অবশেষে সে শান্ত হয়, কিন্তু পুরোটা সময় আমরা সবাই তটস্থ ছিলাম। আমরা যদিও দূর্গপ্রাসাদের একটা নির্জন কোণে ছিলাম কিন্তু আমি জানি যেকোনো মুহূর্তে কেউ আমাদের দেখে ফেলতে পারে। ভাগ্যক্রমে সেখানে কেউ এসে হাজির হয় না। কিন্তু আমাদের সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। আমি জানতাম যে দূর্গপ্রাসাদের প্রবেশদ্বার আগামী আধঘন্টার ভিতরে রাতের মতো বন্ধ করে দেয়া হবে। আমাদের দ্রুত এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে এবং সেটা এমনভাবে যেন কারো দৃষ্টি আকৃষ্ট না হয়। আমি আগেই লক্ষ্য করেছিলাম যে প্রতিদিন দূর্গপ্রাসাদে ব্যবসার উদ্দেশ্যে অবরোধ এখন উঠে যাবার কারণে পুনরায় রসদ সরবরাহ শুরু হয়েছে যেসব বণিকেরা আসে তাদের অনেকেই সন্ধ্যার দিকে সাধারণত শহরে ফিরে যায়। আমি আমার লোকদের তাই আদেশ দেই পাগড়ি আর আলখাল্লা নিয়ে আসতে- মাহাম আগার জন্যও আনতে বলি- যাতে করে আমরা সবাই বণিকে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারি। আমরা সাথে করে ভেড়ার চামড়া নিয়ে এসেছিলাম যাতে মুড়ে নিয়ে বাচ্চা দুটোকে লুকিয়ে রাখা যায় এবং একটা শিশিতে গোলাপজলের সাথে আফিম মিশিয়ে আনা হয়েছিল তাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন করতে, যাতে তাঁরা কান্নাকাটি না করে। আমি মাহাম আগাকে আদেশ দেই শিশিতে রক্ষিত তরল থেকে দুজনকেই সামান্য পরিমাণ দিতে। সে ইতস্তত করতে আমি নিজে শিশি থেকে খানিকটা পান করি তাঁকে বোঝাতে যে শিশিতে বিষ দেয়া নেই।
আফিম দ্রুত কাজ করে এবং ভেড়ার চামড়া দিয়ে আমরা যখন তাদের মুড়ে দেই তখন তারা চুপচাপই থাকে। তারপরে, আকবরের অন্তধানের সংবাদ যতক্ষণ সম্ভব গোপন রাখতে বন্দি দুই প্রহরীকে গুদামঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেই, এবং যত শীঘ্র সম্ভব বণিকের ছদ্মবেশ ধারণ করে দূর্গপ্রাসাদের অলিগলি দিয়ে দ্রুত তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে গিয়ে ঢালু পথ দিয়ে নীচের শহরের দিকে নামতে থাকা মানুষ আর পশুর ভিড়ে মিশে যাই। কেউ আমাদের সন্দেহ করেনি। আমরা ভিড়ের ভিতরে মিশে গিয়ে শহরের দিকে এগিয়ে যাই, যেখানে তোরণদ্বারের ঠিক বাইরে আমার আরো লোক দলের সবার জন্য ঘোড়া আর খচ্চর নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমি আশা করেছিলাম বাহন হিসাবে খচ্চর ব্যবহার করায় আমাদের দেখে যোদ্ধা মনে না হয়ে বণিক মনে হবে। অন্ধকার পুরোপুরি নেমে আসবার পরে আমরা দ্রুত নিজ নিজ বাহন নিয়ে প্রথমে আমরা উত্তরদিকে যাই, যদি শহর ত্যাগ করার সময় কেউ আমাদের অনুসরণ বা লক্ষ্য করে থাকে তার কাছে আমাদের মূল গন্তব্য গোপন করতে। সারা রাত হাড় কাঁপান শীতের ভিতরে ঘোড়া ছোটাবার পরে সকালের দিকে আমরা বৃত্তাকারে পূর্বদিকে ঘুরে যাই এবং উদীয়মান সূর্যের আলোয় আমাদের মুখ উদ্ভাসিত হলে পরে আমরা সন্ধানে যাত্রা শুরু করি।
