আমার বেটা, সে ফিসফিস করে বলে, বেটা আমার।
এক ঘন্টা পরে, হুমায়ুন খুদে কাফেলাটার পুরোভাগে অবস্থান করে তাঁর শিবিরে ফিরে আসে। জেনানাদের তাবুর সামনে পৌঁছে, সে ঘোড়া থেকে নামে আর তারপরে সাবধানে আকবরকে ঝুড়ি থেকে কোলে তুলে নেয়। খচ্চরটা পুনরায় চলতে শুরু করায় ছেলেটা শান্ত হয়ে আবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। মাহাম আগাকে পাশে নিয়ে হুমায়ুন হামিদার তাবুর ভিতরে প্রবেশ করে। হামিদা তাঁর প্রিয় কবিতাগুলো থেকে পাঠ করছিলো কিন্তু পাণ্ডুলিপিটা এখন তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে রয়েছে এবং লাল আর সোনালী জরির কাজ করা মখমলের তাকিয়ায় হেলান দিয়ে সেও এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হামিদার মুখের উপরে রেশম চুলের গোছা এলিয়ে থাকায় তাকে এখন কত অল্প বয়সী মনে হচ্ছে আর তাঁর নিটোল স্তনযুগল নিঃশ্বাসের সাথে সাথে মৃদুভঙ্গিতে উঠা নামা করছে।
হামিদা, হুমায়ুন ফিসফিস করে ডাকে, হামিদা…আমি তোমার জন্য কিছু উপহার নিয়ে এসেছি- একটা উপহার…
হামিদা যখন চোখ খুলে তাকায় এবং আকবরকে দেখতে পায়, তার চোখমুখ এমন অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে যা হুমায়ুন আগে কখনও কারো ভিতরে প্রত্যক্ষ করেনি। কিন্তু হুমায়ুন আকবরকে হামিদার কোলে তুলে দিতে, সে জেগে উঠে। মুখ তুলে হামিদাকে দেখতে পেয়ে, সে হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে উঠে এবং কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে শুরু করে। মাহাম আগা দ্রুত সামনে এগিয়ে আসে, এবং তাঁকে দেখা মাত্র আকবর নিমেষে শান্ত হয়ে যায়। সে হাসি হাসি মুখে তাঁর নাদুসনুদুস হাত দুটো দুধ-মার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
*
আকবরকে ফিরে পাবার আনন্দে আয়োজিত ভোজসভার উচ্ছিষ্টের মাঝে, হুমায়ুনের লাল টকটকে নিয়ন্ত্রক তাঁবুর ভিতরে যত্নের সাথে বিন্যস্ত বিশালাকৃতি সব তাকিয়ায় হুমায়ুনের চারপাশে তার সব আধিকারিকেরা হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। ভোজসভার পূর্বে সেদিন দুপুরবেলা সে তাঁর সব লোকদের সমবেত হবার আদেশ দেয় এবং তাদের সামনে আকবরের উদ্ধার পাবার বিষয়টা ঘোষণা করে।
আমার অনুগত যোদ্ধারা আমাদের ভবিষ্যতের প্রতীক, আমার কাছে নিরাপদে ফিরে এসেছে, তোমাদের সামনে আমি আমার সন্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত করছি… হুমায়ুন তার অস্থায়ী শিবিরের কেন্দ্রস্থলে তড়িঘড়ি করে নির্মিত একটা কাঠের বেদীর উপরে দাঁড়িয়ে, সে আকবরকে তার মাথার উপরে উঁচুতে তুলে ধরে। ঢালের উপরে তরবারি দিয়ে আঘাতের সাথে একটা হর্ষোফুল্ল চিৎকারে তার চারপাশ গমগম করতে থাকে। হুমায়ুন মাহাম আগার কোলে আকবরকে যখন ফিরিয়ে দেয়- সে তখনও হঠাৎ সৃষ্ট এই হুঙ্কারে বিস্মিত হয়ে চোখ পিটপিট করছে, কিন্তু এবার সে কেঁদে উঠে না। এটা একটা শুভ লক্ষণ। হুমায়ুন হাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে ইঙ্গিত করে।
আমরা যা শুরু করেছিলাম সেটা সমাপ্ত করতে আর নিষ্পাপ শিশুদের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকে এমন ষড়যন্ত্রকারীকে উৎখাতের জন্য আমাদের কাবুলে ফিরে যাবার সময় হয়েছে। আমরা ন্যায়ের পক্ষে রয়েছি এবং আল্লাহ্তালা আমাদের সাথে আছেন। আজ রাতে আমরা ভোজের আয়োজন করবো কিন্তু কাবুল একবার আমাদের অধিকারে আসবার পরে আমাদের আজকের ভোজসভার সাথে সেদিনের উৎসবের কোনো তুলনায় চলে না। আগামীকাল সকালে আমরা শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবো।
