দুই ভাইয়ের কথোপকথনের পুরোটা সময় হুমায়ুনের মুখ থেকে হিন্দাল তার দৃষ্টি একবারের জন্যও সরায়নি। বেশ, আপনার কি মতামত? আপনার শিবির ত্যাগ করার পূর্বে ধরে নিচ্ছি যে আপনি আমাকে যেতে দিতে প্রস্তুত- আমাকে অবশ্যই সেটা জানতে হবে আর সূর্যোদয়ের পূর্বে আমাকে অবশ্যই এখান থেকে বিদায় নিতে হবে। আপনার শিবিরের অনেক মানুষই আমায় চেনে এবং তাদের ভিতরে হয়ত গুপ্তচরও রয়েছে। আমার পরিকল্পনা সফল হবার সামান্যতম সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যাবে, এখানে আমার উপস্থিতির কথা যদি কামরানের কানে পৌঁছে…
আমার পুরো ব্যাপারটা ভেবে দেখার জন্য একটু সময় প্রয়োজন। আমি জাহিদ বেগকে বলে দিচ্ছি, তোমাকে তার তাবুতে নিয়ে যেতে এবং আমি না আসা পর্যন্ত সে তোমার সাথে থাকবে। সকাল হতে এখনও ঘন্টা তিনেক সময় বাকি আছে। তুমি তোমার উত্তর দুই ঘন্টার ভিতরে পেয়ে যাবে।
হিন্দাল চলে যেতে, হুমায়ুন খোলা প্রান্তরে শীতের তোয়াক্কা না করে পায়চারি করতে থাকে। হিন্দালের পরিকল্পনাটা দুর্দান্ত আর সাহসী কিন্তু সে যদি তাঁর কথায় রাজি হয় তাহলে অনেক কিছুই তাকে বিশ্বাসের উপরে ছেড়ে দিতে হবে। সম্রাট হবার পর থেকে নিজের পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস করে কতবার তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হতে হয়েছে?…কিন্তু আজকে রাতে হিন্দালের কণ্ঠস্বরের প্রতিটা চড়াই উতরাই, তাঁর প্রতিটা অভিব্যক্তির ভিতরে দৃঢ় প্রত্যয়ের একটা ছাপ স্পষ্ট টের পাওয়া গেছে। তাঁর নিজের দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, হামিদার সাথে এ বিষয়ে আলোচনা না করে সে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, বেচারী কেন তাঁর এতে দেরী হচ্ছে দেখে নিশ্চয়ই এতোক্ষণে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।
সে ঠিকই অনুমান করেছিল। হুমায়ুন তাঁদের তাবুতে যখন ফিরে আসে তখন দেখে যে হামিদা শয্যায় উঠে বসে রয়েছে এবং তার জন্য অপেক্ষা করছে, আকষ্মিক নিদ্রাভঙ্গের কারণে তাঁর মাথার ঘন কালো চুল কাঁধের উপরে আলুথালু হয়ে পড়ে রয়েছে এবং তার অভিব্যক্তিতে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্টই বোঝা যায়। রাতের বেলা যে লোকটা একাকী শিবিরে এসেছে- সে আর কেউ না, হিন্দাল, হামিদা কোনো কথা বলার আগেই হুমায়ুন তাকে অবগত করে।
হিন্দাল?
হ্যাঁ। আকবরকে উদ্ধারের ব্যাপারে সে আমাদের সাহায্য করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। আমি যদি অবরোধ তুলে নেই এবং এখান থেকে চলে যাবার ভাণ করি, সে দূর্গপ্রাসাদের গিয়ে কামরানকে মৈত্রীর প্রস্তাব দেবে। কামরানের আস্থা একবার অর্জন করার পরে সে আকবরকে কাবুল থেকে গোপনে বের করে আনবার একটা উপায় খুঁজে বের করবে।
সে কি সত্যিই আমাদের ছেলেকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবে…।
হামিদার ভেতরে আশার কুড়ি এরই ভিতরে পাপড়ি মেলতে শুরু করেছে হুমায়ুন বুঝতে পারে। মানে, সম্ভবত…কিন্তু প্রশ্ন হল আমরা কি হিন্দালকে আদৌ বিশ্বাস করতে পারি?
