হুমায়ুন হিন্দালের আপাত অন্যমনস্ক মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এই কাজটা হামিদা যেমনটা ভেবেছিল কাজটা তারচেয়েও কঠিন।
হিন্দাল… হুমায়ুন তার সৎ-ভাইয়ের পূর্ণ মনোযোগ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তারপরে কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নীচু করে কথা শুরু করে, যাতে অন্য কেউ তাঁদের আলোচনা আড়ি পেতে শুনতে না পায়। আমি জানি তুমি আমার জন্য না হামিদার কথা চিন্তা করেই যা করবার করেছে। সে আমাকে বলেছে তার পক্ষে আমি যেন তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।
তাকে বলবেন এর কোনো প্রয়োজন নেই। পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনা করেই…
তুমি হয়ত এসব কথা শুনতে চাও না কিন্তু তারপরেও বলছি আমিও তোমার কাছে চিরতরে ঋণী হয়ে রইলাম। তোমার কর্মকাণ্ডের পেছনে যে কারণই থাকুক না কেন সেটা তোমার প্রতি আমার দায়বদ্ধতা থেকে আমাকে মুক্তি দেয় না।
হিন্দাল হাল্কা কাঁধ ঝাঁকায় কিন্তু কোনো মন্তব্য করে না।
আমাকে এবার বল, তোমার পরিকল্পনা কি তোমার প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করেছিল? কাবুলে আসলেই কি ঘটেছে সেটা জানার জন্য হামিদা উদগ্রীব হয়ে রয়েছে…
হিন্দালের ঠোঁটের কোণে এততক্ষণ পরে হাল্কা হাসির একটা রেখা ফুটে উঠে। আমি যেমনটা আশাও করিনি তারচেয়েও ভালো কাজ করেছে। কাবুল থেকে আপনার অবরোধ তুলে নেবার খবর আমার গুপ্তদূতদের কাছ থেকে জানবার কয়েকদিন পরে, আমি আমার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে পাহাড় থেকে নীচে নেমে আসি এবং দূর্গপ্রাসাদে আমার বার্তাবাহককে পাঠাই কামরানকে বলার জন্য যে আমাদের পরিবারের সত্যিকারের প্রধান হিসাবে তাঁকে সমর্থণের অঙ্গীকার করতে আমি প্রস্তুত। কামরানের মতো উদ্ধত আর আত্মগর্বী এবং আপনার প্রস্থানের কারণে খুশীতে আত্মহারা অপদার্থের কাছে, আমি ঠিক যেমনটা প্রত্যাশা করেছিলাম, সে আমাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। আহাম্মকটা এমনকি বিষয়টা উদযাপনের জন্য ভোজসভার আয়োজন করে এবং আমাকে নানা উপঢৌকন দেয়…
সে আসলেই কিছু সন্দেহ করেনি?
কিস্যু না। আপনাকে পরাস্ত করতে পেরেছে বিশ্বাস করায় তাঁর আত্মবিশ্বাস তাঁকে অন্ধ করে ফেলেছিল। আমি পৌঁছাবার আগেই সে এমনকি কাবুল শহর আর দূর্গপ্রাসাদ উভয়ের প্রধান প্রবেশদ্বার দিনের বেলায়ও খুলে রাখার আদেশ দিয়েছিল। আমি সেখানে পৌঁছাবার এক সপ্তাহের ভিতরেই সে শীতের তীব্রতা আর ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়ে প্যাচান শিংঅলা ভেড়া আর নেকড়ের সন্ধানে দক্ষিণে একটা শিকার অভিযানে যাবার কথা বলতে শুরু করে। আমি তাকে উৎসাহিত করি এমনকি তার সাথে শিকারে যাবার আগ্রহও দেখাই। কিন্তু, আমি তাঁর কাছে থেকে যেমনটা আশা আর ধারণা করেছিলাম, সে আমাকে দূর্গপ্রাসাদেই অবস্থানের আদেশ দেয়। তাঁর দেহরক্ষীদের প্রশিক্ষণ দেবার মতো কাজ সে ইতিমধ্যেই আমার জন্য নির্ধারিত করেছে। সে রসিকতার ছলে বলে যে আমার মনে কাবুল দখলের মতো কোনো দুর্বুদ্ধির যাতে উদয় না হয় সেজন্য যথেষ্ট সংখ্যক বিশ্বস্ত সৈন্য সে মোতায়েন করেই শিকারে যাবে।
কামরান শিকারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে, আমি কেবল আমাকে দেয়া আদেশ পালন করতে থাকি, সতর্ক থাকি এমন কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকতে, যাতে কারো মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। আমি এটাও নিশ্চিত হতে চাইছিলাম যে সে আসলেই কয়েক দিনের জন্য বাইরে গিয়েছে। তারপরে, চতুর্থদিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবার পরে সেই রাতে কামরানের ফিরে আসবার কোনো লক্ষণ না দেখে আমি আমার পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু করি। আপনার কি ছেলেবেলায় দেখা দূর্গপ্রাসাদের পূর্বদিকে অবস্থিত ছোট আঙ্গিনাটার কথা মনে আছে। যার একপাশের দেয়াল জুড়ে অবস্থিত তালাবদ্ধ ঘরে শস্য আর সুরা মজুদ করে রাখা হত?
বেশ, আমি দেখি যে কামরান গুদামঘর হিসাবে ব্যবহৃত সেইসব কক্ষের কয়েকটার পরিবর্তন সাধন করে বসবাসের উপযোগী করে তুলেছে, যেখানে সে মাহাম আগা আর তার সন্তানের সাথে আকবরকে প্রহরাধীন অবস্থান বন্দি রেখেছে। আমি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত চারজন দেহরক্ষীকে সাথে নিয়ে নিরবে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হই। আমরা আঙ্গিনায় পৌঁছাবার পরে আমার লোকেরা শস্য মজুদের জন্য রক্ষিত বিশালাকৃতি জালার পিছনে আত্মগোপন করে অবস্থান করতে থাকে। আমি একলা বন্ধ দরজায় উঁকি দেবার জন্য নির্মিত ফাঁকা অংশের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে প্রহরায় নিয়োজিত দুই রক্ষীকে বলি যে, তারা যাকে পাহারা দিচ্ছে তার চাচাজান হিসাবে আমি তার সাথে দেখা করতে চাই। আমাকে চিনতে পেরে তারা দরজা খুলে দেয়। আমি তাঁদের সাথে কথোপকথন অব্যাহত রাখি, সেই সুযোগে আমার লোকেরা লুকোন স্থান থেকে দ্রুত বেড়িয়ে এসে তাঁদের কাবু করে ফেলে তারপরে তাঁদের হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে দেয়া হয়।
মাহাম আমাকে নিয়েই আমায় সবচেয়ে বেশী ঝামেলা পোহাতে হয়েছে- সে কোথা থেকে একটা লুকান খঞ্জর বের করে আমাকে আঘাত করতে চেষ্টা করে আর সেই সাথে গলার স্বর সপ্তমে তুলে চিৎকার। আমি খঞ্জরটা তার কাছ থেকে সহজেই কেড়ে নেই- সে পরে আমাকে বলে যে খঞ্জরের ফলায় বিষ মাখান ছিল- কিন্তু তার চিৎকার বন্ধ করাটা তত সহজ কাজ ছিল না। আমি তার মুখে হাত চাপা দিয়ে, তার কানে বারবার বলতে থাকি যে আকবরের কোনো ক্ষতি করার অভিপ্রায় আমার নেই… যে আমি আপনাকে জানিয়ে আর সম্মতি নিয়েই তাদের উদ্ধার করতে এসেছি।
