সম্রাটের অভিপ্রায় জেনে নিয়ে জওহর যখন ঘুরে দাঁড়ায়, হুমায়ুন তার বিশাল কালো ঘোড়াটার পাঁজরে আলতো করে গুতো দিতে সেটা তাল গাছের নীচে দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, তালগাছের গাঢ় সবুজ রঙের লম্বা, তীক্ষাগ্র পাতাগুলো সমুদ্র থেকে আগত এবং নরম বালির উপর দিয়ে প্রবাহিত বাতাসে আন্দোলিত হয়ে মরমর শব্দ করছে। হুমায়ুন এখানে লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসে। দাঁড়িয়ে পায়ের জুতো জোড়া খুলে ফেলে সে সোজা সমুদ্রের দিকে হেঁটে যায়, সে খুব ভালো করেই জানে যে এমনটা করার ব্যাপারে তাদের পরিবারের ভিতরে সেই প্রথম। পায়ের ডিসের নীচের অংশে এসে আছড়ে পড়া পানি শ্রান্তিহর শীতল। পুনরায় নিজের চোখে উপরে হাত দিয়ে একটা আড়াল তৈরী করে সে সোনারমতো চকচক করতে থাকা, দীপ্তিময় দিগন্তের দিকে তাকায়। সে ভাবে সেখানে সে হয়তো একটা জাহাজের অবয়ব দেখতে পেয়েছে–সম্ভবত কাম্বের সাথে বানিজ্য করে তাদেরই কোনো একটা জাহাজ হবে। তাঁরা কি ধরনের মাল বহন করে? তারা কি ধরনের লোক? দিগন্তের ওপাশে কি আছে, এমনকি আরব এবং পবিত্র নগরীদ্বয়ের ওপাশে? সেখানে কি নতুন জ্ঞান আহরণে পর্ব চলছে? সেখানে নতুন শত্রুরা ওঁত পেতে রয়েছে নাকি কেবলই ধুধু বিরান প্রান্তর নাকি অনন্ত সমুদ্র?
হুমায়ুনের নিঃসঙ্গ ভাবনার স্রোত জওহরের চিৎকারের ফলে বিঘ্নিত হয়। সুলতান, আপনার আধিকারিকেরা আপনার সাথে পরামর্শ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আপনি কি অনুগ্রহ করে তাঁদের সাথে আহার করবেন? আপনি অনেকক্ষণ ধরেই নিবিষ্ট মনে সাগরের দিকে তাকিয়ে আছেন এবং আপনার চারধারে পানি বাড়ছে। কথাটা সত্যি। সেই ছোট ঢেউগুলো এখন ফিরে যাবার আগে হুমায়ুনের হাঁটু ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অনিচ্ছাসত্তেও সে বিমূর্ত ভাবনার জগৎ থেকে, যা সবসময়ে তাকে আনন্দ দান করে থাকে, বর্তমানের বাস্তবতায় নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং আধিকারিকেরা তালগাছের নীচে টকটকে লাল চাঁদোয়ার তলায় আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে যেখানে প্রতীক্ষা করেছে সেদিকের উদ্দেশ্যে হাঁটতে আরম্ভ করে।
দশ মিনিট পরে, আহমেদ খান, তাঁর প্রধান অনুসন্ধানী দূত, কাবুলের দক্ষিণে, গজনীর পাহাড়ী এলাকা থেকে আগত পাগড়ি পরিহিত পাকান শরীরের ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবককে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তাঁর কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে গাল বেয়ে নেমে এসে তার পাতলা খয়েরী দাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে। উপকূলের প্রান্তে তালগাছের চওড়া সারির ঠাস বুনোটের অন্যপাশে সমুদ্র থেকে সোয়া মাইলের মতো ভিতরে অবস্থিত একটা রাস্তা দিয়ে কাফেলাটা এগিয়ে আসছে, এই মুহূর্তে সেটা পাঁচ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থান করছে। কাম্বে শহর থেকে সেটা চার মাইল মতো দূরে রয়েছে, যা ওখানে অবস্থিত ঐ নীচু শৈলান্তরীপের কারণে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রয়েছে।
