তাদের কাছে আমাকে নিয়ে চল।
আহমেদ খানকে পাশে নিয়ে দশ মিনিট পরে হুমায়ুন যখন বল্লা চালে ঘোড়া ছোটায় তখন তার হৃৎপিণ্ডে দামামার বোল বাজছে। ব্যাপারটা সম্ভবত কিছুই না। আহমেদ খান যেমন বলেছে তেমনই মামুলি কয়েকজন বণিকের দল- কিন্তু নিজের মনের গভীর একটা বুনো আশার উপচে উঠা সে কিছুতেই দমন করতে পারে না। সে চোখ কুচকে দূরের ঝাপসা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে, আপাতদৃষ্টিতে নিরানন্দ, বিরান সাদা ভূ-দৃশ্যের মাঝে নড়াচড়ার লক্ষণ সনাক্ত করতে অধৈর্য। প্রথমে কোথাও কিছু নজরে পড়ে না, কিন্তু তারপরেই সে জোরে শ্বাস নেয়। পশ্চিমদিক- যেদিকে কাবুল অবস্থিত সেখান থেকে থেকে মন্থরভাবে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তাদের অবস্থানের দিকে কিছু একটা যা দেখে কালো বিন্দুর মালার মতো মনে হয় এগিয়ে আসছে।
হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার গলার কাছে ঝুঁকে এসে জন্তুটার কানের কাছে ফিসফিস করে তাকে ছুটতে বলে এবং অচিরেই আহমেদ খানকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। কালো বিন্দুগুলো পুরোটা সময়েই কেবল বড় আর স্পষ্ট হতে থাকে ধীরে ধীরে অবয়ব গ্রহণ করতে শুরু করে। সে যখন আরো কাছে পৌঁছে যায় এখন মাত্র চারশ কি পাঁচশ গজ হবে দূরত্ব- তাঁর মনে হয় সে আটজন কিংবা নয়জন অশ্বারোহীকে দেখতে পেয়েছে; এমন অনিশ্চিত সময়ে একাকী ভ্রমণের পক্ষে বলতেই হবে খুবই ক্ষুদ্র একটা কাফেলা।
কাফেলাটা দাঁড়িয়ে যায় এবং একেবারে সামনের আরোহী রেকাবের উপরে উঠে দাঁড়ায় আর, একহাতে চোখের উপর আড়াল তৈরী করে, তার অবস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই দূরত্ব থেকেও এমনকি, বিশাল অবয়বটার ভিতরে খুবই পরিচিত কিছু একটা রয়েছে বলে মনে হয়… সে নিজেকেই নিশ্চয়ই বিভ্রান্ত করছে না, করছে কি? অবয়বটা হিন্দালের হতে পারে, সেটা হওয়াটা কি অসম্ভব? হুমায়ুন চক্রাকারে ঘুরিয়ে নিজের বাহনকে দাঁড় করিয়ে ব্যগ্র দৃষ্টিতে সেও এবার সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহমেদ খান আর তাঁর দেহরক্ষীরা কিছুক্ষণ পরেই বল্লা চালে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে উপস্থিত হয়, তাঁদের ঘোড়ার খুর থেকে ধোয়ার মতো তুষারের গুড়ো বাতাসে ছিটকে উঠছে।
সুলতান, আমি কি তাদের পরিচয় জেনে আসবার জন্য লোক পাঠাব? আহমেদ খান জানতে চায়।
না… আমি নিজেই যাবো… তোমরা সবাই এখানেই অপেক্ষা কর! আহমেদ খানের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে, হুমায়ুন তার ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দেয়। তার সন্তানের ভাগ্যে কি ঘটেছে অশ্বারোহীদের দলটা যদি সেই সংবাদ বয়ে নিয়ে এসে থাকে তাহলে কেবল তারই প্রথম সেটা শোনা উচিত এবং সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে রাজি নয়। বরফাবৃত মাটির উপর দিয়ে সে যখন ঘোড়া হাকায়, খুরের শব্দ তাঁর কানে