হিন্দাল যখন তাঁর অভিযানে গল্প বলছিল, দুরূহ আর বিপজ্জনক কাজে সাফল্য লাভ করায় তার চোখে বালকসুলভ উত্তেজনা আর উল্লাস জ্বলজ্বল করছিল। হিন্দাল এখন তাঁর বর্ণনা শেষ করার পরে, হুমায়ুন তার সবচেয়ে ছোট সৎ-ভাইটির প্রতি তার সতর্ক ও যথাযথ পরিকল্পনা, শান্ত অনুত্তেজিত মনোভাব আর সদ্ধান্ত গ্রহণে দ্রুত বুদ্ধির কারণে এক নতুন আর গভীর শ্রদ্ধাবোধে আপুত হয়। সর্বোপরি, হিন্দাল যেভাবে কামরানকে পুরোপুরি বুঝতে পেরে, তাঁর অহমিকার সুযোগ নিয়ে তাঁর কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে, সেটা তাঁকে মুগ্ধ করে। নিজেদের শত্রুকে চিনে নিতে, বাবর তাঁদের সবসময়, এমনকি ছেলেবেলায় পর্যন্ত, সতর্ক করে কি দেননি? হিন্দাল সবসময়ে নিরবে শুনে যেত, কিন্তু সে নিজে কি দারুণভাবে অন্যদের কেবল শত্রু না বন্ধু এমনকি পরিবারের সদস্যদের মনোভাবের সাথে একাত্ম হবার প্রয়োজনীয়তা সত্যিই বুঝতে পেরেছে? হিন্দালের মনোভাব বোঝার জন্য সে কি কখনও পর্যাপ্ত সময় দিয়েছে এবং তার দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখেছে?
তারা দুজনে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। তারা হয়ত আবার আগের মতোই হয়ে উঠবে… তার পান করা লাল সুরার প্রভাবে পরের কথাটা তার পক্ষে বলাটা সহজ হয়। হিন্দাল, তুমি এইমাত্র কাবুলে আমাদের ছেলেবেলার কথা বলছিলে। তুমি আর আমি অনেক কিছুই, কেবল আমাদের রক্ত আর ঐতিহ্যই না, আমাদের অতীতের অনেক স্মৃতিও, সমানভাবে ধারণ করি। আমার আম্মিজান তোমাকে নিজের পুত্রবৎ জ্ঞান করতেন। আমার সব সৎ-ভাইদের ভিতরে আমি তোমাকেই আপন মনে করি আর তোমাকেই আমার বন্ধু করতে চাই। আমি জানি যে অনিচ্ছাকৃতভাবে- হয়ত স্বার্থপরতাও ছিল- আমি তোমাকে আঘাত দিয়েছি। আমি সেজন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত আর তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি…
হুমায়ুন…
কিন্তু তাঁর বক্তব্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত হিন্দালকে কথা বলার সুযোগ দিতে অনিচ্ছুক হুমায়ুন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকে। আমাদের ভিতরে অতীতে যা কিছু ঘটেছে- আমরা কি সেটা ভুলে যেতে পারি না? পূর্বের মতো আবার আমার মিত্র হয়ে এসো, আমরা একসাথে কাবুল বিজয়ের অভিযানে অংশ নেই। আমরা যদি কেবল সাহসী হয়ে অগ্রসর হই তাহলে দেখবে ভবিষ্যতের গর্ভে অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে- হিন্দুস্তান একদিন আবার মোগলদের অধিকারে আসবে এবং আমি প্রতিজ্ঞা করছি, সেখানে সম্মান আর ক্ষমতাপূর্ণ একটা স্থান আমি তোমার জন্য নির্ধারিত রাখবো। হিন্দাল… তুমি কি আমাকে একবার ক্ষমা করতে পারো না? আমার সাথে কি তুমি নিয়তির সেই বরাভয় ভাগ করে নিতে চাও না?
