সে এমনকি যখন প্রথম বাকটা ঘুরে সে তখনও কিছু দেখতে পায় না, কিন্তু পেছন থেকে ভেসে আসা বিক্ষোভের আওয়াজ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতিনিয়ত জোরাল হচ্ছে। তারপরে, হৃৎপিণ্ডে মাদলের বোল নিয়ে সে দ্বিতীয় বাকটা অতিক্রম করে এবং উত্তেজনার কারণটা দেখতে পায়। আল্লাহতালাকে অশেষ শুকরিয়া, ব্যাপারটা কোনো অতর্কিত হামলা নয়। সংকীর্ণ গিরিপথে পাশাপাশি চলতে গিয়ে দুটো গরুর গাড়ির চাকা পরস্পরের সাথে আটকে গিয়েছে। একটা গাড়ি পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরে গিয়েছে। গাড়িটার পেছনের চাকা শূন্যে ঝুলে আছে আর কিছু লোক ভারী কাঠের জোয়াল ধরে ষাড় দুটোর মাথা নিজেদের দিকে টানছে এবং সামনের চাকার পেছনে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে চেষ্টা করছে গাড়িটাকে পুনরায় শক্ত মাটির উপরে নিয়ে দাঁড় করাতে।
কিন্তু মূল সমস্যা সৃষ্টি করেছে দ্বিতীয় গাড়িটা যা সম্ভবত এই পুরো দুর্ঘটনার সূত্রপাতকারী। গাড়িটার অন্তত অর্ধেক লোকজন ষাড়সহ কিনারা দিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়েছে। নীচের গিরিসঙ্কটের দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন তাদের তিনজনের নিথর দেহগুলো জমে বরফ হয়ে থাকা নদীবক্ষের ধারাল আর এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা পাথরের উপরে পড়ে থাকতে দেখে, তাদের দেহ থেকে বের হওয়া রক্তে চারপাশের বরফ লাল হয়ে উঠেছে। আরেকটা ষাড় ঢালের উপর থেকে ছিটকে গিয়ে ঝুলে আছে, দড়ির প্রান্ত থেকে জীবন্ত ঝুলে আছে এবং গাড়িটার দুজন গাড়োয়ান সামনের দিকে ঝুঁকে এসে, গাড়ির সাথে গরু জুড়ে দেবার সরঞ্জামাদি ধরে বেচারাকে টেনে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। অন্যান্যরা চেষ্টা করছে গাড়িটা যাতে ভারের কারণে ঢাল দিয়ে গড়িয়ে না পড়ে যায় সেজন্য এর চাকার সামনে পাথর দিয়ে উন্মত্তের ন্যায় প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে। হুমায়ুনের চোখের সামনে দুই গাড়োয়ানের একজন বরফের উপরে আছাড় খায় এবং ভারসাম্য হারিয়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে গিরিসঙ্কট থেকে ছিটকে যায়। নিচের মাটিতে পড়ে থাকা ষাড়গুলোর একটার পাশে আছড়ে পড়ার আগে তাঁর দেহটা গিরিসঙ্কটের পাথুরে পার্শ্বদেশে দুবার ধাক্কা খায়।
দড়িগুলো কেটে দাও। ষাড়গুলোকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে যেও না, চিৎকার করে হুমায়ুন আদেশ দেয়। আরো প্রাণহানির কোনো অর্থ হয় না। তোমাদের যদি সেজন্য গাড়িগুলোর মায়া ত্যাগ করতে হয় তবে তাই কর।