হামিদার আশাবাদী অভিব্যক্তি হোঁচট খায়। অন্ধকারে একাকী আপনার শিবিরে এসে হিন্দাল বিশাল একটা ঝুঁকি নিয়েছে। সে মারাও যেতে পারতো। আর তাছাড়া পুনরায় আপনার সামনে দাঁড়াতে যথেষ্ট সাহসের প্রয়োজন হয়েছে।
মানলাম, কিন্তু সে যদি সাপের গালে আর ব্যাঙের গালে চুমু দেবার খেলায় নেমে থাকে তাহলে ঝুঁকির তুল্যমূল্য সম্ভাব্য পুরষ্কারের কথাও সে হয়তো ঠিকই বুঝতে পেরেছে। যদিও সে শপথ করে বলেছে যে কামরানের সাথে তার কোনো প্রকার সংশ্রব নেই, অবরোধ তুলে নেবার জন্য আমাকে বাধ্য করতে কিংবা হিন্দাল আর তার লোকেরা কাবুলে গিয়ে কামরানের সাথে যাতে যোগ দিতে পারে- এটা কোনো ধরনের চালাকি। হামিদা আর হুমায়ুন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে তাবুর পুরু চামড়ার দেয়ালে কেবল বাতাসের আছড়ে পরার শব্দ শোনা যায়। আমি যদি এখন কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেই তাহলে কামরানের অবস্থা শক্তিশালী হবে এবং তাঁকে পরাস্ত করা আর আমাদের সন্তানকে উদ্ধার করার সুযোগ ক্ষীণ হয়ে যাবে, হুমায়ুন অবশেষে নিরবতা ভেঙে বলে।
হামিদা চোখে মুখে একটা বিষণ্ণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে মুখের উপর থেকে চুলের গোছা পেছনে সরিয়ে দেয়। আপনাকে সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, হিন্দাল কেন আমাদের সাহায্য করতে চায়?
ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর আমি জানতে চেয়েছিলাম। সে বলেছে যে একটা শিশুর জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে কামরান আমাদের পরিবারের সম্মানহানির কারণ হয়েছে…
পারিবারিক সম্মান কি আসলেই তাঁর কাছে এতোটাই মূল্যবান?
সম্ভবত মূল্যবান। তারপরে সে আমাকে আরেকটা, সম্ভবত আরো গাঢ় একটা কারণের কথা বলে। আমাকে না, সে তোমাকে সাহায্য করতে চায়। সে জানে তুমি কেমন মনোকষ্টে আছে এবং সে তোমার যন্ত্রণার উপশম করতে চায়…
হুমায়ুনের কথার তাৎপর্য বুঝতে পেরে, হামিদার চোখমুখ লাল হয়ে উঠে আর সে মাথা নামিয়ে নেয়। হামিদার জন্য হিন্দালের অনুভূতি নিয়ে তারা দুজনে কখনও খোলাখুলি আলোচনা করেনি কিন্তু অবশ্যই সে বিষয়টা জানে। হামিদা কিছুক্ষণ অস্থির হয়ে পায়চারি করে ঠিক যেমনটা হুমায়ুন সামান্য আগে হিম শীতল শীতের রাতে করেছিল, তারপরে সে মুখাবয়বে দৃঢ়তার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে হুমায়ুনের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমার মনে হয় হিন্দাল সত্যি কথা বলছে। সবচেয়ে বড় কথা হল যে তাকে বন্দি করে রেখেছিল সেই কামরানের প্রতি তার কোনো অনুরাগ থাকার কথা নয়… আমাদের উচিত তাঁকে বিশ্বাস করা। সে যদি আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে কামরানের মতো সেও আমাদের সন্তানের প্রাণের জন্য আমাদের ভয়কে নিজের স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগাবার দোষে দোষী হবে। আমার বিশ্বাস তাঁকে দিয়ে এমন জঘন্য কাজ সম্ভব নয়। হুমায়ুন অনুগ্রহ করে আসুন এই সুযোগটা আমরা গ্রহণ করি।