আমরা সমুদ্র সৈকতের উপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে তালগাছের সারির অন্যপাশে যাব এবং তারা কাম্বে পৌঁছান মাত্র অতর্কিতে তাঁদের আক্রমণ করবো। আল্লাহতালা আমাদের সহায় থাকলে, আমরা হয়ত এমনকি বলপ্রয়োগের দ্বারা বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য নিজেদের পথ করে নিতে পারবো যদি কেবল কাফেলাটাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়ার জন্য তোরণদ্বার খোলা থাকে।
মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই, হুমায়ুনের ঘোড়া বালুর প্রান্ত বরাবর আস্কন্দিত বেগে ছুটতে থাকে তার চারপাশে, তাঁর দেহরক্ষীর দল খুব কাছ থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছে। এক ঘন্টারও কম সময়ের ভিতরে তাঁরা পাথুরে শৈলান্তরীপ অতিক্রম করে এবং তালগাছের নিরবিচ্ছিন্ন আড়ালে অবস্থান করে। হুমায়ুন কাম্বে বন্দরে স্থির হয়ে ভেসে থাকা বা বন্দরের বাইরে নোঙ্গরবদ্ধ অবস্থায় থাকা সব জাহাজের মাস্তুল আর পাল দেখতে পায়। কাফেলাটা, যার ভিতরে রয়েছে মালের ভারে টলমল করতে থাকা উট, ভারবাহী হাতি আর তার সাথে খচ্চর আর গাধার পাল, অবসন্ন ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে বন্দরের ক্ষুদ্র বসতিকে ঘিরে থাকা মাটির দেয়ালে অবস্থিত এখন হাট করে খোলা অবস্থায় রয়েছে এগিয়ে যায়। দেয়ালটা দেখেও খুব একটা উঁচু মনে হয় না–সম্ভবত কেবল দুই মানুষ পরিমাণ উঁচু। কাফেলার রক্ষীদল, সব মিলিয়ে যাঁর জনবল প্রায় চারশোর কাছাকাছি, অশ্বারূঢ় হয়ে এর দুইপাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে কিন্তু তাদের দেখে ক্লান্ত মনে হয়, মধ্যাহ্নের খরতাপে মাথা নোয়ানো সেইসাথে তাদের প্রত্যেকের তরবারি কোষবদ্ধ আর ঢাল তাদের পিঠের সাথে আটকানো।
ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তার লোকদের মূল দলের কাছে ফিরে এসে হুমায়ুন, চেঁচিয়ে বলে, এখনই আক্রমণ করতে হবে। আমরা তাদের ভড়কে দেব। উট আর হাতির দলটাকে আতঙ্কিত করতে চেষ্টা করবে। তাহলে তাঁরাই গুজরাতি রক্ষীবাহিনীর বারোটা বাজিয়ে দেবে। হুমায়ুন এসব কথা বলার মাঝেই নিজের বিশাল কালো ঘোড়াটার পাঁজরে গুতো দেয়, যার পুরো দেহটা ইতিমধ্যেই বিন্দু বিন্দু তেলতেলে ঘামে ভিজে গিয়েছে এবং অচিরেই তাল গাছের ভিতর দিয়ে নিজের লোকদের সাথে নিয়ে সে, বন্দরের তোরণদ্বার আর কাফেলা থেকে তাঁকে পৃথককারী, আধ মাইল বিস্তৃত পাথুরে, বালু ঢাকা পটভূমির উপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ঘোড়া হাকায়। তার আদেশ পাওয়া মাত্র, তার সবচেয়ে অভিজ্ঞ তীরন্দাজদের কয়েকজন দাঁত দিয়ে ঘোড়ার লাগাম কামড়ে ধরে রেকাবের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে কাফেলার অবস্থান লক্ষ্য করে এক পশলা তীর ছুঁড়ে দেয় ঠিক যখন এর রক্ষীবাহিনী বুঝতে পেরেছে যে তাঁদের উপরে আক্রমণ করা হয়েছে। কয়েকটা তীর একটা হাতিকে আহত করলে বেচারা তাঁর দেহের মোটা চামড়া ভেদ করে প্রবিষ্ট শরযষ্টিসহ ঘুরে গিয়ে, ব্যাথায় আর্তনাদ করতে করতে তাঁকে অনুসরণরত কয়েকজনকে মাড়িয়ে ছুটে গেলে, তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
