*
ভেড়ারচামড়া আর পশমের পুরু একটা স্তরের নীচে শুয়ে হুমায়ুন অস্থিরভঙ্গিতে নড়াচড়া করে, তার ভাবনা আর দুশ্চিন্তাগুলোর কারণে আজকাল ঘুমান তারপক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হিন্দালকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি, পারি না আমরা? সে জিজ্ঞেস করে। একমাসেরও বেশী সময় অতিক্রান্ত হতে চলেছে এবং আমরা এখনও অন্ধকারেই রয়েছি।
তার পাশে শুয়ে থাকা একই রকম নিদ্রাহীন হামিদাও কেবল এপাশ ওপাশ করে। আমি সত্যিই সেটা বিশ্বাস করি। আমার আব্বাজানের নিকট একজন পরামর্শদাতা হিসাবে কর্মরত থাকার সময়ে তাঁর সম্বন্ধে তিনি যা কিছু বলেছিলেন আমাকে সেটাই বিশ্বাস করতে বলে। ভাইয়ের জন্য গুলবদনের ভালোবাসা আর সমীহবোধও সেই কথাই বলে। আমাদের সাথে সে বিশ্বাসঘাতকতা করবে সেটা না বরং সেই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হবে বা কোনো কারণে আকবরকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হবে আমি এটা ভেবেই বেশী উদ্বিগ্ন। কামরান তখন তাহলে কি করবে? সে নিশ্চয়ই আকবরকে হত্যা করবে না, নাকি করতেও পারে…?
প্রশ্নটা এই প্রথমবারের মতো হামিদা উচ্চারণ করে। না, সে যতটা নিশ্চিত তার চেয়ে বেশী নিশ্চয়তা কণ্ঠে আরোপ করে সে বলে। বন্দি হিসাবে আকবরের গুরুত্ব সম্বন্ধে সে আরো বেশীমাত্রায় সচেতন হয়ে উঠবে- যদিও হিন্দালের জন্য পরিস্থিতিটা সুখকর নাও হতে পারে।
আপনি ঠিকই বলেছেন, কিছুক্ষণ পরে হামিদা সায় দেয়। আর তাছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে এমন ভাববার কোনো কারণ এখনও ঘটেনি। নিজেকে কামরানের অনুগ্রহভাজন করে তুলতে হিন্দালের সময় লাগবে যাতে সে বিশ্বস্ততার এমন একটা অবস্থানে পৌঁছাতে পারে যা ব্যবহার করে সে আমাদের সন্তানকে উদ্ধার করতে পারবে। আমাদের ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় নেই।
ধৈর্য আর অনিশ্চয়তা বরাবরই আমাকে অস্থির করে তুলে। আমি অধীর হয়ে আছি এই যন্ত্রণাদায়ক অনিশ্চয়তার পরিসমাপ্তি ঘটাতে, যাতে করে কর্ম আর কর্মফলের প্রতি আমি নিজেকে মনোযোগী করতে পারি।
অনিশ্চয়তা আর ধৈর্য সব নশ্বর জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। সান্নিপাতিক জ্বরে আমাদের যেকোনো সময়ে মৃত্যু হয়ে, আমাদের সব আশা আর স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ হতে পারে তবুও আমরা প্রতিদিন এটা নিয়ে ভাবি না। আমাদের মেনে নিতেই হবে যে কখনও কখনও পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে।
আমি জানি সেটা, কিন্তু আকবরের পিতা আর সেই সাথে একজন নেতা হিসাবে আমি যেমনটা চাই, সবকিছু যাতে সেভাবে ঘটে, সেই চেষ্টা করা আমার দায়িত্ব এবং আমি এখানে বসে যতই দুশ্চিন্তা করি কাবুলে এই মুহূর্তে যা ঘটছে আমি কিছুতেই তাঁকে প্রভাবিত করতে পারবো না।
তাহলে আপনার দুশ্চিন্তা না করার চেষ্টাই করা উচিত …এতে কোনো লাভ হবে না। আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। হামিদা তাঁর দুহাত দিয়ে হুমায়ুনকে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে এবং অবশেষে পশমের পুরু নিরাপত্তার মাঝে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তারা ঘুমিয়ে পড়ে।
শীতের সেই দীর্ঘ রজনীগুলো যখন তাঁরা নিদ্রাদেবীর বরাভয় বঞ্চিত হামিদার সাথে হুমায়ুনের এমন কথোপকথন এই শেষবার না। যাই হোক, মাঝে মাঝে সে কোনভাবেই নিজেকে তাবু থেকে বের হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে না, বাইরে এসে সে শীতের তারকারাজির দিকে তাকিয়ে থেকে খুঁজতে চেষ্টা করে যদি সেখানে তার জন্য কোনো বার্তা নিহিত থাকে কিন্তু সেখানেও সে কোনো উত্তর পায় না। বৃদ্ধ শারাফকে সে যখন ডেকে পাঠায়, যার শীর্ণ বিবর্ণ হাত গাঁটঅলা থাবার মতো তার ভেড়ারচামড়ার আলখাল্লার আস্তিনের ভিতর থেকে বের হয়ে থাকে, সেও কিছু খুঁজে পায় না।
একটার পর একটা দিন অতিক্রান্ত হয়, তুষারাবৃত প্রেক্ষাপটে ব্যস্ত শিয়াল আর পাহাড়ী খরগোসের পাল ছাড়া আর কিছুই নড়াচড়া করে না, যা হুমায়ুনের লোকেরা রান্নার জন্য শিকার করে। হুমায়ুন শারীরিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। বৈরাম খান তাকে তরবারি চালনার পারস্যরীতির কিছু কার্যকরী চালাকি দেখিয়ে দেয়, যার ভিতরে রয়েছে কিভাবে নিজের তরবারির অগ্রভাগ প্রতিপক্ষের হাতের রক্ষাকারী বর্মে আটকে দিয়ে, সে তার শত্রুর কব্জি মোচড় দিয়ে তাকে অস্ত্র ফেলে দিতে বাধ্য করতে পারে। সে একইসাথে, তুষারাবৃত ভূমিতে পোথিত দণ্ডের উপরে রাখা খড়ের নিশানা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে, নিজের তীরন্দাজি চর্চাও করে! তার চোখের দৃষ্টি আগের মতোই ক্ষুরধার আর হাত বরাবরের মতোই নিশ্চল রয়েছে দেখে তার মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠে, যদিও এরফলে সত্যিকারের যুদ্ধের জন্য সে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠে হিন্দালের কাছ থেকে কোনো সংবাদ পাবার পরেই কেবল যার সম্ভাবনা মূর্ত হবে। কিন্তু অবশেষে, একদিন দুপুরবেলা হুমায়ুন যখন বাজপাখি নিয়ে শিকার করতে গিয়েছে, হাল্কা নীল আকাশে, যা আসন্ন বসন্তের ইঙ্গিত বহনকারী, বৃত্তাকারে উড়তে থাকা পাখির দিকে তাকিয়ে থাকার মাঝে সে আহমেদ খানকে গিরিসঙ্কটের উঁচুভূমির দিক থেকে বল্পা চালে ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে।
সুলতান, আমার গুপ্তদূতেরা একদল অশ্বারোহীকে এদিকে আসতে দেখেছে।
কতজন অশ্বারোহী?
অল্প কয়েকজন, বেশীর ভাগই খচ্চরের পিঠে রয়েছে- সম্ভবত বণিকদের একটা ক্ষুদ্র কাফেলা। তারা এখনই দুই মাইল দূরে রয়েছে কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে : তাঁরা এদিকেই আসছে।
