্মত্ত উল্লাসের মতো একটা শব্দ ভেসে আসছে, যার সাথে বিদ্রুপাত্মক চিৎকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। হুমায়ুন পায়ের উপর ভর দিয়ে নিজেকে টেনে তুলে এবং চারপাশে তাকায়, সে এখনও স্তম্ভিত হয়ে রয়েছে এবং প্রাণপনে চেষ্টা করছে নিজের অবোধ্য চিন্তাগুলোকে পুনরায় সন্নিবেশিত করতে। আদতে কি ঘটেছে সে ধীরে ধীরে সেটা বুঝতে পারে। তার বড় কামানগুলোর একটা নিজেই বিস্ফোরিত হয়েছে। কামানটা একপাশে কাত হয়ে পড়ে এর গোলন্দাজদের একজনকে চাপা দিয়েছে, বেচারার কামানের নীচে আটকে গিয়েছে, ব্যাথায় লোকটা চিৎকার করছে আর মোচড় খাচ্ছে। কমপক্ষে দুজন লোকের ছিন্নভিন্ন দেহখণ্ড চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে, এখানে একটা কাটা পা, ওখানে একটা কাটা হাত, কামানের পাশে একটা রক্তাক্ত কবন্ধ শরীর এবং হুমায়ুনের পায়ের কাছ থেকে মাত্র একগজ দূরে ঝলসে যাওয়া হীনাঙ্গ মস্তক পড়ে রয়েছে, বাতাসে মাথাটিতে ঝলসানোর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েক গাছি চুল এলোমেলো উড়ছে। হুমায়ুন বুঝতে পারে, কামানের নলে নিশ্চয়ই ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল। তার লোকেরা নতুন করে তিন সপ্তাহ পূর্বে শহর আর দূর্গপ্রাসাদ অবরোধ শুরু করার পর থেকে কামানটা নিয়মিত ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো। সে পূর্বের মতোই, দূর্গপ্রাসাদকে তাঁর প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসাবে বেছে নিয়েছে এবং দূর্গপ্রাসাদ অভিমুখী রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে তার সৈন্যরা তাদের কামানগুলো মাটির উপর দৃশ্যমান শিলাস্তর দ্বারা সুরক্ষিত পূর্ববর্তী স্থানেই মোতায়েন করেছে।
সুলতান, আপনি সুস্থ আছেন? ধুসর ধূলার ছোপছোপ দাগ নিয়ে জওহর পাশে এসে দাঁড়াতে তাকে মানুষের চেয়ে প্রেতাত্মাই বেশী মনে হয়।
মাথায় কেবল একটা আচড় লেগেছে। হুমায়ুন যখন কথা বলছে, বিবমিষার একটা ঢেউ তার শরীরে এসে আছড়ে পড়ে এবং সে মাতালের মতো টলতে থাকলে জওহর দৌড়ে এসে তাকে ধরে।
সুলতান, আপনাকে আমরা হেকিমের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। জওহর তাঁকে প্রায় পাজকোলা করে তুলে যেখানে কয়েকটা ঘোড়া দড়ি বাঁধা অবস্থায় রাখা আছে সেখানে নিয়ে আসে। সে ঘোড়ায় চেপে ধীরে ধীরে যখন শিবিরে ফিরে আসছে তখন, জওহর নিজের ঘোড়ার পাশাপাশি হুমায়ুনের ঘোড়ার লাগামও ধরে থাকে, হুমায়ুনের দপদপ করতে থাকা মাথার ভিতরের চিন্তাগুলো বিষণ্ণতার রূপ নিয়েছে। এই সাম্প্রতিক বিপর্যয় বিবেচনা না করেও, বাস্তবতা হল এই যে অবরোধের দ্বারা সামান্যই অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তার গোলন্দাজদের নিশানা, যদিও তারা হাড় কাঁপান শীতে চামড়ার আটসাট পোষাক পরিহিত অবস্থায় ঘামতে ঘামতে যখন তাঁদের কামানের ব্রোঞ্জের নলের ভিতরে বারুদ আর গোলা ঠেসে ঢুকিয়ে দিয়ে স্পর্শক গহ্বরে গনগনে সলতে রাখে, নিখুঁত এবং প্রায় প্রতিটা গোলাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্যস্থল- তোরণদ্বারের অবকাঠামো এবং এর চারপাশের মেরামত করা আর শক্তিবর্ধন করা প্রাচীর থেকে পাথর আর মাটির আস্তর ছিটকে উঠে এবং ধূলোর মেঘ তরঙ্গের মতো আকাশে ভাসে- কিন্তু তারা এখনও সেখানে কোনো ধরনের ফাটল সৃষ্টি করতে পারেনি। হুমায়ুন তোরণের বামপাশের দেয়ালের প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য গোলন্দাজদের দুটো দলকে দিয়ে গোলাবর্ষণের আদেশ দিয়ে চেষ্টা করেছেন কিন্তু গোলাবর্ষণের নতি দুরূহ হবার কারণে দেয়ালের বিস্তার বরাবর নিখুঁতভাবে গোলাবর্ষণের একমাত্র উপায় হল শৈলস্তরের পেছন থেকে কামানগুলোকে সরিয়ে উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে আসা যেখানে তাঁর গোলন্দাজেরা দূর্গপ্রাকারের ছাদে অবস্থানরত তীরন্দাজ কিংবা তবকিদের সহজ নিশানায় পরিণত হবে। এই চেষ্টা করতে গিয়ে তার কয়েকজন গোলন্দাজ মারাও গিয়েছে এবং তাদের মতো দক্ষতাবিশিষ্ট লোকদের প্রতিস্থাপণ করাও কঠিন কাজ। তাঁর বারুদের সরবরাহও সীমিত।