দীর্ঘদেহী, লাল পাগড়ি পরিহিত এক লোক দ্রুত নিজের কোমরবন্ধ থেকে একটা লম্বা খঞ্জর বের করে এবং বেকায়দায় ঝুলে থাকা ষাড়ের দিকে দৌড়ে যায়। দুই মিনিটেরও কম সময়ে সে চামড়ার দড়িগুলো কেটে ফেলে আর ষাড়টা জান্তব গর্জন করে আর উন্মত্তের মতো শূন্যে পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে গা গুলিয়ে ওঠা একটা আওয়াজ করে নিচের পাথুরে মাটিতে আছড়ে পড়ে। গরুর গাড়িটা, হুমায়ুন এতক্ষণে খেয়াল করে সেটায় বিশালাকৃতি কয়েকটা তামার কড়াই আর রান্নার অন্যান্য সরঞ্জামাদি রয়েছে, রাস্তার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। ভালো, হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, এই আবহাওয়ায় তার সৈন্যদের গরম খাবার প্রয়োজন। অন্য গাড়িটাকে যারা শীতের বাতাসে গরম শ্বাস নির্গত করে ধাক্কা দিচ্ছিল আর টানছিলো তারাও শেষ পর্যন্ত, বরফ হয়ে থাকা মাটিতে গাড়িটায় বহন করা তাবুর একটা অংশ নামিয়ে রেখে, এর পেছনের চাকা পুনরায় গিরিসঙ্কটের উপরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
হুমায়ুন স্বস্তির শ্বাস নেয়। পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হতে পারতো। তার আরো লোক মারা যেতে পারতো কিংবা তাঁর সবেধন নীলমনি ভারবাহী হাতির পালের দুই একটা নিচের মাটিতে আছড়ে পড়তে পারতো। তার আর তার লোকদের এবার যাত্রাবিরতি করার সময় হয়েছে এবং হিন্দালের আন্তরিকতার একভাবে বা অন্যভাবে প্রমান পেতে আর পরিস্থিতির অগ্রগতি সম্বন্ধে জানতে সে অপেক্ষা করবে। আজ রাতে, সে তার লোকদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করবে যে কাবুলের সাথে চল্লিশ মাইলের বেশী দূরত্ব তৈরী করার পরে আর একটা চমৎকার স্থান পাবার কারণে তারা এখানে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করে কয়েকদিন বিশ্রাম নেবে এবং নিজেদের অস্ত্র আর অন্যান্য যুদ্ধ উপকরণের পরিচর্যা করবে। বিশ্রামের সুযোগ পেয়ে তার লোকদের খুশী হবার কথা, যদিও তাদের সবারই মন মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে, বিক্ষুব্ধও বলা যায়। কাবুলের আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলোর অনেকেই ইতিমধ্যে অন্যত্র রওয়ানা দিয়েছে, তাঁদের লুটতরাজ করার আশা শেষ হয়ে গিয়েছে বিশ্বাস করে, কিন্তু হুমায়ুন জানতো এমনটা ঘটতেই পারে তাই সে মনে মনে এর জন্য প্রস্তুত ছিল। হিন্দালের পরিকল্পনা যদি সফল হয় তাহলে অচিরেই সে কাবুল ফিরে যাবে সেখানের দূর্গপ্রাসাদ নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আক্রমণ করতে। তাঁর কামানগুলো আরো একবার গোলাবর্ষণ শুরু করলে যারা তাঁকে ত্যাগ করেছিল তারা অচিরেই আবার এসে যোগ দেবে…।
সে তার লোকদের নিয়ে কোনদিকে যাবে এবং মোটামুটি কতটা দূরে সে বিষয়ে হিন্দালের সাথে সে একমত হয়েছিল। তাদের অস্থায়ী শিবির স্থাপণ একবার শেষ হলে সে আহমেদ খানকে আদেশ দেবে- দিন রাত তার গুপ্তদূতেরা যেন নজরদারি বজায় রাখে। তাঁরা তাহলে বিশ্বাস করবে কামরানের সৈন্যদল কর্তৃক অনুসরণের লক্ষণের জন্য তারা পাহারা দিচ্ছে। অবশ্য হিন্দালের পরিকল্পনা যদি ব্যর্থ হয় বা হিন্দাল তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নেবে…