প্রতিধ্বনি তোলে, সে তাকিয়ে দেখে যে সামনের আরোহী নিশ্চল ভঙ্গিতে তখনও তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বিশালদেহীকে ছাপিয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে, হুমায়ুন আবিষ্কার করে যে কাফেলার বাকি সদস্যদের মধ্যে অধিকাংশই ছয়জন পুরুষ আর ছোটখাট অবয়বের হাল্কাপাতলা দেখতে একটা আকৃতি- একজন মহিলা যার মাথার কালো ভেড়ার পশমের তৈরী একটা উস্কোখুস্কো টুপির নীচে থেকে লম্বা বেনী বের হয়ে রয়েছে- সবাই খচ্চরের পিঠে উপবিষ্ট। মহিলাটার হাতে আরেকটা খচ্চরের লাগাম ধরা রয়েছে। সে আরেকটু এগিয়ে গেলে বুঝতে পারে যে আরোহীবিহীন খচ্চরটার পিঠে বেতের একটা ঝুড়ি বাঁধা রয়েছে যার ভিতরে তাঁর মুহূর্তের জন্য মনে হয় সে দুটো বেলনাকারে মোড়ান দুটো বস্ত্রখণ্ড দেখেছে বা সেটা কি দুটো শিশু হওয়া সম্ভব, ভেড়ার চামড়া দিয়ে মোড়ান হলে তাদের দেখতে অবিকল প্রায় গোলকাকার মনে হবে?
হুমায়ুন এখন কাফেলাটা থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে রয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য, সে টের পায় সামনে যেতে তার ভয় করছে কি হবে যদি তুষারাচ্ছন্ন প্রেক্ষাপটে তাঁর সামনের ঐ লোকগুলো কেবলই, তাঁর নিজের আশা আর আকাঙ্খ দ্বারা সৃষ্ট, একটা বিভ্রম হিসাবে প্রমাণিত হলে। লাগাম টেনে ধরে এবং লোকগুলোর উপর থেকে একবারের জন্যও দৃষ্টি না সরিয়ে হুমায়ুন তার পর্যান থেকে আলতো ভঙ্গিতে পিছলে মাটিতে নেমে আসে এবং পায়ে হেঁটে শেষ কয়েকগজ দূরত্ব অতিক্রম করে, প্রথমে ধীরে ধীরে আর শেষের দিকে তাকে রীতিমতো দৌড়াতে দেখা যায়, বরফের উপরে পা কখনও পিছলে যায় কখনওবা হড়কে যেতে চায়।
তার দিকে উদগ্রীবভাবে তাকিয়ে থাকা, কাফেলাটার একেবারে সামনের অশ্বারোহী, পুরু পশমের আলখাল্লায় আপাদমস্তক আবৃত অবস্থায় আসলেই হিন্দাল। সে কি করছে সেবিষয়ে একেবারেই বেখেয়াল এবং ইতিমধ্যেই তাঁর চোখে আনন্দের অশ্রুর বাণ ডেকেছে হুমায়ুন হিন্দালকে অতিক্রম করে চামড়া দিয়ে মোড়ান পুটলি দুটো বহনকারী খচ্চরটার দিকে এগিয়ে যায়। সে মাহাম আগাকে সুলতান বলে চিৎকার করতে শুনে কিন্তু তারপরে সে দেখে যে চামড়ার পুটলি দুটোতে আসলেই বাচ্চা ছেলে রয়েছে এবং নিজের দুধ-ভাই আদম খানের পাশে শান্তভাবে শুয়ে রয়েছে, আকবর যাঁর কথাই সে এতোদিন কেবল ভেবেছে। হুমায়ুন নীচু হয়ে আকবরের দিকে ঝুঁকে এলে, সে ভেড়ার চামড়ার তৈরী পুটলির ভিতর থেকে হুমায়ুনের দিকে বন্ধুত্বপূর্ণ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে। কামরান তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবার পরের চৌদ্দমাসে সে অনেক বদলে গিয়েছে কিন্তু এখনও সন্দেহাতীতভাবে সে সেই আকবরই রয়েছে। আদম খান তাতস্বরে কাঁদতে শুরু করলে হুমায়ুন আকবরকে আলতো করে ঝুরি থেকে তুলে নেয় এবং তাকে বুকের কাছে আকড়ে ধরে তার দেহের উষ্ণ গন্ধে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়।