শিবিরের বাবুর্চিরা তাঁদের রান্নার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছে, অতিকায় আগুনের কুণ্ড তৈরী করে শিক কাবার আর মাংস রোস্ট করা হচ্ছে যা থেকে পোয়র রাশি আকাশে ঢেউয়ের মতো উঠে যাচ্ছে। তার সন্তান এখন যখন নিরাপদ হুমায়ুন তখন কতদূর থেকে তাঁর শিবির দৃশ্যমান হচ্ছে সেসব নিয়ে মোটেই পরোয়া করে না।
তার সেনাপতিদের কয়েকজন যুদ্ধক্ষেত্রের কীর্তি নিয়ে রচিত বীরোচিত গান, হারেমের আরো বড় কীর্তিকলাপ নিয়ে রচিত স্থূল, অশ্লীল গান গাইতে আরম্ভ করে। হুমায়ুন তার চারপাশে তাকিয়ে দেখে জাহিদ বেগ সামনে পেছনে দুলছে, করোটির মতো মুখ গজনীর কড়া লাল সুরার প্রভাবে জ্বলজ্বল করছে কাবুল সালতানাত যে সুরার কারণে বিখ্যাত আর তার নিজের আব্বাজানও যা দারুণ পছন্দ করতেন। এমনকি সাধারণত স্বল্পভাষী আর গম্ভীর করিমও তাবুর এককোণে যেখানে নিজের বৃদ্ধ শরীরটার জন্য তিনি একটা আরামদায়ক স্থান খুঁজে পেয়েছেন বসে আপনমনে গান গাইছেন।
হুমায়ুন আর বৃথা কালক্ষেপন না করে তাঁর বিশ্বস্ত সহচরবৃন্দ, তাঁর ইচকিদের বলে যে অবরোধ তুলে নেবার বিষয়টা একটা কূটচাল ছিল। খবরটা শোনার পরে তাঁদের বেশীরভাগকেই দেখে মনে হয় তারা সত্যিই বিস্মিত হয়েছে। বৈরাম খানের অভিব্যক্তিতেই কেবল সামান্য বিস্ময় প্রকাশ পায় এবং ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য হুমায়ুনকে গম্ভীরভাবে অভিনন্দিত করার সময় তাঁর তীক্ষ্ণ নীল চোখে ফুটে থাকা অবগত ভাবের কারণে, হুমায়ুন দ্বিগুণ নিশ্চিত হয় যে পার্সী যোদ্ধা আগা গোড়াই সবকিছু জানতো। একম একটা লোককে মিত্র হিসাবে পাশে পাবার জন্য সে আগের। চেয়েও বেশী কৃতজ্ঞবোধ করে।
হুমায়ুন আড়চোখে তাঁর পাশেই উপবিষ্ট হিন্দালের দিকে তাকায়। উৎসবে মত্ত অন্যান্যদের তুলনায় সে অল্পই কথা বলেছে এবং হুমায়ুন আর তাঁর আধিকারিকদের সাথে বসার কারণে তাকে অন্যমনস্ক আর আড়ষ্ঠ দেখায়। গতকাল সন্ধ্যাবেলা তারা শিবিরে ফিরে আসবার পর থেকে, হুমায়ুন তাঁর সৎ-ভাইয়ের সাথে খুব অল্পই সময় কাটিয়েছে। ছেলের সাথে পুনর্মিলিত হবার স্বস্তিতে সে বরং আকবর আর হামিদার সাথেই বেশী সময় অতিবাহিত করেছে। হামিদার কেবল একটাই দুঃখ, তাঁদের সন্তান এখনও মাহাম আগাকেই আকড়ে রয়েছে। হামিদা যতবারই তাকে কোলে নিতে চেষ্টা করে, সে চিৎকার করে হুলস্থূল বাধায়। হামিদা ছেলের নিরাপদে ফিরে আসার স্বস্তি আর উল্লাসের সাথে এই কয়মাসে ছেলেটা কত বড় হয়ে গিয়েছে এবং কয়েকমাস আলাদা থাকায় তার কাছে আগন্তুকে পরিণত হবার দুঃখে সে একটা টানাপোড়েনের ভিতরে পড়ে, হুমায়ুন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে এটা একটা সাময়িক ব্যাপার কেটে যাবে। তার প্রাণবন্ত হাত পা ছোঁড়া একটা বিষয় অন্তত নিশ্চিত করে যে এই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তার স্বাস্থ্য ভালোই আছে, হামিদা ঠোঁটে হাসি আর চোখে কান্না নিয়ে শেষ পর্যন্ত বলে। তারপরে সে ভুলে গিয়েছে এমন ভঙ্গিতে যোগ করে, আমার হয়ে হিন্দালকে আপনি ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না যেন।
