হুমায়ুন হাত বাড়িয়ে তাঁকে নিজের কাছে টেনে আনে এবং তাঁকে সজোরে আকড়ে ধরে রেখে তার দেহের পরিচিত চন্দনের সুগন্ধ প্রাণ ভরে গ্রহণ করে। হিন্দালকে বিশ্বাস করার জন্য তাঁর এই উদগ্রীব বাসনা কিংবা হামিদার জন্য তার ভালোবাসা কোনটার দ্বারাই তার প্রভাবিত হওয়া উচিত হবে না। এটা তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির একটা। কিন্তু সে মনে মনে যতই বিষয়টা নিয়ে বিশ্লেষণ করুক, তার মনের গভীরে যুক্তির চেয়ে সহজাত কোনো একটা অনুভূতি তাকে বারবার বলতে চায়। হামিদা ঠিকই বলেছে- হিন্দাল যা বিশ্বাস করে সেটাই সে বলেছে এবং তাদের তাকে বিশ্বাস করা উচিত। কিন্তু তার মানে এই না যে হিন্দালের পরিকল্পনা সফল হবেই। তার পরিকল্পনা খুবই বিপজ্জনক, কিন্তু সবাই যদি নিজেদের অংশ ভালোভাবে সম্পন্ন করে তাহলে হয়তো কাজ হলেও হতে পারে।
বেশ তাই হবে, হুমায়ুন অবশেষে মন্তব্য করে। আমি হিন্দালকে গিয়ে বলছি যে আমরা তার প্রস্তাব গ্রহণ করেছি যে আমাদের সন্তানের জীবন তার হাতে সমর্পণ করতে তুমি রাজি হয়েছে।
তাকে বলবেন মাহাম আগা আর তার সন্তানকেও যেন সে বের করে নিয়ে আসে। কামরান যখন জানতে পারবে আকবর পালিয়েছে তারা তখন সমূহ বিপদের সম্মুখীন হবে।
হুমায়ুন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। আমাকে আরো অনেক কিছুই তার সাথে আলোচনা করতে হবে- কাবুল থেকে কতদূরে আমি আমার বাহিনী সরিয়ে নিয়ে যাবো। যখন প্রয়োজন হবে তখন সে আমাদের কোথায় খুঁজে পাবে সেটাও তার জানা থাকা দরকার। হুমায়ুন ঝুঁকে গিয়ে হামিদার কপালে চুমু খায়। হামিদা, এবিষয়ে কারো সাথে এখনই আলোচনা করবে না। এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে আমার লোকদের আসলেই বিশ্বাস করাতে হবে যে আমরা কামরানের কাছে কাবুল ছেড়ে যাচ্ছি।
রাতের আধারে হুমায়ুন আরো একবার পা রাখলে তাঁর আব্বাজানের রোজনামচার কিছু কথা তার মনে পড়ে।
কোন সম্রাটের জন্য সতর্কতা মূল্যবান আর গ্রহণযোগ্য একটা বিষয় কিন্তু একজন সত্যিকারের মহান শাসকের সেই সাথে এটাও জানা উচিত কখন তাঁকে ঝুঁকি নিতে হবে।
৩.৫ তুষার ঝড়ের কবলে
১৯. তুষার ঝড়ের কবলে
শীতের সূর্য ইতিমধ্যেই দিগন্তের অনেক কাছে নেমে এসেছে, যখন হুমায়ুন কাবুল থেকে তাদের ফিরতি যাত্রার পথে খাড়া নীচের দিকে নেমে যাওয়া একটা গিরিপথ দিয়ে সে আর তার সৈন্যরা নামার সময়ে হিমশীতল বাতাসের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে ভেড়ার চামড়ার আস্তরন দেয়া একটা আলখাল্লায় নিজেকে ভালো করে মুড়ে নিয়েছে, আহমেদ খানকে তাঁর দিকে ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে আসতে দেখে।
সুলতান, আমরা শিবির স্থাপন করতে পারবো, এমন একটা স্থান এখান থেকে মাইল চারেক সামনে আমার গুপ্তদূতেরা চিহ্নিত করেছে। জায়গাটা পর্বতশীর্ষের কাছাকাছি একটা উঁচুভূমি যা বায়ুপ্রবাহ থেকে রক্ষিত আচ্ছাদিত দিকে অবস্থিত হওয়ায় আমাদের বাতাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে এবং কেউ আমাদের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে, আমাদের প্রহরীরা উঁচুভূমিতে অবস্থান করায় অনেক আগেই তাদের দেখতে পেয়ে আমাদের হুশিয়ার করতে পারবে।
দারুণ দেখিয়েছে, আহমেদ খান।
হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে তার গুপ্তদূতদের প্রধান কথা শেষ করে পুনরায় সৈন্যসারির সম্মুখের দিকে এগিয়ে যায়। কাবুলের উপর থেকে সহসা অবরোধ তুলে নেবার কারণ সম্বন্ধে সে তার কোনো সেনাপতিকে অবহিত করেনি, তাঁর কারণ এই না যে তাদের আনুগত্যের প্রতি সে সন্দেহ পোষণ করে, তার কারণ এই যে তাদের যে কোনো একজনের একটা আলটপকা মন্তব্যে হয়ত পুরো ব্যাপারটা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। সে বরং তাঁদের বুঝিয়েছে অবরোধের বিষয়ে সে ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠেছে- বলেছে যে সে পর্বতমালার পূর্বদিকে অবস্থিত বাগে-গজরে যেতে ইচ্ছুক যেখানে কামরানের অনুগত লোকদের প্রহরীধীন অবস্থায় অন্যান্য অনেক ছোট ছোট দূর্গ রয়েছে দখল করার মতো এবং সেখান থেকে সে আরো লোক সংগ্রহ করার আশা রাখে। বরফ একেবারে গলে যাবার পরেই সে কাবুলে ফিরে এসে পুনরায় অবরোধ আরোপ করবে।
জাহিদ বেগ, আহমেদ খান আর নাদিম খাজা নিজেদের ভিতরে বিস্মিত ভঙ্গিতে দৃষ্টি আদান-প্রদান করে। হিন্দালের নৈশকালীন গোপন অভিসারের সাথে হুমায়ুনের এই আকষ্মিক সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা সে বিষয়ে জাহিদ বেগ যদি কিছু আঁচ করতে পারেও তার অভিব্যক্তিতে সেটা প্রকাশ পায় না বরং অন্যান্যদের মতোই সেও সাথে সাথে শিবির গুটিয়ে নেয়ার ঝক্কিপূর্ণ কাজে মনোনিবেশ করে। কেবলমাত্র বৈরাম খানের আগ্রহী চোখের দৃষ্টিতে হুমায়ুনের মনে হয়- তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে সে অনুমানের ঢেউ খেলা করতে দেখেছে কিন্তু অন্যদের মতো পারস্যের অধিবাসীও মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। হুমায়ুন এসব কিছুর মূলে যে কারণ রয়েছে সেটা গুলবদনকে খুলে বলেছে। হিন্দালের বোন হবার কারণে তার জানবার অধিকার রয়েছে। হামিদার মতোই, গুলবদনও নিশ্চিত হিন্দালের প্রস্তাবে কোনো গলদ নেই।
হুমায়ুন সহসা নিজের পেছন থেকে চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পায় এবং তাঁর সৈন্যসারির একেবারে পেছন থেকে অস্পষ্ট হট্টগোলের শব্দ ভেসে আসে। অতর্কিত হামলার জন্য এই আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ গিরিপথটা, যার একদিকে দুরারোহ ঢাল নিচে শীতে জমে থাকা নদীর বুকে গিয়ে থেমেছে একটা আদর্শ স্থান। হুমায়ুন তাঁর পর্যানের উপর ঘুরে পেছনে তাকায় কিন্তু আঁকাবাঁকা বাঁকের কারণে শব্দটা যেখান থেকে আসছে, সেটা দেখতে পায় না। সে যেটা দেখতে পায় সেটা হল তার লোকদের কয়েকজন ইতিমধ্যে নিজেদের ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পেছনের পশ্চাক্ষীদের অবস্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। তার ভাবনায় সেই ভয়টা সাথে সাথে ফিরে আসে, যা থেকে সে কখনই আসলে পুরোপুরি মুক্তি পায়নি। হিন্দাল নিশ্চয়ই তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না এবং কামরান আর তার অনুগত বাহিনীকে তাঁর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিবে না? তার সৎ-ভাইদের একজনের দ্বারা পুনরায় প্রতারিত হবার মতো এতবড় আহাম্মকি সে করেনি, নাকি করেছে? হুমায়ুন তার কালো ঘোড়াটার মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং তাঁর বিভ্রান্ত সৈন্যদের ভিতর দিয়ে গিরিপথের ভেতর নিজের পথ করে নিয়ে এগিয়ে যায়, তাঁর দেহরক্ষীরা তাঁকে নিরবে অনুসরণ করে।
